সিয়া কুকরার গল্প

বিরল ক’টি হাঁসের খোঁজে সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরের উদ্দেশে রওনা হলাম ৬ ফেব্রুয়ারি রাতে। সকালে সুনামগঞ্জ পৌঁছে টেম্পোযোগে তাহিরপুর। এরপর জলসঙ্গী নামের বজরায় টাঙ্গুয়ার হাওর। বজরা পাতলাই নদী দিয়ে এগিয়ে চলেছে। দু-পাশের নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখছি আর ছবি তুলছি। এমন সময় নাশতার ডাক পড়ল। ডিম-খিচুড়ির সঙ্গে আমের আচার। বজরার সামনে বসে খাওয়ার আয়োজন। কিন্তু আমি খাবারের থালা নিয়ে ছাদে উঠে গেলাম। ওখানে বসার ব্যবস্থা ও ছাতা আছে। নদীর দু-পাশের দৃশ্য দেখতে দেখতে সাড়ে ১১টায় হাওরের কাছে গোলাবাড়ি এলাকায় পৌঁছলাম। বজরা নোঙর করল। সময় নষ্ট না করে কোশা নৌকায় উঠে দ্রুত হাওরের দিকে ছুটলাম। দুপুর ১২টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত হাওরের রৌয়া ও চটাইন্না বিল, চটাইন্না খাল, লেইছমারা বিল ঘুরে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি দেখলেও বিরল হাঁসগুলোর দেখা পেলাম না।

পরদিন সকালে রৌয়া, চটাইন্না ও রূপাভুঁই বিল হয়ে লেইছমারা গেলাম। ওখান থেকে হাতিরগাতা কান্দার (বিলের মাঝে উঁচু জায়গা) কাছাকাছি এসে বিরল কাস্তে হাঁসের দেখা পেলাম। এরপর আবারও রৌয়া বিলে এলাম। এবার এখানে বেশ কাছ থেকে বিভিন্ন প্রজাতির হাঁসের সুন্দর সুন্দর ছবি তুললাম। তবে অতি বিরল বড় ভুতিহাঁসের দেখা পেলাম না। বিকেল ৪টায় বজরা তাহিরপুরের উদ্দেশে ছাড়বে। তাই শেষ চেষ্টা হিসেবে আবারও লেইছমারা বিলে গেলাম। কিন্তু অনেক খোঁজাখুঁজি করেও হাঁসটির দেখা পেলাম না।

দুপুর সোয়া ২টায় ফিরতি পথ ধরলাম। মাত্র দেড় মিনিট সময় পার হতেই বিশাল একঝাঁক পোষা হাঁস নিয়ে দুজন লোককে লেইছমারা বিলে ঢুকল। এরপর ওরা চটাইন্না খালের মুখে একটি পরিষ্কার জায়গায় হাঁসগুলোকে খাবার দিতেই বিল থেকে দুটি নীল রঙের পোষা মুরগি আকারের ডাহুকের মতো পাখি অতি সন্তর্পণে সেই খাবারে ভাগ বসাতে এলো। এর আগে এরকম দৃশ্য তেমন একটা দেখিনি। তবে মাত্র সোয়া মিনিটে পাখিগুলো দ্রুত খেয়ে পাশের কান্দার ঝোঁপের ভেতর ঢুকে গেল। ওদের প্রথম কবে দেখেছি মনে নেই। তবে বুনো অবস্থায় মৌলভীবাজারের বাইক্কা বিল, সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর, ঢাকার কেরানীগঞ্জের কোন্ডার চর, ফেনীর মুহুরি বাঁধ ও রাজশাহীর মোহনপুরে দেখেছি ঝাঁকে ঝাঁকে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় টাঙ্গুয়াতেই দেখেছি। 

এরা হলো এদেশের বহুল দৃশ্যমান আবাসিক পাখি কালেম। কায়েম, সিয়া কুকরা, বুরি, কামপাখি (পশ্চিমবঙ্গ) নামেও পরিচিত। তবে সিয়া কুকরা নামটি বেশ। ইংরেজি নাম Grey-headed Swamphen। যদিও আগে পাখিটি Purple Swamphen/Moorhen  বা Indian Purple Swamphen  বলে পরিচিত ছিল, কিন্তু বর্তমানে Purple Swamphen  প্রজাতিটির ছয়টির উপপ্রজাতিকে ছয়টি আলাদা প্রজাতিতে ভাগ করা হয়েছে। Grey-headed Swamphen-এর বৈজ্ঞানিক নাম Porphyrio policephalus। বাংলাদেশ ছাড়াও মধ্যপ্রাচ্য, ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে চীনের উত্তরাঞ্চল হয়ে থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চল পর্যন্ত ওরা বিস্তৃত। 

প্রাপ্তবয়স্ক সিয়া কুকরার দেহের দৈর্ঘ্য ৩৮-৫০ সেন্টিমিটার। ওজন ৭০০-৮৫০ গ্রাম। একনজরে দেহের পালক চকচকে নীলচে-বেগুনি। মাথার রঙ হালকা। ঘাড় ও বুকে চকচকে ভাব আছে। লেজের তলা সাদা। স্ত্রী-পুরুষ দেখতে একই রকম হলেও কপালের ওপরের লাল বর্মটি স্ত্রীর ক্ষেত্রে ছোট। চোখ ও চঞ্চু লাল, চঞ্চুর আগা ফ্যাকাশে। পা লম্বা; পা, পায়ের পাতা ও আঙুল রক্ত-লাল। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখি অনুজ্জ¦ল, গলা ফ্যাকাশে এবং মুখ, ঘাড় ও বুকে ধূসর আভা রয়েছে। অপ্রাপ্তবয়স্কদের চঞ্চু, পা, পায়ের পাতা ও আঙুল অনুজ্জ¦ল লাল।

এরা হাওর, হ্রদ, বিল, নলবন ও ঘেসো জলাভূমিতে বিচরণ করে। দিবাচর পাখিগুলো মাঝারি থেকে বড় দলে ঘুরে বেড়ায়। ধীরে হলেও ভালো উড়ে। অত্যন্ত বদমেজাজী ও মারামারিতে ওস্তাদ। ভোর, গোধূলি ও বাদলা দিনে বেশি সক্রিয়। অল্প পানিতে ভাসমান আগাছায় হেঁটে হেঁটে জলজ উদ্ভিদ, বীজ, শস্যদানা, শিকড়, খোলকযুক্ত প্রাণী, কীটপতঙ্গ ইত্যাদি খায়। খাওয়ার সময় লেজের নিচের সাদা অংশ দেখায় ও ‘চাক-চাক-চাক---’ শব্দে ডাকে। প্রজননকালে ডাকে ‘কিরক-কিরক-কুরাহ---’ শব্দে।

এপ্রিল থেকে আগস্ট প্রজননকাল। এ সময় পুরুষ সিয়া কুরকা ঘন ঘন ডাকে। স্ত্রী-পুরুষ একত্রে মিলেমিশে জলজ উদ্ভিদ-গুল্ম বা ঝোপের ভেতর লতাপাতা, শিকড় ইত্যাদি দিয়ে বিশাল বাসা বানায়। ডিম পাড়ে ৩-৭টি; রঙ বেগুনি ও বাদামি ছিটযুক্ত চকচকে হলুদ বা ফ্যাকাশে। স্ত্রী-পুরুষ মিলেমিশে ডিমে তা দেয় ও ছানাদের লালনপালন করে। ডিম ফোটে ১৮-২৩ দিনে। সদ্যফোটা ছানাগুলো কুচকুচে কালো। বয়স চার-পাঁচ দিন হলেই ছানারা বাবা-মায়ের সঙ্গে বাসা ছাড়ে। আয়ুষ্কাল প্রায় পাঁচ বছর।

লেখক : পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