৯ মাসে ‘মব’ সহিংসতায় ১৮৭ জন নিহত

চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) সারা দেশে ‘মব’ সহিংসতায় ১৮৭ জন নিহত হয়েছে। একই সময়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৬৩৭ নারী, যার বেশিরভাগই (৬০ শতাংশ) শিশু। এ ছাড়া রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় বিএনপির অন্তর্কোন্দলে মারা গেছেন ৪০ নেতাকর্মী। মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) গতকাল সোমবার এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে।

প্রতিবেদনে মব সহিংসতা ও গণপিটুনীর ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে বলা হয়েছে, ৯ মাসে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, বাকবিত-া, আধিপত্য বিস্তার, ধর্মীয় অবমাননা, ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টাসহ নানা অভিযোগে গণপিটুনী এবং মব সহিংসতার ৩৯৮টি ঘটনায় ১৮৭ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৪০১ জন।

প্রতিবেদনে নারী ও শিশু নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরে বলা হয়েছে, ৯ মাসে দুই হাজার ৪০৪ নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন অন্তত ৬৫৭ জন, যার মধ্যে ৩৯২ জন (৬০%) ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু ও কিশোরী।

প্রতিবেদনে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়েছে, ১৩০ (২০%) নারী ও কন্যাশিশু দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এবং ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ২৯ জনকে। এ ছাড়া ৬৯৬ নারী ও কন্যাশিশু যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে ২৭৬ জন (৪০%) শিশু।

২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত সারা দেশে ১০১৩টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় দলীয় কোন্দল ও অন্তর্কোন্দলে ৭৩ জন নিহত এবং ৬ হাজার ৪৭৩ জনের বেশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ আহত হওয়ার তথ্য দিয়েছে এইচআরএসএস। এর মধ্যে বিএনপির অন্তর্কোন্দলে ৩৪২টি ঘটনায় ৪০ জন নিহত ও দুই হাজার ৬৩২ জন আহত হয়েছেন।

এ ছাড়া বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে ৩২১টি সহিংসতার ঘটনায় ১১ জন নিহত ও আহত হয়েছেন দুই হাজার ১৯০ জন।

রাজনৈতিক সহিংসতা

নিহতদের রাজনৈতিক পরিচয় বিশ্লেষণে দেখা যায়, নিহত ৭৩ জনের মধ্যে বিএনপির ৪৬ (৬৩%) জন, জামায়াতের ৮ (১১%) জন ও আওয়ামী লীগের ৬ (৮%) জন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৯ মাসে সন্ত্রাস, নাশকতা, পরোয়ানাভুক্ত আসামি গ্রেপ্তার এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার লক্ষ্যে নিয়মিত অভিযানে ৬৩ হাজার ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

 ৯ মাসে সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনার তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়েছে, এই সময়ে ২৮৮টি ঘটনায় ৫১৮ সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন ২৯৭ জন, লাঞ্ছনার শিকার ৮৭, হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন ৭৭ সাংবাদিক। এ ছাড়া সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৬-এর অধীনে ৫১ সাংবাদিককে আসামি করে ১৯ মামলা হয়েছে।

সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫ এবং সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬-এর বিভিন্ন ধারার অধীনে পৃথক ৪০টি মামলায় ১১৩ ব্যক্তিকে অভিযুক্ত এবং ৫৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

বিচারবহির্ভূত হত্যা, হেফাজত ও কারাগারে মৃত্যুর বিষয়ে সংস্থাটির পক্ষ থেকে উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, এ সময়ে কারাগারে ৯৫ আসামির মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৪০ কয়েদি ও ৫৫ জন হাজতি। এর মধ্যে ২০ জন আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজত, নির্যাতন, গুলিবর্ষণ এবং কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধ’-এর ঘটনায় অন্তত ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে হেফাজতে ও নির্যাতনের শিকার হয়ে ১২ জন, গুলিবিদ্ধ দুজন এবং বন্দুকযুদ্ধে তিনজন নিহত হয়েছেন।

এইচআরএসএসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১০ এপ্রিল সন্ধ্যায় বাগেরহাটের মোংলায় কোস্ট গার্ড পরিচয়ে মিরাজ শেখ (৩২) নামে এক যুবককে গুম এবং গত ২৬ আগস্ট রাজধানীর মিরপুর থেকে শামীম খান নামে এক ব্যবসায়ীকে সাদা পোশাকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে আটকের দুদিন পর উদ্দেশ্যমূলক সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলায় আটক দেখানোর তথ্য নথিতে লিপিবদ্ধ আছে।

প্রতিবেদনে ৯ মাসে সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে বলা হয়েছে, গত ৯ মাসে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ৫৬টি হামলার ঘটনায় ৬২ জন আহত হয়েছেন এবং ২১ মন্দির, ২০ প্রতিমা ও ৪৭টি বসতবাড়িতে হামলা এবং ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে ।

সারা দেশে নদী, খাল, জঙ্গল ও পরিত্যক্ত স্থানে দুর্বৃত্তদের হাতে হতাহতের বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে নদী, খাল, জঙ্গল ও পরিত্যক্ত স্থানে দুর্বৃত্তদের হাতে হত্যাকাণ্ডে ৪৬৫টি ঘটনায় ৪৯১টি লাশ উদ্ধার হয়েছে। এর মধ্যে বস্তাবন্দি অবস্থায় ৪৬, ঝুলন্ত অবস্থায় ৮৭ এবং শরীরে একাধিক আঘাতসহ ৭৪টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া গলা কেটে হত্যা ৩৫টি এবং হাত-পা বাঁধা ৩১ লাশ পাওয়া গেছে। এর বাইরে নানা ধরনের পরিস্থিতিতে আরও ২১৮টি লাশ পাওয়া গেছে।

সীমান্তে হতাহত ও আটকের ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে এইচআরএসএসের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ৯ মাসে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ৪৩টি হামলার ঘটনায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) হামলায় ১৩ জন নিহত ও ৩৯ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছেন ২২ জন। শ্রমিক নির্যাতনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয় উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ৯ মাসে ৫৮২টি শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৪৫ এবং আহত হয়েছেন ১ হাজার ২৬৩ জন। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং শ্রমিকদের সুরক্ষামূলক সরঞ্জামের অভাবে দুর্ঘটনায় ৩৯০ শ্রমিক তাদের কর্মক্ষেত্রে মারা গেছেন।

প্রতিবেদনে শিশুর ওপর সহিংসতা ও নির্যাতনের বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে বলা হয়েছে, ১ হাজার ৮১০ শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে, যার মধ্যে অন্তত ৪৯৪ জন প্রাণ হারিয়েছে এবং ১ হাজার ৩১৬ জন শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে।