বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের ৭ লাখ ইউরো ক্ষতির আশঙ্কা

ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে গত শনিবারের সহিংসতা ও লুটপাটে অন্তত আটটি বাংলাদেশি মালিকানাধীন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মোবাইল ফোন, ইলেকট্রনিকস ও মানি ট্রান্সফার ব্যবসার এসব প্রতিষ্ঠান থেকে পণ্য ও নগদ অর্থ লুটের অভিযোগ উঠেছে। প্রাথমিক হিসাবে, সম্মিলিত ক্ষতির পরিমাণ সাত লাখ ইউরো ছাড়িয়ে যেতে পারে, এমন আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।

ভবিষ্যতে আবারও লুটপাটের ঘটনা ঘটতে পারে, এমন শঙ্কায় রয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তারা। দীর্ঘদিনের সঞ্চয়, ঋণ ও বিনিয়োগ দিয়ে গড়ে তোলা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কয়েকজন উদ্যোক্তা এখন চরম আর্থিক অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। নতুন করে ব্যবসা চালু, কর্মচারীদের বেতন দেওয়া, দোকানভাড়া পরিশোধ এবং সরবরাহকারীদের পাওনা মেটানো নিয়ে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ। এমন পরিস্থিতিতে ক্ষতিপূরণ আদায়, ব্যবসা পুনরুদ্ধার এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ দূতাবাসের কূটনৈতিক উদ্যোগ ও ফরাসি প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বিত যোগাযোগের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

দুই ব্যবসায়ীর ক্ষতি প্রায় তিন লাখ ইউরো : ক্ষতিগ্রস্ত আটটি প্রতিষ্ঠান হলো জিএসআর ইনফরমেটিক, থ্রি-জি ইনফরমেটিক, প্যারিস টেলিকম, আয়মান সার্ভিস, থ্রি-ডি ইনফরমেটিক, ফোন স্টোর, বদি টেলিকম ও রাফিদ ইলেকট্রনিকস। এসব প্রতিষ্ঠানের ক্ষয়ক্ষতির পুরো হিসাব স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

রাফিদ ইলেকট্রনিকসের স্বত্বাধিকারী রবিউল হাসানের দাবি, তার দোকানে প্রায় এক লাখ ২০ হাজার ইউরো মূল্যের পণ্য ছিল। দোকান বন্ধ ও তালাবদ্ধ থাকা অবস্থায় লুটপাটের ঘটনায় তিনি ব্যবসার প্রায় পুরো পুঁজি হারিয়েছেন। নতুন করে ব্যবসা শুরু করা নিয়েও অনিশ্চয়তায় রয়েছেন তিনি।

অন্যদিকে, ব্যবসায়ী আজিম উদ্দিনের মালিকানাধীন ফোন স্টোর ও বদি টেলিকমে লুটপাটের ঘটনায় প্রায় এক লাখ ৮০ হাজার ইউরো ক্ষতি হয়েছে বলে তার দাবি। এর মধ্যে একটি দোকানের রিয়া মানি ট্রান্সফার কাউন্টারে প্রায় ৩০ হাজার ইউরো নগদ অর্থ ছিল বলেও জানিয়েছেন তিনি।

দুই ব্যবসায়ীর দাবি অনুযায়ী, তাদের ক্ষতির পরিমাণ প্রায় তিন লাখ ইউরো। বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষয়ক্ষতির হিসাব যুক্ত হলে মোট ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। তবে প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, মোট ক্ষতি সাত লাখ ইউরোর বেশি হতে পারে।

আবারও লুটপাটের আশঙ্কা : লুটপাটের ঘটনার পর ব্যবসায়ীদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। তাদের আশঙ্কা, বাণিজ্যিক এলাকায় পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে আবারও দোকান ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটতে পারে। বিশেষ করে মোবাইল ফোন ও ইলেকট্রনিকসের দোকানে উচ্চমূল্যের পণ্য এবং মানি ট্রান্সফার প্রতিষ্ঠানে নগদ অর্থ থাকার কারণে এসব ব্যবসা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা জানান, দোকান বন্ধ রাখা এবং নিজস্ব উদ্যোগে পাহারার ব্যবস্থা করেও লুটপাট ঠেকানো সম্ভব হয়নি। এ অবস্থায় স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের নিয়মিত যোগাযোগ, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।

ঘটনার সময় পুলিশের ভূমিকা নিয়েও ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকজন ব্যবসায়ীর অভিযোগ আছে। তাদের দাবি, পরিস্থিতির অবনতির পর পুলিশের কাছে বারবার ফোন করেও তারা তাৎক্ষণিক সহায়তা পাননি। এ কারণে জরুরি মুহূর্তে পুলিশের সাড়া দেওয়ার সময় এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, জরুরি ফোনকলের রেকর্ড পর্যালোচনা, সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য যাচাইয়েরও দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে লুটপাটে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এবং প্রতিটি ঘটনায় পুলিশের সাড়া দেওয়ার সময় সম্পর্কে যাচাইযোগ্য তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।

ক্ষতিপূরণ পেতে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি : ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ক্ষতির প্রমাণ সংগ্রহ, পুলিশের কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের এবং বীমা কোম্পানির কাছে ক্ষতিপূরণের দাবি জমা দেওয়া। পণ্যের ক্রয়চালান, মজুদের হিসাব, ব্যাংক লেনদেনের নথি, সিসিটিভি ফুটেজ এবং ক্ষতিগ্রস্ত দোকানের ছবি এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হতে পারে।

ব্যবসা পুনরায় চালু করতে নতুন পণ্য সংগ্রহ, দোকান মেরামত, নিরাপত্তাব্যবস্থা উন্নত করা এবং সরবরাহকারীদের পাওনা পরিশোধের জন্য অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হতে পারে। এ কারণে শুধু লুট হওয়া পণ্যের মূল্য নয়, ব্যবসা বন্ধ থাকার কারণে সৃষ্ট আর্থিক ক্ষতির বিষয়টিও যথাযথ নথিপত্রসহ বিবেচনায় আনার দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

দূতাবাসের কূটনৈতিক উদ্যোগের প্রত্যাশা : ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা মনে করেন, বাংলাদেশ দূতাবাসের পক্ষ থেকে ফরাসি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্যারিস পুলিশ প্রিফেকচার এবং প্যারিস সিটি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের অভিযোগ ও দাবিগুলো তুলে ধরার সুযোগ রয়েছে। দূতাবাস চাইলে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানের তালিকা প্রস্তুত, আইনি ও বীমা-সংক্রান্ত তথ্য ফরাসি সরকারকে সরবরাহের উদ্যোগ নিতে পারে।