সিজিপিএকে নিজের পরিচয় হতে দেয়নি সিয়াম

আপডেট : ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৫৩ এএম

শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই ভালো ছাত্রের তকমা গায়ে জড়িয়ে যায় নাজমুল হাসান সিয়ামের। প্রতিটা বোর্ড পরীক্ষায় কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে এগিয়ে চলা, সর্বশেষ নটর ডেম কলেজ থেকে এইচএসসিতে গোল্ডেন এ প্লাস প্রাপ্তি। একবুক স্বপ্ন আর তীব্র আশা নিয়ে ভর্তি হন বাংলাদেশ কৃষি বিশ^বিদ্যালয়ের (বাকৃবি) ভেটেরিনারি সায়েন্স অনুষদে। কিন্তু বিশ^বিদ্যালয়ের গ-ি পার হতেই সিজিপিএ যখন ২.৭৯, তখন যেন থমকে যায় সব স্বপ্ন।

কম সিজিপিএ নিয়ে হতাশা, সমালোচনা ও অপমান এক সময় সবকিছু তাকে ঘিরে ধরে। একপর্যায়ে পড়াশোনার প্রতিও আগ্রহ হারিয়ে ভেঙে পড়েন। সিজিপিএকে সবার থেকে অনেকটা লুকিয়ে  রাখতে চেয়েছিলেন। তবে যে ফলাফল একসময় বড় ধাক্কা ছিল, পরে সেটাই হয়ে ওঠে ঘুরে দাঁড়ানোর অণুপ্রেরণা। হাল না ছেড়ে গবেষণাকে সঙ্গী করে নতুন করে নিজেকে তৈরি করেন সিয়াম। সেই ধারাবাহিকতায় তিনি বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়ার জিওনবুক ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে প্রফেসরের সম্পূর্ণ অর্থায়নে শারীরতত্ত্ব বিষয়ে দুই বছরের ফুলফান্ডেড মাস্টার্স প্রোগ্রামে সুযোগ পেয়েছেন।

সিজিপিএকে পরিচয় নয়

সিজিপিএ কম হওয়ার কারণে প্রতিনিয়ত সমালোচনা ও অপমানের মুখোমুখি হতে হয়েছে সিয়ামকে। তখন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সিজিপিএকে নিজের পরিচয় হতে দেবেন না। গবেষণা, প্রকাশনা, কারিগরি দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দিয়ে নিজের যোগ্যতা তৈরিতে মনোনিবেশ করেন। সুযোগের অপেক্ষা না করে নিজেকেই সুযোগের উপযোগী করেছেন।

বিদেশে উচ্চশিক্ষার আগ্রহ যেভাবে

শুরুতে বিদেশে পড়াশোনার পরিকল্পনা ছিল না সিয়ামের। মেডিকেলে ভর্তি হতে না পেরে বাবার পরামর্শে বাকৃবির ডিভিএমে ভর্তি হন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরুতে লক্ষ্য ছিল বিসিএস ক্যাডার হওয়ার। প্রথম সেমিস্টারের ফলাফলে হতাশ হন। ভাবতে থাকেন, এর বাইরে কি কিছু করা সম্ভব? বিদেশফেরত শিক্ষক ও আন্তর্জাতিক গবেষণার সঙ্গে পরিচয়ের মাধ্যমে গবেষণায় আগ্রহ তৈরি হয়। পরে গবেষণাপত্র প্রকাশ শুরু হলে বিদেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন আরও দৃঢ় হয়।

দ্বিতীয় বর্ষে থাকতে রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে গবেষণা শুরু করেন। তার গবেষণার মূল ক্ষেত্র অণুজীববিজ্ঞান, বিশেষ করে ভাইরাসবিজ্ঞান ও সংক্রামক রোগ। হেপাটাইটিস বি, মুরগির রক্তশূন্যতা ভাইরাস, গবাদিপশুর ভাইরাসজনিত ডায়রিয়া, ফাউলপক্স, এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা, বিড়ালের প্যানলিউকোপেনিয়া ও নিউক্যাসল রোগ নিয়ে কাজ করেছেন সিয়াম। গবেষণার পাশাপাশি নমুনা সংগ্রহ, ডিএনএ ও আরএনএ পৃথকীকরণ, পিসিআরসহ বিভিন্ন পরীক্ষাগার কৌশল এবং গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণের অভিজ্ঞতা রয়েছে। অক্সফোর্ড বিশ^বিদ্যালয়ের একটি গবেষণা সহযোগিতা প্রকল্পে গর্ভবতী নারীদের মূত্রনালির সংক্রমণ নিয়েও কাজ করেছেন এই গবেষক।

পড়াশোনা, সঙ্গে গবেষণা

পড়াশোনার পাশাপাশি বিদেশ যাওয়ার প্রস্তুতি ও গবেষণা চালিয়ে যাওয়া বেশ চ্যালেঞ্জিং ছিল তার জন্য। নমুনা সংগ্রহের জন্য কখনো দুই-তিন দিন বাইরে থাকতে হয়েছে। আবার পরীক্ষার সময়ও গবেষণার কাজকে সময় দিতে হয়েছে। স্নাতক পর্যায়ে অনেক রাত পর্যন্ত গবেষণাগারে কাজ করেছেন, কখনো রাত দুটোও বেজেছে। গবেষণার জন্য এ সময় ব্যয়কে কখনো অতিরিক্ত কাজ হিসেবে না দেখে, বরং ভবিষ্যৎ পেশার জন্য বিনিয়োগ হিসেবে দেখেছেন।

প্রকাশিত গবেষণাপত্র

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জার্নালে সিয়ামের মোট ১৬টি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। পাশাপাশি দুটি বইয়ের অধ্যায়ে কন্ট্রিবিউটর হওয়ার সুযোগ হয়েছে। এর মধ্যে একটি ইতিমধ্যে প্রকাশিত এবং অন্যটি পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে। তবে শুধু গবেষণাপত্রের সংখ্যা দিয়ে নিজের অর্জনকে বিচার করেন না সিয়াম। তিনি বলেন, প্রতিটি গবেষণা প্রকল্পই আমাকে নতুন কিছু শেখার সুযোগ করে দিয়েছে। নতুন গবেষণাকৌশল আয়ত্ত করা, বিভিন্ন সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করা এবং গবেষণার নতুন দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন, প্রতিটি কাজ থেকে এসব শিখেছি।’

নতুনদের জন্য পরামর্শ

বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিতে আগ্রহীদের জন্য সিয়ামের পরামর্শ, প্রথমেই নিজের লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। শেষ বর্ষে গিয়ে প্রস্তুতি শুরু না করে প্রথম বা দিতীয় বর্ষ থেকেই কোন দেশে, কোন বিষয়ে এবং কোন বৃত্তির মাধ্যমে যেতে চান তা ঠিক করতে হবে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আগে থেকেই গুছিয়ে রাখতে হবে। পাশাপাশি ইংরেজি, যোগাযোগ, উপস্থাপনা ও গবেষণার দক্ষতা বাড়াতে হবে। গবেষণাভিত্তিক উচ্চশিক্ষায় আগ্রহীদের যত দ্রুত সম্ভব গবেষণাগারের অভিজ্ঞতা নেওয়া উচিত। শুধু সিজিপিএ নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা না করলেও একে অবহেলা করা যাবে না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ধারাবাহিকতা।

শিক্ষার্থী, তৃতীয় বর্ষ, কৃষি অনুষদ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত