কেয়ার ঋণে ফেঁসেছে ৪ ব্যাংক

কেয়া কসমেটিকস লিমিটেডকে ঋণ দিয়ে চার প্রাইভেট ব্যাংক বেকায়দায় পড়েছে। চারটি ব্যাংকে তাদের ঋণের পরিমাণ অনারোপিত সুদসমেত তিন হাজার কোটি টাকার বেশি। ব্যাংকগুলো হচ্ছে সাউথইস্ট ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক ও স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বর্তমান বাজারমূল্যে পৌনে তিনশ কোটি টাকার মর্টগেজে সাউথইস্ট ব্যাংক কেয়া কসমেটিকসের কাছে এক হাজার সাতশ কোটি টাকা পায়। দুশ কোটি টাকারও কম বাজারমূল্যের সম্পদ মর্টগেজে ন্যাশনাল ব্যাংক কেয়া কসমেটিকসের কাছে পায় সাড়ে সাতশ কোটি টাকা। দেড়শ কোটি টাকার সম্পত্তি মর্টগেজে পূবালী ব্যাংক কেয়া গ্রুপের কাছে পায় সোয়া পাঁচশ কোটি টাকা। এ ছাড়া স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া হয়েছে প্রায় একশ কোটি টাকা। সূত্র জানায়, কেয়া গ্রুপের ঋণ আদায় নিশ্চিত করতে না পারলে চার ব্যাংককেই ঋণের অভিঘাত দীর্ঘমেয়াদে টানতে হবে। 

জানা গেছে, কেয়া কসমেটিকস ব্যাংকগুলো থেকে যে পরিমাণ টাকা ঋণ নিয়েছে, তার থেকে তাদের মর্টগেজ রাখা সম্পত্তির বাজারমূল্য ৩০ শতাংশেরও কম। গল্পটা এখানেই শেষ নয়, ব্যাংকঋণ পরিশোধ না করতে টালবাহানা করছেন কেয়া কসমেটিকস লিমিটেডের চেয়ারম্যান আবদুল খালেক পাঠান। কেয়া কসমেটিকস দাবি করছে, রপ্তানি আয় তাদের এফসি হিসাবে জমা করেনি ঋণদাতা ব্যাংকগুলো। গল্পটা হলমার্ক-কেলেঙ্কারির কথা মনে করিয়ে দেয়।

আরও জানা গেছে, ব্যাংকের ঋণের দায় থেকে মুক্ত হতে নয়ছয় করে চলেছেন কেয়া গ্রুপের চেয়ারম্যান। ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে মনগড়া অভিযোগ এনে দফায় দফায় চিঠি দিচ্ছে কেয়া গ্রুপ। রপ্তানি আয় জমা হয়নি দাবি করে ব্যাংকের বিরুদ্ধে কেয়া গ্রুপের একাধিক চিঠি দেশ রূপান্তরের হাতে এসেছে। ব্যাংকসূত্র জানায়, ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে কেয়ার অভিযোগ হলো গ্রুপের রপ্তানি আয় প্রতিষ্ঠানটির এফসি হিসাবে জমা হয়নি। তবে সুনির্দিষ্ট করে কোন কোন রপ্তানি আয় তাদের হিসাবে জমা হয়নি, তা বলতে পারছে না কেয়া গ্রুপ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ব্যাংকগুলোর একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, কেয়া গ্রুপের চেয়ারম্যানের অভিযোগটি মনগড়া ও ভিত্তিহীন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তেও কেয়ার অভিযোগের পক্ষে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণখেলাপি হতে চান। কেয়া কসমেটিকস গ্রুপকে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি চিহ্নিত করে একটি ব্যাংক চিঠিও ইস্যু করেছে। ঋণদাতা ব্যাংকগুলো কেয়া কসমেটিকসের বিরুদ্ধে অর্থঋণ আদালতে ও সিআর মামলা রুজু করেছে। মামলাগুলো চলমান রয়েছে।

কেয়া গ্রুপের রপ্তানি আয় জমা হয়নি এমন অভিযোগ আমলে নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক তদন্তে নামে। তদন্ত প্রতিবেদন দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) জমা দেওয়া হয়েছে। দুদকের একজন উপপরিচালক মামলাটির তদন্ত করছেন। দুদকসূত্র জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদনে রপ্তানি আয় কেয়া গ্রুপের ব্যাংক হিসাবে জমা না হওয়ার যে অভিযোগ তোলা হয়েছে তার সত্যতা পাওয়া যায়নি।

দুদকসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে কেয়া কসমেটিকস গ্রুপকে দায়ী করা হয়েছে। বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান আবদুল খালেক পাঠান রপ্তানি আয় অন্যত্র স্থানান্তর করেছেন। মানিলন্ডারিংয়ের বিষয়টিও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

দুদকসূত্র জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে উঠে এসেছে সাউথইস্ট ব্যাংক পিএলসি, গুলশান শাখা; পূবালী ব্যাংক পিএলসি প্রিন্সিপাল শাখা; ন্যাশনাল ব্যাংক পিএলসি গুলশান শাখা  ও স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক পিএলসি গুলশান শাখা থেকে কেয়া গ্রুপের প্রত্যাবাসিত রপ্তানি আয় গ্রাহকের হিসাবে (কেয়া গ্রুপে) জমা হয়েছে। তবে রপ্তানি আয়ের মাধ্যমে ইমপোর্ট পেমেন্টের দায় ও বিভিন্ন ধরনের চার্জ সমন্বয়,  এআইটি পরিশোধ ও বিবিধ চার্জ কেটে নেওয়ার পর অবশিষ্ট অর্থ কেয়ার ব্যাংক হিসাবে জমা হয়েছে। ব্যাংকসূত্র দাবি করেছে, কেয়া গ্রুপ ব্যাংকঋণ পরিশোধ করতে চায় না, ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণখেলাপি হতে চায়।

দুদকসূত্র জানায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শনে দেখা গেছে, সাউথইস্ট ব্যাংক গুলশান শাখা ২০০৪ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ব্যাংকটির মাধ্যমে প্রায় ৮ হাজার ৪৩৩ কোটি টাকার রপ্তানি আয় অপ্রত্যাবাসিত হয়েছে। ওই রপ্তানি আয় থেকে প্রায় ৭ হাজার ৩১৮ কোটি টাকা ইমপোর্ট পেমেন্ট দেওয়া হয়েছে। এলসি কমিশন, বায়িং হাউজ কমিশন, রপ্তানিসংশ্লিষ্ট চার্জ ও অন্যান্য চার্জ বাবদ প্রায় ১২১ কোটি টাকা কাটা হয়েছে। অবশিষ্ট প্রায় ৯৯৪ কোটি টাকার সঙ্গে ১২০ কোটি টাকার রপ্তানি-প্রণোদনা ও ব্যাংক-দায় বাবদ প্রায় ১ হাজার ৬৭৮ কোটি টাকা যুক্ত হয়ে ওই অর্থ হতে ৮৮৩ কোটি টাকা সুদ বাবদ কাটা হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে প্রায় ১ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা ব্যাংক কর্তৃক গ্রাহক প্রতিষ্ঠানের চলতি হিসাবে স্থানান্তর করা হয়েছে।

পূবালী ব্যাংক প্রিন্সিপাল শাখা থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী কেয়া গ্রুপ কর্তৃক ২০০৪ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত  ব্যাংকটির মাধ্যমে প্রায় ৭২২ কোটি টাকা রপ্তানি আয় অপ্রত্যাবাসিত হয়েছে। ওই রপ্তানি আয় হতে প্রায় ৫৪৩ কোটি টাকা ইমপোর্ট পেমেন্ট দেওয়া হয়েছে। কমিশন ও চার্জ এবং সোর্স ট্যাক্স, ভ্যাট বাবদ ৩.৩৪ কোটি টাকা কাটা হয়েছে। অবশিষ্ট প্রায় ১৭৫ কোটি টাকা থেকে ৩১ কোটি টাকা প্যাকিং ক্রেডিট, ২২.০১ কোটি টাকা আইবিপি ও ১.৫৯ কোটি টাকা পিএডি বাবদ সমন্বয় করা হয়েছে। ১৪.০৮ কোটি টাকা বিল্ডআপ মার্জিন ও ৫.৪১ কোটি টাকা ইআরকিউ হিসাবে স্থানান্তর করে ১০১.৩৮ কোটি টাকা গ্রাহকের চলতি হিসাবে প্রদান করা হয়েছে।

ন্যাশনাল ব্যাংক গুলশান শাখা থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী ২০১২ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ব্যাংকটির মাধ্যমে ২৭০ লাখ মার্কিন ডলারের রপ্তানি আয় প্রত্যাবাসিত হয়েছে। ওই রপ্তানি আয় থেকে ১২০ লাখ  মার্কিন ডলার এফসিবিপিএআর হিসাবের মাধ্যমে ইমপোট পেমেন্ট দেওয়া হয়েছে। অবশিষ্ট মার্কিন ডলার  থেকে ০.৪৮ লাখ মার্কিন ডলারের মাধ্যমে বিভিন্ন ঋণ সমন্বয় করা হয়েছে। ১.৩২ লাখ মার্কিন ডলার বিভিন্ন ধরনের চার্জ বাবদ কাটা হয়েছে। এ ছাড়া ৯১.৮৭ লাখ মার্কিন ডলার প্রতিষ্ঠানটির চলতি হিসাবে জমা হয়েছে।

স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক গুলশান শাখা থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী কেয়া গ্রুপ ২০০৪ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ব্যাংকটির মাধ্যমে ৬০.১৭ কোটি টাকার রপ্তানি আয় প্রত্যাবাসিত হয়েছে। ওই রপ্তানি আয় থেকে ৪৩.৯৭ কোটি টাকা এফডিবিপি লোন রি-পেমেন্ট ও ১৫.১১ কোটি টাকা লোন রি-পেমেন্ট (টার্ম, পিএডি, টিআর এবং অন্যান্য) বাবদ ব্যয় করা হয়েছে। অবশিষ্ট অর্থ প্রতিষ্ঠানের চলতি হিসাবে স্থানান্তর করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত বলছে, কেয়া কসমেটিকস গ্রুপ রপ্তানি আয় তাদের বৈদেশিক মুদ্রার (এফসি) হিসাবে জমা না হওয়ার যে অভিযোগ চার ব্যাংকের বিরুদ্ধে এনেছে, তার ভিত্তি পাওয়া যায়নি।

এ প্রসঙ্গে জানতে কেয়া কসমেটিকস লিমিটেডের চেয়ারম্যান আবদুল খালেক পাঠানকে একাধিকবার ফোন করেও কথা বলা সম্ভব হয়নি।