মানসিক স্বাস্থ্য নিশ্চিতে শুনতে হবে সবার কথা

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে মানসিক চাপ

বিশ্ববিদ্যালয়জীবন অনেকের কাছে স্বপ্নপূরণ ও নতুন সম্ভাবনার সময়। কিন্তু এ সময়েই শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার চাপ, পরীক্ষার উদ্বেগ, ক্যারিয়ার নিয়ে অনিশ্চয়তা, ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানাপড়েন এবং পারিবারিক দ্বন্দ্বের মুখোমুখি হতে হয়। নতুন পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো, পরিবারের প্রত্যাশা পূরণ এবং ভবিষ্যৎ কর্মজীবন নিয়ে দুশ্চিন্তাও তাদের মানসিক সুস্থতাকে প্রভাবিত করতে পারে।

একই অভিজ্ঞতা সবার মনে একই রকম প্রভাব ফেলে না। একজন যে পরিস্থিতি সহজে সামলে নিতে পারেন, অন্যজনের জন্য সেটিই দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপের কারণ হতে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় অনিয়মিত ঘুম, পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবারের অভাব এবং বিশ্রামের সীমিত সুযোগ। অ্যাসাইনমেন্ট, পরীক্ষা ও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ জমা দেওয়ার চাপে অনেক শিক্ষার্থী রাত জেগে পড়াশোনা করেন। দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শারীরিক ক্লান্তি, মনোযোগের ঘাটতি ও আবেগ নিয়ন্ত্রণে অসুবিধা দেখা দিতে পারে।

তাই শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপকে ব্যক্তিগত দুর্বলতা হিসেবে না দেখে তাদের অভিজ্ঞতা, পারিপার্শ্বিক পরিবেশ এবং সহায়তার সুযোগগুলো বিবেচনা করা জরুরি।

যাপিত বাস্তবতার নিরিখে পদক্ষেপ

বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস ২০২৬-এর প্রতিপাদ্য ‘Lived Experiences Heard: Real Voices, Real Change’ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলাই যথেষ্ট নয়; যাদের জীবনে এই অভিজ্ঞতা বাস্তব, তাদের কথাও গুরুত্ব দিয়ে শুনতে হবে। মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে মানবিক ও কার্যকর করতে প্রয়োজন এমন একটি পরিবেশ, যেখানে মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা শুধু শোনা হবে না, বরং সেবার উন্নয়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণেও গুরুত্ব পাবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মানুষের জ্ঞানকে স্বীকৃতি দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। কারণ, কাউকে শোনা আর তার অভিজ্ঞতা সত্যিকার অর্থে বোঝা এক বিষয় নয়।

বাংলাদেশের গবেষণা কী বলছে

বাংলাদেশের শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে ২০২৫ সালে International Health  জার্নালে অনলাইনে প্রকাশিত একটি গুণগত গবেষণায় ৩৮ জন অংশগ্রহণকারীর অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণায় উদ্বেগ, বিষন্নতা, আত্মহত্যার চিন্তা, পারিবারিক দ্বন্দ্ব এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের বিভিন্ন বাধা উঠে আসে। সেবার সীমাবদ্ধতা, মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে অপর্যাপ্ত জ্ঞান ও সামাজিক কলঙ্কও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে চিহ্নিত হয়।

একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় খারাপ ফল করলে আমরা হয়তো তার ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন করি। কিন্তু সে পর্যাপ্ত ঘুমাচ্ছে কি না, নিজেকে একা অনুভব করছে কি না কিংবা কোনো মানসিক চাপের মধ্যে আছে কি না, সেই প্রশ্নগুলোও কি করি?

মানসিক স্বাস্থ্যকে শুধু একাডেমিক ফলাফল কিংবা দৃশ্যমান আচরণ দিয়ে বিচার করা যায় না। অনেক কষ্ট নীরবে থেকে যায়।

‘Lived experience’ : অভিজ্ঞতাও এক ধরনের জ্ঞান

মানসিক স্বাস্থ্যসেবার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মানুষ এমন অনেক বিষয় জানেন, যা শুধু পেশাগত প্রশিক্ষণ বা গবেষণার মাধ্যমে পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়। তারা জানেন, সাহায্য চাইতে গিয়ে কোথায় বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে, কোন আচরণ তাদের স্বস্তি দিয়েছে এবং কোন পরিস্থিতিতে তারা অবহেলিত বোধ করেছেন।

তাই তাদের শুধু অভিজ্ঞতার গল্প বলার সুযোগ দেওয়াই যথেষ্ট নয়। মানসিক স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়ন, সেবার পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও মূল্যায়নেও তাদের অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

অর্থাৎ মানুষের জন্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা তৈরির পাশাপাশি মানুষের সঙ্গে বসে সেই সেবা তৈরি করতে হবে। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিলে সেবাগুলো মানুষের বাস্তব প্রয়োজনের সঙ্গে আরও সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে।

পরিবর্তনের শুরু হোক শোনা থেকে

শিক্ষার্থীদের মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের সম্মিলিত ভূমিকা প্রয়োজন। নিয়মিত ঘুম, পুষ্টিকর খাবার ও বিশ্রামের সুযোগের পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহজলভ্য এবং গোপনীয়তা-সম্মত কাউন্সেলিং সেবা নিশ্চিত করতে হবে। একাডেমিক কার্যক্রমের সময়সূচি আগে থেকে জানানো, কার্যকর ক্যারিয়ার নির্দেশনা দেওয়া এবং শিক্ষার্থীদের কথা বিচার না করে শোনার পরিবেশ তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ।

নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়া

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষে শিক্ষার্থীরা নানা সমস্যার মুখোমুখি হয়, তবে সঠিক উদ্যোগ নিলে এগুলো থেকে উত্তরণের পথ খুঁজে পাওয়া সম্ভব। প্রথমেই নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। নবীনবরণ, ওরিয়েন্টেশন বা সাংস্কৃতিক কার্যক্রম আয়োজন শিক্ষার্থীদের একে অপরের সঙ্গে পরিচিত হতে সাহায্য করে। পাশাপাশি সিনিয়রদের মেন্টরশিপ থাকলে নতুনরা দ্রুত নিজেদের মানিয়ে নিতে পারে।

প্রশাসনের উদ্যোগ

আবাসন সংকটের মতো বড় সমস্যা সমাধানের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত আসনসংখ্যা নিশ্চিত করা দরকার। হলে সিট বণ্টনে স্বচ্ছতা আনা হলে শিক্ষার্থীরা ন্যায্য সুযোগ পাবে। পাশাপাশি যেসব শিক্ষার্থী ভাড়া বাড়িতে থাকে, তাদের জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা ও সহায়ক ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। শিক্ষার্থীদের শারীরিক সুস্থতা রক্ষার জন্য খাবারের মান নিয়েও ভাবতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাফেটেরিয়ায় পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবার সরবরাহ নিশ্চিত করা উচিত।

প্রয়োজন অর্থনৈতিক সহযোগিতা

অর্থনৈতিক সমস্যা কাটিয়ে ওঠার জন্য শিক্ষার্থীদের বৃত্তি, স্টাইপেন্ড বা স্বল্পসুদে শিক্ষাঋণ প্রদানের ব্যবস্থা বাড়ানো উচিত। খ-কালীন চাকরি বা টিউশনের সুযোগ সৃষ্টি করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যারিয়ার সেন্টার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের বাজেট ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক পরিকল্পনা শেখানো প্রয়োজন।

অভ্যাস পরিবর্তন করতে হবে শিক্ষার্থীদের

শিক্ষার্থীদের কিছু অভ্যাসের পরিবর্তন করতে হবে। পুষ্টিকর খাদ্যগ্রহণ শিক্ষার্থীদের সচেতন হতে হবে। তাদের অতিরিক্ত ফাস্টফুড এড়িয়ে স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

ঘুমের অভাব আরেকটি বড় সমস্যা। এর সমাধান করতে হলে শিক্ষার্থীদের সময় ব্যবস্থাপনা দক্ষতা বাড়াতে হবে। রাত জাগা কমিয়ে পর্যাপ্ত ঘুমের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

পারিবারিক ও ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্য রক্ষায় শিক্ষার্থীদের পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখা জরুরি। একই সঙ্গে সময় ব্যবস্থাপনা ও আত্মনিয়ন্ত্রণ চর্চা করলে পড়াশোনা ও ব্যক্তিগত জীবনে ভারসাম্য রাখা সহজ হয়। প্রয়োজনে কাউন্সেলিং সাপোর্ট নেওয়া যেতে পারে।

ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং

যেসব শিক্ষার্থী পছন্দের বিষয়ে ভর্তি হতে পারে না, তাদের জন্য ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং অপরিহার্য। নিজের পড়ার বিষয়কে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করা এবং অন্যান্য কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করা আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সহায়ক হয়। শিক্ষার্থীদের শেখানো দরকার যে প্রতিটি বিষয়ে উন্নতির সুযোগ রয়েছে। একজন শিক্ষার্থী আগ্রহের জায়গাটা বুঝে তার জন্য পড়াশোনাটা সহজ করে তুলতে হবে।

প্রয়োজন শিক্ষক-শিক্ষার্থী সহজ সম্পর্ক

শিক্ষক-শিক্ষার্থী যোগাযোগ উন্নয়নের জন্য শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়ের উদ্যোগ জরুরি। ক্লাসে প্রশ্নোত্তর সেশন বা অফিস আওয়ার চালু করলে শিক্ষার্থীরা সহজে নিজেদের সমস্যার কথা জানাতে পারে। অন্যদিকে শিক্ষকদেরও শিক্ষার্থীদের মানসিকতা বুঝে পাঠদান পদ্ধতি তৈরি করতে হবে।

চাই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে অনেকেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে আত্মহত্যার মতো হঠকারি সিদ্ধান্ত নেয়। এই অবস্থা থেকে উত্তোরণের জন্য আমাদের প্রশ্ন শুধু হওয়া উচিত নয় আমরা মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে কতটা জানি? বরং প্রশ্ন করা প্রয়োজন, মানসিক স্বাস্থ্য যাদের দিন দিন নিম্নগামী তাদের কথা কি আমরা সত্যিই শুনছি? কারণ, শুধু শোনা যথেষ্ট নয়। সত্যিকারের পরিবর্তন আসে যখন আমরা তাদের মুখোমুখি হওয়া বাস্তবতাকে আমলে নিই এবং সে অনুযায়ী কাজ করি।

এই অবস্থা থেকে উত্তোরণের জন্য বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা আরও সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী করতে হবে। একই সঙ্গে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মানুষদের মতামতকে নীতি ও সেবা উন্নয়নের অংশ করতে হবে। ‘ও খুব দুর্বল’ কিংবা ‘বেশি চিন্তা করে’ এমন মন্তব্যের পরিবর্তে আমাদের জানতে হবে, মানুষটি কী পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন এবং তার কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন।

লেখক : ট্রেইনি এডুকেশনাল সাইকোলজিস্ট, ছাত্র পরামর্শ ও নির্দেশনা কেন্দ্র, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়