বাড়াবাড়ির বিরুদ্ধে বার্তা

আপডেট : ২০ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৪১ এএম

মাদকবিরোধী অভিযানে গিয়ে প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন করে পদ হারালেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। বিএনপি নেতারা বলছেন, সরকার কিংবা দলের যত প্রভাবশালী নেতাই হোক না কেন, অন্যায় করলে কেউ ছাড় পাবে না; সেটি প্রমাণ করতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইশরাক হোসেনকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন। যেকোনো বাড়াবাড়ির বিরুদ্ধে এটাই তার কঠোর বার্তা। এর আগে রাড্ডা ক্লিনিকের ঘটনায় বিএনপির সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসি আহমেদ মিষ্টিকেও পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। বিতর্কিত কর্মকান্ডে জড়িয়ে এক মাসের ব্যবধানে দুজনকে সরে যেতে হয়েছে।

ইশরাক হোসেন অবশ্য দাবি করেছেন, তিনি পদত্যাগের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন এবং প্রধানমন্ত্রী তা মেনে নিয়েছেন। কিন্তু দলের সূত্র জানিয়েছে, বিষয়টি এমন নয়। মাদকবিরোধী অভিযানে প্রধানমন্ত্রীর সায় থাকলেও অস্ত্র হাতে নেওয়ার বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি। আর এ কারণেই প্রধানমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন। কারণ এ ঘটনায় সমর্থন দিলে ভবিষ্যতে অন্যরাও এ বিষয়ে উৎসাহী হবেন। এর আগে গত ১ অক্টোবর রাড্ডার ঘটনায় প্রাথমিক তদন্তে মিষ্টির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পরই তাকে সংসদ সদস্যের পদ ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। তার নির্দেশে পদত্যাগ করেন বিএনপির এ সংসদ সদস্য।

জানা গেছে, গত রবিবার মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে ইশরাক হোসেনকে ডেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। এ নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলে ইশরাক বিষয়টিকে গুজব বলে উড়িয়ে দেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর ইশরাক দলের বিভিন্ন পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন প্রধানমন্ত্রীকে বোঝানোর জন্য। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে কেউ আর এ বিষয়ে আগাননি। শেষ পর্যন্ত গতকাল সোমবার সকালে পদত্যাগের কথা উল্লেখ করে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন এবং সংবাদ সম্মেলন করার কথা জানান ইশরাক।  

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সরকারের এক মন্ত্রী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শাসক হিসেবে জনগণের কাছে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। ক্ষমতার অপব্যবহার, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার বিষয়ে যে সরকার কোনো ছাড় দেবে না, তার বার্তা দিয়েছেন ইশরাক হোসেনকে প্রতিমন্ত্রী থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়ে।’

এর আগে গত ১১ অক্টোবর সন্ধ্যায় জাতীয় সংসদে সরকারি দলের এক সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, চাঁদাবাজি ও দখলদারত্ব বন্ধ এবং দলের নেতাকর্মীদের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কঠোর অবস্থানের কথা জানান। সভায় প্রধানমন্ত্রী হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, দলের কোনো নেতাকর্মী, সংসদ সদস্য বা মন্ত্রী অপরাধমূলক কর্মকা-ে জড়ালে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

আলোচনা-সমালোচনা : গত শনিবারের ঘটনার বিষয়টিকে সমর্থন করে কেউ কেউ সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন  ইশরাক হোসেন কোনো নিরীহ ব্যক্তির ওপর অস্ত্র ধরেননি বরং মাদকবিরোধী অবস্থান নিয়েছেন। আবার অনেকেই ওই অস্ত্রটি বৈধ নাকি অবৈধ, সেটি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। একই সঙ্গে প্রকাশ্যে একজন জনপ্রতিনিধির পিস্তল তাক করে দৌড়ানোর সমালোচনাও করেছেন কেউ কেউ। ইশরাকের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে গত শনিবারই পুরো ঘটনার একটি ভিডিও আপলোড করা হয়েছিল। ওই ভিডিওতে হাতের অস্ত্র ব্লার করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরে রাতে সেই ভিডিওটি ডিলিট করে দেওয়া হয়। তবে মাদক কারবারিদের আটক অভিযানের ঘটনার নানা ছবি-ভিডিও রয়েছে তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে। যদিও ইশরাক হোসেন দাবি করেছেন, ওই অভিযানে তিনি আত্মরক্ষার্থে অস্ত্র প্রদর্শন করেছেন। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে একজন জনপ্রতিনিধি বা আইনপ্রণেতা প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন করে এমন কার্যক্রম চালাতে পারেন কি না? মাদক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পুলিশের নাকি সংসদ সদস্যের?

