জঙ্গলে ফেলে রাখার অভিযোগ, বৃদ্ধাকে ঘরে ফেরাল প্রশাসন

ফরিদপুরের সদরপুরে ৭৫ বছর বয়সী বৃদ্ধা জেলেকা বেগমকে বাড়ি থেকে বের করে জঙ্গলে ফেলে রাখার অভিযোগ উঠেছে তাঁর বড় মেয়ে ময়না বেগমের বিরুদ্ধে। অসুস্থ ও চলাফেরায় অক্ষম এই বৃদ্ধা খোলা আকাশের নিচে মাটিতে শুয়ে দিন কাটাচ্ছিলেন। চারপাশে ছিল মলমূত্র, মশা-মাছি ও পোকামাকড়। রাতে শিয়াল-কুকুর ও বিষধর সাপের আশঙ্কাও ছিল। ঠিকমতো খাবার না দেওয়ার অভিযোগও করেছেন তিনি। তবে মাকে নির্যাতন করে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ময়না বেগম।

জেলেকা বেগমের বাড়ি সদরপুর উপজেলার সদর ইউনিয়নের পূর্ব শ্যামপুর গ্রামে। গত ১০ অক্টোবর রাতে তাকে মারধর করে বাড়ি থেকে বের করে জঙ্গলে ফেলে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।

গত শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) রাত ৯টার দিকে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ঘন জঙ্গলের মধ্যে খোলা আকাশের নিচে মাটিতে শুয়ে কাঁদছেন জেলেকা বেগম। শরীরে জড়ানো ময়লা ও ছেঁড়া কাপড়ের টুকরো। মাথার নিচে প্লাস্টিকের বস্তা। পাশে পরিত্যক্ত শৌচাগার। চারপাশে মলমূত্র, নেই আলো কিংবা নিরাপদ আশ্রয়। মশা-মাছি ও পোকামাকড়ের মধ্যে এভাবেই দিন-রাত কাটছিল তাঁর।

কথা বলার চেষ্টা করলে অস্পষ্ট কণ্ঠে জেলেকা জানান, তাকে ঠিকমতো খাবার দেওয়া হয় না। পাঁচ দিন আগে তাঁকে ঘর থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। এ সময় গলা চেপে ধরা ও লাঠি দিয়ে মারধরের অভিযোগও করেন তিনি। বয়স ও অসুস্থতার কারণে তার কথা স্পষ্টভাবে বোঝা কঠিন হলেও কান্না ও অসহায় অভিব্যক্তিতে ফুটে ওঠে তার দুর্ভোগ।

জেলেকা বেগমের আগে থাকার ঘরটির অবস্থাও শোচনীয়। ঘরে আলো ও বৈদ্যুতিক পাখার ব্যবস্থা নেই। দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন। ফলে ঘরটি বসবাসের উপযোগী কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

জেলেকা বেগমের তিন মেয়ে, কোনো ছেলে নেই। বড় মেয়ে ময়না বেগম (৪৮) স্বামী মস্ত বেপারী, এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে একই গ্রামে থাকেন। মেজ মেয়ে মনি আক্তার (৩৫) সৌদি আরবে থাকেন। ছোট মেয়ে সিমা আক্তার (৩০) আগে সৌদি আরবে থাকলেও বর্তমানে দেশে রয়েছেন। জেলেকা মূলত বড় মেয়ের বাড়িতেই থাকতেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বৃদ্ধা মায়ের দেখাশোনার সুবিধার্থে তার দুই মেয়ের বিদেশ থেকে পাঠানো টাকায় বড় মেয়ের বাড়িতে একটি পাকা ঘর নির্মাণ করা হয়েছিল। সেখানে রেখে মায়ের যত্ন নেওয়ার উদ্দেশ্যেই ঘরটি তৈরি করা হয়। তবে অভিযোগ উঠেছে, সেই ঘরে থাকার সুযোগ হয়নি বৃদ্ধার।

প্রতিবেশী নুরুল ইসলাম বলেন, বৃদ্ধা যেভাবে জঙ্গলে পড়ে ছিলেন, তাতে যেকোনো সময় শিয়াল-কুকুরের আক্রমণের শিকার হতে পারতেন। সেখানে সাপেরও ভয় ছিল। ঘটনার পর থেকে রাতের অন্ধকারে মাটির ওপর একা পড়ে ছিলেন তিনি।

আরেক প্রতিবেশী তোফাজ্জেল অভিযোগ করেন, জেলেকা বেগমকে নিয়মিত খাবার দেওয়া হয় না। কখনো শুধু লবণ দিয়ে ভাত দেওয়া হয়, পানিও ঠিকমতো দেওয়া হয় না। যে পাত্রে তাঁকে খাবার দেওয়া হয়, সেখানে কুকুর-বিড়ালও খায় বলে দাবি করেন তিনি।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বড় মেয়ে ময়না বেগম। তিনি বলেন, তার মা নিজেই ঘর থেকে বের হয়ে যান এবং ঘরে থাকতে চান না। তিনি মাকে মারধর করেন না। তার দাবি, মায়ের থাকার ঘরটি সাধ্য অনুযায়ী পরিষ্কার রাখা হতো। প্রতিদিন সম্ভব না হলেও সপ্তাহে এক-দুই দিন তাঁকে গোসল করানো হতো। তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সত্য নয়।

বৃদ্ধার ১৫ বছর বয়সী নাতি মাসুম বলেন, তাদের সংসারে অভাব-অনটন রয়েছে। নিজেদেরই ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া চলে না। এরপরও দীর্ঘদিন ধরে তারা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী নানিকে দেখাশোনা করছেন এবং খাবার ও কাপড় দিচ্ছেন। তার অভিযোগ, নানির অন্য দুই মেয়ে মায়ের খোঁজ নিতে আসেন না এবং কোনো খরচও দেন না।

এদিকে বিষয়টি জানার পর জেলেকা বেগমকে নিজ বাড়িতে তুলে দেওয়ার উদ্যোগ নেন সদরপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কাজী জাফর। তিনি বলেন, এটি একটি মানবিক বিষয়। ঘটনা জানার পরপরই উদ্যোগ নিয়ে জেলেকা বেগমকে বাড়িতে তুলে দেওয়া হয়েছে।

সদরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শরীফ শাওন বলেন, সাংবাদিকদের মাধ্যমে তিনি বিষয়টি জানতে পেরেছেন। পরে বৃদ্ধার নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় সহায়তার জন্য স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের মাধ্যমে তাকে বাড়িতে তুলে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে তিনি নিরাপদে ও ভালো আছেন। ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে, সে বিষয়ে স্থানীয় চেয়ারম্যানকে বলা হয়েছে।