ভারতের কলকাতার চোরবাগান সার্বজনীন দুর্গোৎসব মণ্ডপে অতিরিক্ত ভিড়, বৃষ্টি ও অব্যবস্থাপনার জেরে ঘটে যাওয়া পদপিষ্টের ঘটনায় ১৯ জনের প্রাণহানির পর কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে প্রশাসন। শনিবার (১৭ অক্টোবর) সন্ধ্যার এই দুর্ঘটনার পর গাফিলতি ও নিরাপত্তার ত্রুটির অভিযোগে পূজা কমিটির শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাসহ মোট সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে কলকাতা পুলিশ। খবর এনডিটিভি'র।
লালবাজার ও স্থানীয় থানা সূত্রের বরাতে জানা গেছে, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়া এবং যথাযথ ভিড় নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা না রাখার দায়ে তাদের আইনের আওতায় আনা হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে এবং এই ঘটনায় অন্য কারও গাফিলতি রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
শনিবার সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে গিরিশ পার্ক থানা এলাকার সারদা পার্ক সংলগ্ন উত্তর কলকাতার ঐতিহ্যবাহী চোরবাগান দুর্গোৎসব মণ্ডপে এই বিপর্যয় ঘটে। এবছর ৯১ বছরে পা দেওয়া এই পূজামণ্ডপটি দেখতে প্রতিবছরই দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায়।
হঠাৎ প্রবল বৃষ্টির কবলে পড়ে মণ্ডপ চত্বরে আশ্রয় নেওয়া হাজার হাজার মানুষ একসঙ্গে হুড়োহুড়ি করে বের হওয়ার চেষ্টা করলে চরম বিশৃঙ্খলা ও পদপিষ্টের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। মণ্ডপের প্রবেশপথ ও বাহির পথ অত্যন্ত সংকুচিত থাকা এবং একটিমাত্র সরু গলি দিয়ে দর্শনার্থীদের চলাচল করায় পরিস্থিতি আরও দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
এছাড়া মণ্ডপের আশপাশের রাস্তায় ভিড় সামলানোর দায়িত্বে থাকা স্বেচ্ছাসেবক ও নিরাপত্তাকর্মীদের চরম ঘাটতি ছিল বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা অভিযোগ করেছেন।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, দুর্ঘটনার পর পরই উদ্ধারকাজে কন্ট্রোল রুম, দমকল বাহিনী, কলকাতা পুলিশ, ডিএমজি দল এবং একাধিক অ্যাম্বুলেন্স দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। আহতদের প্রায় সবাইকে দ্রুত উদ্ধার করে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল (এমসিএইচ) এবং এসএসকেএম হাসপাতালে পাঠানো হয়।
সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৩ জন নারী ও একটি শিশুসহ মোট ১৯ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়। এই দুর্ঘটনায় অন্তত ২৫ থেকে ৩৫ জন গুরুতর আহত হন, যাদের মধ্যে আটজনের অবস্থা এখনও আশঙ্কাজনক।
পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং পরবর্তী ঝুঁকি এড়াতে প্রশাসন দ্রুত ওই পূজামণ্ডপটি দর্শনার্থীদের জন্য অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে।
দুর্ঘটনার পর নড়েচড়ে বসেছে রাজ্য প্রশাসন। দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে পুলিশ ইতিমধ্যেই চোরবাগান দুর্গোৎসব কমিটির শীর্ষ কর্তাব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করেছে। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন পূজা কমিটির সম্পাদক রাজ কুমার সেওদা ও সহসভাপতি শান্তনু দুবে।
এছাড়া মণ্ডপ নির্মাণের ত্রুটি এবং ভিড় ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরাও এই তালিকায় রয়েছেন। তাদের মধ্যে বাঁশের কাঠামো ও প্যান্ডেল নির্মাণের দায়িত্বে থাকা বিপ্লব মুখোপাধ্যায়, ভিড় নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে নিয়োজিত কৌশিক সাহা ও পিন্টু দে, এবং বেসরকারি নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত প্রধান ইনচার্জ সুমন চক্রবর্তী ও রাজেশ পালকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, পূজার মতো জনবহুল উৎসবে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও বিকল্প প্রস্থান পথ নিশ্চিত না করার পেছনে এই আয়োজক ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ গাফিলতি রয়েছে।
দুর্ঘটনার খবর পাওয়া মাত্রই রাজ্যটির রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে তীব্র শোক ও প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি তাৎক্ষণিকভাবে খতিয়ে দেখতে এবং উদ্ধারকাজ তদারকি করতে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং মুখ্যসচিব মনোজ আগরওয়াল অবিলম্বে হাসপাতালে ছুটে যান।
তারা চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে আহতদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন। পাশাপাশি, এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম 'এক্স'-এ দেওয়া এক বার্তায় তিনি নিহতদের আত্মার শান্তি কামনা করেন, শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর প্রতি সমবেদনা জানান এবং আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করেন। সাধারণ মানুষের সহায়তার জন্য রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকেও একটি জরুরি হেল্পলাইন চালু করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে অভিযোগ উঠেছে, এত বড় একটি জনবহুল পুজোমণ্ডপের ভিআইপি যাতায়াতের জন্য একটি আলাদা গলি সংরক্ষিত রাখায় সাধারণ দর্শনার্থীদের চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। প্রস্থান পথের সিঁড়ি ও সংকীর্ণ রাস্তার প্রস্থ মাত্র ১০ থেকে ৩০ ফুটের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকায় উপচে পড়া ভিড় সামাল দেওয়া সম্ভব হয়নি।