এসব প্রশ্নে আলোচনায় আইনজ্ঞদের অনেকেই বলছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কিংবা মাদক প্রতিরোধে একজন প্রতিমন্ত্রী বা সংসদ সদস্যের এ ধরনের পদক্ষেপ মোটেও আইনসঙ্গত নয়। এ ধরনের ঘটনায় ক্ষমতাসীন দলের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয় বলে মন্তব্য করেছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক।

এদিকে প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শনের বিষয়টি খতিয়ে দেখার কথা জানিয়েছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান শফিকুল ইসলাম।

সংবাদ সম্মেলনে ইশরাক : গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবের আব্দুস সালাম মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ইশরাক হোসেন বলেন, মাদকবিরোধী অভিযান নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন। তার মতে, অভিযানের মূল উদ্দেশ্য মাদক নির্মূল হলেও সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে অস্ত্র হাতে তার উপস্থিতিই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।

তিনি প্রধানমন্ত্রীকে জানান, এ পরিস্থিতিতে সরকারের কর্মকা- আড়ালে পড়ে যাচ্ছে এবং দলও বিব্রত হচ্ছে বলে তিনি মনে করছেন। এ কারণে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেন।

ইশরাকের ভাষ্য, প্রধানমন্ত্রী তাকে মাদকবিরোধী কার্যক্রম চালিয়ে যেতে এবং এলাকার সমস্যা সমাধানে কাজ করতে বলেছেন। সোমবার সংবাদ সম্মেলনে তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন, প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি চেয়েছেন তিনি। তবে তার বক্তব্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তাকে মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।

ঘুণ্টিঘরে মাদকবিরোধী অভিযান : ইশরাক বলেন, ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ঘুণ্টিঘর এলাকার মাদক সমস্যা সমাধানে তিনি একাধিকবার পুলিশের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। প্রতি মাসে ঢাকা-৬ আসনের আইনশৃঙ্খলাবিষয়ক বৈঠকেও বিষয়টি উত্থাপন করা হয়েছে।

তার দাবি, ওই এলাকায় মাদক বিক্রি ও সরবরাহের একটি বড় নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছিল। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে তিনি অভিযানে অংশ নেন।

ইশরাক জানান, ওই এলাকায় একটি পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের প্রস্তাবও এসেছিল। এ বিষয়ে তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে ডিও লেটারের মাধ্যমে অবহিত করেন। ফাঁড়ি স্থাপনের জন্য জায়গা নির্ধারণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়ার পরও সেটি বাস্তবায়িত হয়নি।

আত্মরক্ষার জন্য অস্ত্র হাতে নেওয়ার দাবি : অভিযানের সময় নিজের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র রাখার বিষয়ে ইশরাক বলেন, ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য তার বৈধ লাইসেন্স করা একটি আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে। অভিযানের সময় সরকারের দেওয়া নিরাপত্তাকর্মীরাও তার সঙ্গে ছিলেন। তার দাবি, অভিযানের স্থানে প্রবেশের পর ২৫ থেকে ৩০ জনের একটি দলকে সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে দেখা যায়। তখন আত্মরক্ষার প্রয়োজনে তিনি নিজের লাইসেন্স করা অস্ত্র হাতে নেন।

মাদক, মোবাইল ও দেশীয় অস্ত্র উদ্ধারের দাবি : ইশরাকের দাবি, অভিযানের সময় কয়েকটি ভবনে তল্লাশি চালিয়ে চুরি বা ছিনতাই করা বলে সন্দেহ করা হচ্ছে এমন অনেক মোবাইল ফোন, স্কুলব্যাগভর্তি মোবাইল, প্রায় ৩০০ গ্রাম হেরোইনের প্যাকেট, কয়েক বোতল মদ এবং চাপাতিসহ বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়।

মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থ নেই : ইশরাক বলেন, অভিযানের মূল উদ্দেশ্য ছিল মাদক নির্মুল করা। কিন্তু গণমাধ্যমের একটি অংশ অস্ত্র হাতে তার উপস্থিতি কেন্দ্র করে সংবাদ প্রকাশ করায় মাদকবিরোধী কার্যক্রমের মূল উদ্দেশ্য আড়ালে পড়ে গেছে বলে তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, ‘যুদ্ধটা তো মাদকের বিরুদ্ধে। এখানে আমার ব্যক্তিগত কোনো স্বার্থ নেই, দলীয় কোনো স্বার্থ নেই, রাজনৈতিক কোনো স্বার্থ নেই।’

অভিযানের মাধ্যমে কারও ক্ষতি হয়ে থাকলে বা কেউ আঘাত পেয়ে থাকলে দুঃখ প্রকাশ করেন ইশরাক। তবে নিজের নিরাপত্তার প্রয়োজনে যতটুকু সময় দরকার ছিল, ততটুকু সময়ই অস্ত্র হাতে রেখেছিলেন বলে দাবি করেন তিনি। এ ক্ষেত্রে কোনো ভুল করেননি বলেও দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন ইশরাক।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত