সৌদি আরবের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক বহুমাত্রিক। বিশেষ করে ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সৌদি আরব বাংলাদেশিদের জীবনে অঙ্গাঙ্গিভাবে মিশে আছে। সরকারি তথ্যমতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স আয় করে সৌদি আরব থেকে। পরিমাণ ৫.৮৫ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ৩৭.৭% বেশি এবং বাংলাদেশের মোট রেমিট্যান্স আয়ের ১৬.৪%। সৌদি প্রবাসে বাংলাদেশি ভাই-বোনেরা কাজের সুযোগ পাচ্ছেন বলেই দেশের মাটিতে কোটি পরিবার সচ্ছলতা নিয়ে ভালো আছে। জ্বালানি এবং অন্যান্য ক্ষেত্রেও সৌদি আরবের ওপর আমরা নির্ভরশীল। অন্যদিকে, ২০২৬ সালে বাংলাদেশ থেকে ৭৯,১০০ জন নর-নারী হজ পালন করেছেন বলে পত্রিকায় তথ্য মিলেছে। আমাদের জন্য ধর্মচর্চা হলেও সৌদি অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে এটি বিশেষ জোগান, যা পাঁচ থেকে ছয় হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ।
দেশ ও জনগণের স্বার্থে তাই সৌদি আরবের সঙ্গে আমাদের সুসম্পর্ক খুবই জরুরি।
এবার আসি সম্প্রতি মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হওয়া দুই বাংলাদেশি ছেলে ও মেয়ের বিষয়ে। আমি ব্যক্তিগতভাবে খুবই ব্যথিত এবং একজন মানবাধিকারকর্মী হিসেবে লজ্জিত। অন্তত বারো বছর টানা মানবাধিকার নিয়ে কাজ করেছি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। গুম-খুন-নির্যাতন থেকে দেশের মানুষকে বাঁচাতে আমি ও আমার সহকর্মীরা দুনিয়া চষে বেড়িয়েছি। এখনো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় কণ্ঠ উঁচু করি কোনো রকম বৈষম্য ছাড়াই।
আমি ইসলামে দেখানো জীবনপদ্ধতিকে শ্রদ্ধা করি, কিন্তু কখনো ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করি না। মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতায় সম্মান আছে সেই ছোটবেলা থেকে। পাপ এবং ফৌজদারি অপরাধের পার্থক্যও আমার কাছে পরিষ্কার। যেহেতু বর্ণ-গোত্র বিচারে কারও প্রতি আমার দৃষ্টি আলাদা নয়, সেহেতু ধর্মের সংজ্ঞায় কেউ পাপ করলেই তাকে কতল করে ফেলার অধিকার কারও আছে বলে আমি মনে করি না। এ বিষয়ে অনেকের সঙ্গে হয়তো আমার মিলবে না; কিন্তু ইসলামিক স্কলাররা নিজেরাও সব বিষয়ে একমত নন।
ইসলাম, কোরআন ও হাদিস নিয়ে আমার নিজস্ব চিন্তাভাবনা ও মতামত আছে। আল্লাহর অসীম ক্ষমতা এবং মহাবিশ্বের ওপর তাঁর কর্তৃত্ব প্রয়োগের বৈচিত্র্যকে আমি প্রচলিত ধারার বাইরে বিশ্লেষণ করি। আল্লাহ যদি কপালে রাখেন, সেসব নিয়ে ভবিষ্যতে কোনো দিন লিখব।
তাহলে সৌদিতে বাংলাদেশের যে দুই নারী-পুরুষকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলো, এ নিয়ে আমরা কী বলব? দেখুন, প্রত্যেক দেশের নিজস্ব ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা আছে। তারা সে অনুযায়ী অপরাধীর বিচার করে। তাদের আইন-আদালত আমাদের মতো নয়। আমাদের এখানে ওয়াহিদুজ্জামান শামীমকে যেভাবে মরতে হয়েছে, তা কিন্তু ধর্মের অনুশাসন নয়। আমি প্রতিবাদ করেছি। কিন্তু আমাদের চারপাশে এমন কিছু মানুষও আছে, যারা শামীম হত্যাকাণ্ডকে সমর্থন করে! কী বলবেন? সৌদি আরব যে পদ্ধতিতে অপরাধকে সংজ্ঞায়িত করে বা অভিযুক্তদের শাস্তি দেয়, সাধারণ চোখে তা সঠিক নয় এবং বৈষম্যমূলক। কিন্তু তাদের নিজস্ব আইনকানুন নিয়ে আপত্তি তোলার সুযোগই বা আমাদের কোথায়?
