বুকিং ইনভয়েস আছে, নেই শুধু ওরা চারজন

স্ত্রী আফসানা, দুই মেয়ে ৭ বছর বয়সী রোবাইনা এবং ৩ বছর বয়সী সুনাইনাকে নিয়ে কক্সবাজার গিয়েছিলেন নাহিদুর রহমান তুহিন (৪০)। রাতভর সমুদ্রের দোলা উপভোগ করে অবস্থান করছিলেন উখিয়ার ইনানীতে টুপটুপ রেস্ট্রো অ্যান্ড রিসোর্টে। কথা ছিল ১৮ অক্টোবর (রবিবার) দুপুরে তাদের রিসোর্ট ছাড়ার। কিন্তু এর আগেই আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়ে ছাই পরিবারটি। একসঙ্গে চারটি প্রাণের এভাবে মৃত্যুতে নাহিদুরের গ্রামের বাড়ি যশোরের মনিরামপুর পৌরশহরের মোহনপুর কারিকরপাড়ায় চলছে শোকের মাতম। এ মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না পরিবার। ছেলে, পুত্রবধূ ও দুই নাতনিকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ বৃদ্ধা মতিয়ার রহমান।

নাহিদুর ঢাকার শ্যামলীতে গ্র্যান্ড পাওয়ার লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ছিলেন। পরিবার নিয়ে থাকতের মিরপুরের শেওড়াপাড়ায়। তিনি মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সপ্তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন। টুপটুপ রিসোর্টের ইনভয়েস সূত্রে জানা যায়, নাহিদুর ১৬ থেকে ১৮ অক্টোবর দুই রাতের জন্য ২০২ নম্বর সুপার ডিলাক্স কক্ষ বুক করেছিলেন।  রিসোর্ট ছাড়ার কথা ছিল ১৮ অক্টোবর দুপুর ১টায়। এর আগে শনিবার সকালে রিসোর্টে ঘটে ভয়াবহ অগ্নিকা-ের ঘটনা। গতকাল রবিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ১০ জনের মরদেহ উদ্ধারের তথ্য নিশ্চিত করে পুলিশ। এর মধ্যে ছয়জনের পরিচয় প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবে কোনটি কার মরদেহ, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। 

ঘটনার দুই দিন পার হলেও নাহিদুরদের সন্ধান পায়নি স্বজনরা। নিখোঁজ নাহিদুরের বড় ভাই জাহিদুর রহমান জানান, অগ্নিকা-ের খবর পাওয়ার পর থেকে ছোট ভাই, ভাইয়ের স্ত্রী ও দুই ভাতিজির কোনো খোঁজ মিলছে না। তারা আগুনে পুড়ে যাওয়া অজ্ঞাতপরিচয়ের লাশগুলোর মধ্যে রয়েছেন কি না, তা নিশ্চিত হতে তিনি সিলেট থেকে কক্সবাজারে পৌঁছেছেন। তিনি বলেন, ‘যে চারটি লাশ রয়েছে, তার মধ্যে দুটি শিশুর। তবে আমরা এখনো নিশ্চিত হতে পারছি না। চেহারা চেনার মতো কোনো পরিস্থিতি নেই। আহতদের মধ্যেও আমার ভাই ও তার স্ত্রী নেই। পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চলছে। চূড়ান্ত শনাক্তের জন্য আমার ডিএনএ নমুনা নেওয়া হয়েছে।’

একটি পরিবার এভাবে এক নিমেষে হারিয়ে যাওয়ায় মনিরামপুরের মোহনপুর কারিকরপাড়া জুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। স্বজন ও প্রতিবেশীদের চোখের পানিতে ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। দিনভর স্থানীয় লোকজন ভিড় করছেন নাহিদুরের গ্রামের বাড়িতে।

নাহিদুরের ফুফু রোকসানা আক্তার রূপালী কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘আমার বাজান মারা গেছে, আমি বিশ্বাস করি না। আমার বাজানের ফুটফুটে দুটি সন্তানও ছিল। ওরা যখন গ্রামে আসত; তখন বাড়িতে আনন্দ উল্লাসে মাতিয়ে রাখত সারাবাড়ি।’ আহাজারি করে তিনি বলতে লাগলেন, ‘নাহিদুরের মা সরকারি চাকরি করত। ওর মা নাহিদুরকে আমার কাছে রেখেই অফিসে যেত। ছোটবেলা থেকেই ওর দুধ মা ছিলাম আমি। আল্লাহ, তারা কোথায় কীভাবে আছে জানি না। তাদের তুমি বাঁচিয়ে দাও।’

কিছুদিন আগে স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী ছিলেন নাহিদুরের বাবা মতিয়ার রহমান। নিয়মিত নাহিদুরের ঢাকার বাসায় গিয়ে চিকিৎসা নিতেন। অগ্নিকান্ডের আগের দিন অর্থাৎ শুক্রবার রাতেও বাবার সঙ্গে শেষ কথা হয় নাহিদুরের। ওই সময় আগামী বুধবার ঢাকার বাসায় যেতে বলেন নাহিদুর। বাকরুদ্ধ মতিয়ার রহমান বলছিলেন, ‘বাবা তুমি চিন্তা করো না। তোমার নাতিরা সি-বিচে আছে, বাচ্চারা খেলছে। মঙ্গলবার ঢাকায় ফিরব। বুধবার তুমি ঢাকার মিরপুরের বাসায় চলে যেয়ো। ছোট ছেলের সঙ্গে ঢাকায় থাকি। মাস দেড়েক আগে গ্রামে এসেছি। বুধবার ঢাকায় ফিরে যাওয়ার কথা ছিল। শুক্রবার রাতেও কথা হয়। সবাইকে নিয়ে বিচে আনন্দ করছিল। ওদের সঙ্গে আর কথা হবে না...।’

যশোরের মনিরামপুর থানার ওসি আবু সাঈদ বলেন, ‘নাহিদের বড় ভাই জাহিদুর রহমান কক্সবাজারে পৌঁছেছেন। যতটুকু জানা গেছে, নাহিদের পরিবারের লাশ শনাক্ত হয়নি। যে লাশগুলো রয়েছে, সেগুলোর ডিএনএ পরীক্ষা ছাড়া নিশ্চিতভাবে কিছুই বলা যাবে না।’

উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান মজুমদার জানান, ‘টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকা-ের ঘটনায় ২৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে পুলিশ। এর মধ্যে রিসোর্টের মালিক একজন মো. তানভীরকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। নিহত ১০ জনের মধ্যে ছয়জনের পরিচয় প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবে নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে কোনটি কার লাশ, সেটি নিশ্চিত হওয়া যায়নি। অজ্ঞাত চারজনের মধ্যে দুই নারী, এক শিশু ও এক পুরুষের লাশ রয়েছে। নিখোঁজ স্বজনদের ডিএন সংগ্রহ করা হয়েছে।’