প্যারিসে লুটপাটে বিপর্যস্ত ৮ বাংলাদেশি ব্যবসায়ী

ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে গত শনিবারের (১৭ অক্টোবর) সহিংসতা ও লুটপাটে অন্তত আটটি বাংলাদেশি মালিকানাধীন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মোবাইল ফোন, ইলেকট্রনিকস ও মানি ট্রান্সফার ব্যবসার এসব প্রতিষ্ঠানে পণ্য ও নগদ অর্থ লুটের অভিযোগ উঠেছে।

প্রাথমিক হিসাবে, সম্মিলিত ক্ষতির পরিমাণ সাত লাখ ইউরো ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। ঘটনার পরও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ কাটেনি তাঁদের। ভবিষ্যতে আবারও লুটপাটের ঘটনা ঘটতে পারে, এমন শঙ্কায় রয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তারা। 

দীর্ঘদিনের সঞ্চয়, ঋণ ও বিনিয়োগ দিয়ে গড়ে তোলা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কয়েকজন উদ্যোক্তা এখন চরম আর্থিক অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। নতুন করে ব্যবসা চালু করা, কর্মচারীদের বেতন দেওয়া, দোকানভাড়া পরিশোধ এবং সরবরাহকারীদের পাওনা মেটানো নিয়ে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ।

এ পরিস্থিতিতে ক্ষতিপূরণ আদায়, ব্যবসা পুনরুদ্ধার এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ দূতাবাসের কূটনৈতিক উদ্যোগ ও ফরাসি প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বিত যোগাযোগের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

ক্ষতিগ্রস্ত আটটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে জিএসআর ইনফরমেটিক, থ্রি-জি ইনফরমেটিক, প্যারিস টেলিকম, আয়মান সার্ভিস, থ্রি-ডি ইনফরমেটিক, ফোন স্টোর, বদি টেলিকম ও রাফিদ ইলেকট্রনিকস। এসব প্রতিষ্ঠানের পূর্ণাঙ্গ ক্ষয়ক্ষতির হিসাব এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

রাফিদ ইলেকট্রনিকসের স্বত্বাধিকারী রবিউল হাসানের দাবি, তাঁর দোকানে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার ইউরো মূল্যের পণ্য ছিল। দোকান বন্ধ ও তালাবদ্ধ থাকা অবস্থায় লুটপাটের ঘটনায় তিনি ব্যবসার প্রায় পুরো পুঁজি হারিয়েছেন। নতুন করে ব্যবসা শুরু করা নিয়েও অনিশ্চয়তায় রয়েছেন তিনি।

অন্যদিকে, ব্যবসায়ী আজিম উদ্দিনের মালিকানাধীন ফোন স্টোর ও বদি টেলিকমে লুটপাটের ঘটনায় প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার ইউরো ক্ষতি হয়েছে বলে তাঁর দাবি। এর মধ্যে একটি দোকানের রিয়া মানি ট্রান্সফার কাউন্টারে প্রায় ৩০ হাজার ইউরো নগদ অর্থ ছিল বলেও জানিয়েছেন তিনি।

Paris protest

দুই ব্যবসায়ীর দাবি অনুযায়ী, তাঁদের ঘোষিত ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩ লাখ ইউরো। বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষয়ক্ষতির হিসাব যুক্ত হলে মোট ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। তবে সাত লাখ ইউরোর বেশি ক্ষতির আশঙ্কা এখনো প্রাথমিক হিসাবের ওপর নির্ভরশীল।

লুটপাটের ঘটনার পরও ব্যবসায়ীদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তাঁদের আশঙ্কা, বাণিজ্যিক এলাকায় পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে আবারও দোকান ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটতে পারে। বিশেষ করে মোবাইল ফোন ও ইলেকট্রনিকসের দোকানে উচ্চমূল্যের পণ্য এবং মানি ট্রান্সফার প্রতিষ্ঠানে নগদ অর্থ থাকার কারণে এসব ব্যবসা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের বক্তব্য অনুযায়ী, দোকান বন্ধ রাখা এবং নিজস্ব উদ্যোগে পাহারার ব্যবস্থা করেও লুটপাট ঠেকানো সম্ভব হয়নি। এ অবস্থায় স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের নিয়মিত যোগাযোগ, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।

তবে ঘটনার পর নতুন করে লুটপাট চলছে কি না, সে বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য পাওয়া যায়নি। তাই বর্তমানে লুটপাট অব্যাহত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে নয়, বরং ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত আশঙ্কা হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।

পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকজন ব্যবসায়ীর অভিযোগ, পরিস্থিতির অবনতি হলে পুলিশের কাছে বারবার ফোন করেও তাঁরা তাৎক্ষণিক সহায়তা পাননি। এ কারণে জরুরি মুহূর্তে পুলিশের সাড়া দেওয়ার সময় এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, জরুরি ফোনকলের রেকর্ড পর্যালোচনা, সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য যাচাইয়ের দাবি জানানো হয়েছে।

একই সঙ্গে লুটপাটে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এবং প্রতিটি ঘটনায় পুলিশের সাড়া দেওয়ার সময় সম্পর্কে যাচাইযোগ্য তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রয়োজন।

ক্ষতিপূরণ পেতে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ক্ষতির প্রমাণ সংগ্রহ, পুলিশের কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের এবং বিমা কোম্পানির কাছে ক্ষতিপূরণের দাবি জমা দেওয়া। পণ্যের ক্রয়চালান, মজুতের হিসাব, ব্যাংক লেনদেনের নথি, সিসিটিভি ফুটেজ এবং ক্ষতিগ্রস্ত দোকানের ছবি এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হতে পারে।

ব্যবসা পুনরায় চালু করতে নতুন পণ্য সংগ্রহ, দোকান মেরামত, নিরাপত্তাব্যবস্থা উন্নত করা এবং সরবরাহকারীদের পাওনা পরিশোধের জন্য অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হতে পারে। এ কারণে শুধু লুট হওয়া পণ্যের মূল্য নয়, ব্যবসা বন্ধ থাকার কারণে সৃষ্ট আর্থিক ক্ষতির বিষয়টিও যথাযথ নথিপত্রসহ বিবেচনায় আনার দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। দূতাবাসের কূটনৈতিক উদ্যোগের প্রত্যাশা

ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তাদের সহায়তায় বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে ফরাসি প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ, ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকা প্রস্তুত এবং আইনি ও বিমা-সংক্রান্ত তথ্য সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়ার দাবি উঠেছে।

দূতাবাসের পক্ষ থেকে ফরাসি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্যারিস পুলিশ প্রিফেকচার এবং প্যারিস সিটি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের অভিযোগ ও দাবিগুলো তুলে ধরার সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি ব্যবসা পুনরুদ্ধারে সরকারি সহায়তা, প্যারিসে লুটপাটে ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের পাশে দাঁড়াতে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ।

ক্ষয়ক্ষতির সঠিক তথ্য সংগ্রহ, বীমা ও ক্ষতিপূরণ দাবির প্রক্রিয়া সম্পর্কে পরামর্শ, আইনি সহায়তা এবং ফরাসি ভাষায় প্রয়োজনীয় নথিপত্র তৈরিতে সহযোগিতা তাঁদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। 

পাশাপাশি, ব্যবসা সচল রাখতে জরুরি আর্থিক সহায়তা পাওয়ার সম্ভাব্য পথগুলোও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এই পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের জন্য সবচেয়ে বড় প্রয়োজন দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর বাস্তব সুযোগ এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের সহিংসতা ও লুটপাট থেকে তাঁদের প্রতিষ্ঠান সুরক্ষার কার্যকর ব্যবস্থা।

ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, ক্ষতির যথাযথ মূল্যায়ন, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ন্যায্য ক্ষতিপূরণ এবং ফরাসি প্রশাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সমন্বিত উদ্যোগই পারে এই সংকট কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করতে। ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা ও আর্থিক পুনর্বাসন নিশ্চিত করা এখন শুধু তাঁদের ব্যক্তিগত স্বার্থের বিষয় নয়, বরং ফ্রান্সে প্রবাসী উদ্যোক্তাদের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।