তাহলে কি আমাদের ছেলেমেয়েরা আরব ভূখণ্ডে কোনো বিপদে পড়লে আমাদের কিছুই করণীয় নেই? অবশ্যই আছে। সেখানে আমাদের পরিপূর্ণ দূতাবাস আছে, কনস্যুলেট আছে। তাদের কাজে লাগাতে হবে। প্রবাসে থাকা প্রতিটি বাংলাদেশি নাগরিকের তথ্যসমৃদ্ধ ডাটাবেস (Database) থাকতে হবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে—তারা ডকুমেন্টেড (Documented) হোক বা না হোক। তাদের সুখ-দুঃখ, চাহিদা, দাবি, অভিযোগ জানানোর কার্যকর ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নিতে হবে। তারা প্রবাসে কোনো অপরাধে জড়ালে, সে বিষয়েও দূতাবাস এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সব তথ্য থাকা জরুরি। তারা ভুল করতে পারে, কিন্তু তাদের জীবন ও মর্যাদা রক্ষার দায়িত্ব বাংলাদেশ রাষ্ট্রের, যার নাগরিক তারা।
কূটনৈতিক চ্যানেল ব্যবহার করেও যে অনেক বড় সমস্যার সমাধান করা যায়, তার অসংখ্য উদাহরণ আছে। ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, ভারত ও শ্রীলঙ্কা পারলে আমরা কেন পারব না? শ্রীলঙ্কার ঘটনাটি তো সদ্য ঘটেছে। যেদিন ওই দুই বাংলাদেশিকে কে গলা পেতে দিতে হয়, তার ঠিক আগের দিনই আনোজানের মৃত্যুদণ্ড বাতিল করে সৌদি সুপ্রিম কোর্ট। শ্রীলঙ্কার এই নাগরিককে একটি ফেসবুক মন্তব্যের কারণে আপিল আদালত ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন। শ্রীলঙ্কা সরকার তার পক্ষে শক্তিশালী আইনি ও কূটনৈতিক উদ্যোগ নিলে সর্বোচ্চ আদালত মৃত্যুদণ্ডের রায় বাতিল করেন।
সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মারা যাওয়ার আগেই আমাদের চলমান বিচারকার্য সম্পর্কে জানার কথা ছিল। কেন আমরা জানলাম না? এমন তো নয় যে, রাতারাতি দুজনের কল্লা কেটে ফেলেছে সৌদিরা কিংবা এমন ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি। বিচারিক পদ্ধতি অনুসরণ করেই দুজনের শাস্তি বাস্তবায়িত হয়েছে। নিশ্চয়ই আমাদের দূতাবাসে এমন কার্যকর ও দক্ষ ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি, যা প্রবাসীদের অধিকার রক্ষায় সর্বদা সজাগ। আবার হতে পারে, দূতাবাস বা মন্ত্রণালয় আসলে প্রবাসীদের বিষয়ে উদাসীন। কারণ যা-ই হোক, ঘটনাটি চরম হতাশার। তারপরও দোষ খুঁজতে যাব না, কিন্তু ভবিষ্যতের জন্য ভাবতে বলব। দেরি করলে চলবে না। দক্ষ, যোগ্য ও চৌকস কর্মকর্তাদের দূতাবাসে নিয়োগ দেওয়ার অনুরোধও থাকল সংশ্লিষ্টদের প্রতি।
মৃত্যুদণ্ডের শাস্তিটি কেমন ছিল? তাজির বিধানের (Ta’zir) অধীনে হওয়ায় বিচারকের সুযোগ ছিল নিজস্ব বিবেচনাবোধ (Discretion) প্রয়োগ করার। তারা তা করেননি। না করার কারণে, আমি মনে করি, মহান আল্লাহর দরবারে তারা দায়ী হবেন। যেখানে বাংলাদেশের মতো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে এই ‘দোষে’ কোনো শাস্তিই হতো না, সেখানে আল্লাহর দেওয়া দুটি প্রাণ কেড়ে নিল তারা! সৌদিতে হরহামেশা নৃশংস অপরাধ সংঘটিত হয় বলে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর রিপোর্ট আছে, যৌন নির্যাতন তো বটেই। আমাদের মেয়েরা সেখানে ধর্ষিত হওয়ার পর লাশ হয়েও ফিরে এসেছে, আসেনি? অগণিত অপরাধের বিপরীতে কতজন নিয়োগকর্তার শাস্তি হয়েছে? বিচারকরা কি এসব তথ্য জানতেন না? বিচারককে সমাজের আয়না হয়ে বিচারকার্য সম্পন্ন করতে হয়, বিচ্ছিন্ন দ্বীপের বাসিন্দা হয়ে নয়। নয়তো ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয় না।
ইংলিশ জুরিসডিকশনে দীর্ঘদিন আইন প্র্যাকটিস করেছি; নিয়মিত আদালতে গেছি। তাই তাদেরই রেফারেন্স দিয়ে বলব, বিচারকের হাতে নিজস্ব বিবেচনাবোধ (Discretion) প্রয়োগের সুযোগ থাকলে, তিনি তা স্বৈরতান্ত্রিকভাবে করতে পারবেন না। তাকে সবকিছু আমলে নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে অনুমান হলো, ন্যায়ের পাল্লা অভিযুক্তের দিকেই বেশি ঝুঁকে থাকে।
British Oxygen Co Ltd v Minister of Technology [1971] AC 610 মামলায় লর্ড রেইডের (Lord Reid) দুটি প্রণিধানযোগ্য নির্দেশনা আছে:
১। “There are two general grounds on which the exercise of an unqualified discretion can be attacked. It must not be exercised in bad faith, and it must not be so unreasonably exercised as to shew that there cannot have been any real or genuine exercise of the discretion.”
(শর্তহীন নিজস্ব বিবেচনাবোধ প্রয়োগকে সাধারণত দুভাবে চ্যালেঞ্জ করা যায়। এ ক্ষমতা অসৎ উদ্দেশ্যে প্রয়োগ করা যাবে না এবং এমন অযৌক্তিকভাবে প্রয়োগ করা যাবে না, যাতে প্রতীয়মান হয় যে, নিজস্ব বিবেচনাবোধের প্রকৃত ও আন্তরিক প্রয়োগ আদৌ করা হয়নি।)
২। “The general rule is that anyone who has to exercise a statutory discretion must not ‘shut his ears to an application’ (to quote from Bankes L.J. on page 183).”
(সাধারণ নীতি হলো, কোনো ব্যক্তিকে যখন আইন দ্বারা প্রদত্ত নিজস্ব বিবেচনাবোধ প্রয়োগ করতে হয়, তখন তিনি কোনো আবেদন না শুনে থাকতে পারবেন না।)
অর্থাৎ, আমি যা বুঝি, একজন বিচারককে এ অবস্থায় সবদিক বিবেচনায় নিয়ে, মানসিকভাবে এবং অভিযুক্তের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে বিচারকার্য সম্পন্ন করতে হবে।
দুই বাংলাদেশির মামলায় বিচারকরা কি সরল বিশ্বাসে তাঁদের নিজস্ব বিবেচনাবোধ অভিযুক্তদের বিপক্ষে প্রয়োগ করেছেন? কিংবা তারা যা করেছেন, তা কি আদৌ যৌক্তিক ভেবে করেছেন? উভয় প্রশ্নে আমার উত্তর হচ্ছে, না। তারা কান বন্ধ করে দু্ই বাংলাদেশির প্রার্থনা শুনেছেন। ফলে সরল বিশ্বাস ও যৌক্তিকভাবে নিজস্ব বিবেচনাবোধ প্রয়োগের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার দায়িত্বটি তারা উপেক্ষা করেছেন।
ওই দুই নারী-পুরুষের মৃত্যুদণ্ডের ঘটনায় Vienna Convention on Consular Relations 1963-এর বিধানও লঙ্ঘিত হয়েছে বলে আমি মনে করি।
আমি দুই বাংলাদেশির এই মৃত্যুদণ্ডে ক্ষোভ প্রকাশ করছি। পাশাপাশি, সৌদিতে বাংলাদেশ দূতাবাস এবং ঢাকায় আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জেগে ওঠার পরামর্শ দিচ্ছি।
_________________________________________
*ব্যারিস্টার আবু সায়েম
আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মী ও রাজনীতিবিদ
প্রধান সমন্বয়ক, দেশমাতা ফাউন্ডেশন