ইশরাককে পদত্যাগের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

রাজধানীর দয়াগঞ্জে মাদকবিরোধী অভিযানে প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করার ঘটনায় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল রবিবার বিকেলে সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে ইশরাককে ডেকে পাঠান প্রধানমন্ত্রী। সেখানে তাকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করেছেন।

এদিকে পদত্যাগের নির্দেশের বিষয়টি গুজব বলে উল্লেখ করে এতে কান না দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন ইশরাক হোসেন।  তার প্রেস কর্মকর্তা মাহফুজ কবির স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের ‘পদত্যাগ’ বা ‘তাকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে’ মর্মে যে সংবাদটি প্রচারিত হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ অসত্য, ভিত্তিহীন, বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।’

অন্যদিকে প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র (পিস্তল) ব্যবহারের ঘটনায় তদন্তে নেমেছে পুলিশ। এ বিষয়ে গতকাল রাজধানীর মিন্টো রোডে এক সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ওয়ারী বিভাগের উপপুলিশ কমিশনারকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্তে আইনের ব্যত্যয়ের প্রমাণ পেলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ‘আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন ও ব্যবহার নীতিমালা, ২০১৬’ অনুযায়ী বৈধ অস্ত্র ব্যবহার করে কাউকে ভয়ভীতি প্রদর্শন, প্রদর্শনীবাজি বা হয়রানি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। অপরাধী ধরার জন্য বা কোনো আইন প্রয়োগের উদ্দেশ্যে ব্যক্তিগত অস্ত্র প্রকাশ্যে উঁচিয়ে অভিযান চালানো এই নীতিমালার পরিপন্থী এবং এটি আইনত দ-নীয় অপরাধ।

এর আগে গত শনিবার বিকেলে প্রতিমন্ত্রী ইশরাক তার ব্যক্তিগত ফেসবুক পেজে মাদকবিরোধী অভিযানের একটি ভিডিও শেয়ার করেন। সেখানে তিনি লিখেন, ঢাকা-৬ আসনে মাদকের কোনো জায়গা হবে না। আইন ভেঙে অস্ত্র হাতে প্রতিমন্ত্রীর অভিযান চালানোয় দেশজুড়ে সমালোচনা হয়। এ নিয়ে উদ্বেগও প্রকাশ করেছেন আইনজ্ঞরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাদক নির্মূলে জনপ্রতিনিধিদের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। মাদক কারবারের কারণে কোনো এলাকার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হলে তাদের পাশে দাঁড়ানো, অপরাধের তথ্য সংগ্রহ করা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহযোগিতা করা জনপ্রতিনিধির দায়িত্বশীল ভূমিকার অংশ। কিন্তু ভালো উদ্দেশ্য থাকলেই আইন প্রয়োগের নির্ধারিত প্রক্রিয়া উপেক্ষা করা যায় না। বাংলাদেশের অস্ত্র আইন, ১৮৭৮-এর ১৩ ও ১৯ ধারা অনুযায়ী, লাইসেন্স ছাড়া বা লাইসেন্সের শর্ত লঙ্ঘন করে সশস্ত্র হয়ে চলাফেরা করলে শাস্তির বিধান রয়েছে। এ ঘটনায় অস্ত্রের লাইসেন্স ও ব্যবহারের পরিস্থিতি যাচাই করা প্রয়োজন।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেন, আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য; সন্দেহভাজন অপরাধীদের আটক বা শাস্তি দেওয়ার জন্য নয়। তার মতে, সাধারণ নাগরিকের আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়াই অপরাধ; নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ও মন্ত্রীর ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুতর। এ ধরনের কর্মকা- ক্ষমতার অপব্যবহার এবং পুলিশের প্রতি অনাস্থার বার্তা দেয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুপ্রিমকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, কোনো এমপি-মন্ত্রী এ ধরনের অভিযান চালাতে পারেন না। তাদের সেই ক্ষমতা নেই। অভিযান পরিচালনা করবে পুলিশ, এমপি-মন্ত্রীরা অভিযানের বিষয়ে নির্দেশনা বা পরিকল্পনা দিতে পারেন। প্রতিমন্ত্রীর অস্ত্র প্রদর্শনের বিষয়ে তিনি বলেন, অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু শর্ত থাকে। এ ধরনের অভিযানে অস্ত্র প্রদর্শনের জন্য কাউকে লাইসেন্স দেওয়া হয় না।

অভিযানে অংশগ্রহণকারী ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক পাভেল শিকদার গণমাধ্যমকে বলেন, বিকাল ৩টা থেকে সাড়ে ৩টার দিকে তারা সেখানে যান। স্থানীয় লোকজনের বারবার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিমন্ত্রী সেখানে গিয়েছিলেন। পুলিশকেও জানানো হয়েছিল। তবে পুলিশ পৌঁছাতে দেরি করে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ তৌহিদুল হক বলেন, একজন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা ও সহযোগিতা দেওয়া। আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন, কাউকে লক্ষ্য করে অস্ত্র তাক করা কিংবা বলপ্রয়োগের বৈধতা নির্ভর করবে ঘটনার পরিস্থিতি ও প্রযোজ্য আইনের ওপর। এ ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে আইনগত বৈধতা নির্ধারণ করা জরুরি।

অস্ত্র হাতে প্রতিমন্ত্রীর অভিযানে ক্ষোভ প্রকাশ করে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য নাবিলা ইদ্রিস ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, একজন প্রতিমন্ত্রী বন্দুক হাতে রাস্তায় লোকজনকে ধাওয়া করছেন। মাই গড। তিনি আবার মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের। বন্দুক হাতে লোকজন ধাওয়া করা তার দায়িত্বের মধ্যে কীভাবে পড়ে?

গে-ারিয়া থানার ওসি মনিরুজ্জামান মনির বলেন, প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন ছয়জনকে আটক করে থানায় ফোন দেন। পরে থানা থেকে পুলিশ সদস্যরা গিয়ে তাদের নিয়ে আসে। আটক ব্যক্তিদের কাছে সাদা পাউডারজাতীয় পদার্থ পাওয়া গেছে। সেগুলো হেরোইন কি না, তা পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যাবে।

ইশরাকের ব্যাখ্যা : গতকাল রবিবার দুপুরে এক বিবৃতিতে মাদকবিরোধী অভিযানে অস্ত্র প্রদর্শনের কারণ ব্যাখ্যা করে ইশরাক হোসেন বলেন, ‘কর্মসূচিতে যাওয়ার আগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নিজস্ব গোয়েন্দা সূত্র থেকে তার নিরাপত্তাঝুঁকি এবং মাদক কারবারিরা ছাদ থেকে গুলি চালাতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছিল। কর্মসূচি চলাকালে একটি অস্থায়ী মাদকের আস্তানার কাছে পৌঁছালে ৩০ থেকে ৩৫ জন ব্যক্তি তাদের গাড়িবহরের দিকে মারমুখী ভঙ্গিতে এগিয়ে আসেন। এ সময় সম্ভাব্য হামলা ও জানমালের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে তিনি এবং তার সরকারি নিরাপত্তারক্ষীরা গাড়ি থেকে নেমে অল্প সময়ের জন্য আত্মরক্ষার্থে অস্ত্র উঁচিয়ে ধরেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর অস্ত্র যথাস্থানে রাখা হয়। প্রদর্শিত আগ্নেয়াস্ত্রটি লাইসেন্সপ্রাপ্ত এবং এটি আত্মরক্ষার উদ্দেশ্যেই ব্যবহার করা হয়েছিল।’