সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশি কর্মীর মৃত্যুদন্ড কার্যকরের ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানে ঘাটতি ছিল। এ কারণে দেশটির সরকারের কাছে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির গতকাল সোমবার ঢাকায় সাংবাদিকদের এ কথা জানান।
বাংলাদেশের উদ্বেগের মূল বিষয় হচ্ছে তথ্য আদান-প্রদান, যোগাযোগ এবং এ সংক্রান্ত বিদ্যমান প্রক্রিয়া, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘তথ্য আদান-প্রদানে কোথায় ঘাটতি হয়েছে, তা নির্ধারণে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা চলছে।’
হুমায়ুন কবির বলেন, বিদেশে বাংলাদেশের কোনো নাগরিকের বিরুদ্ধে ফৌজদারি কার্যক্রম শুরু হলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো বাংলাদেশ সরকারকে তা অবহিত করবে, সরকার এমনটি প্রত্যাশা করে; যাতে ওই নাগরিককে প্রয়োজনে কনস্যুলার সহায়তা দেওয়া যায়।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে কোনো সৌদি নাগরিক ফৌজদারি অভিযোগে গ্রেপ্তার হলে সৌদি কর্তৃপক্ষকে তা জানানো হবে; যাতে তারা নিজেদের নাগরিককে কনস্যুলার সহায়তা দিতে পারে। অন্তত তাদের জানা উচিত, তাদের একজন নাগরিক বাংলাদেশে অপরাধমূলক কর্মকা-ে জড়িয়ে পড়েছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, সৌদি আরবের নিজস্ব আইন রয়েছে এবং দেশটিতে ভ্রমণকারী প্রত্যেক ব্যক্তিই সে আইনের আওতাভুক্ত। দুই বাংলাদেশির যে অপরাধের জন্য সাজা হয়েছে, তা গভীর হতাশাজনক উল্লেখ করে তিনি বলেন, ধর্মীয় উদ্দেশ্যে মানুষ যে পবিত্র স্থান পরিদর্শন করেন, সেখানে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
মক্কা এলাকার একটি মসজিদ চত্বরে ‘অনৈতিক কাজ’ করার অপরাধের সাজা হিসেবে গত ১৪ অক্টোবর দুই বাংলাদেশি নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তারের মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয়। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, তারা উভয়েই কর্মী হিসেবে দেশটিতে গিয়েছেন।
অন্য পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম গতকাল সাংবাদিকদের জানান, সৌদি সরকারের কাছে দুই বাংলাদেশির বিরুদ্ধে দেওয়া আদালতের রায়ের অনুলিপি চাওয়া হয়েছে। নথিপত্র পাওয়ার পর সরকার বিষয়টি পর্যালোচনা করবে এবং সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে পরবর্তী করণীয় ঠিক করবে।
শামা ওবায়েদ বলেন, সৌদি কর্তৃপক্ষ নিয়মিত বিরতিতে তাদের দেশে কারাবন্দি বাংলাদেশিদের তালিকা সেখানে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনগুলোয় পাঠিয়ে থাকে। সরকার খতিয়ে দেখছে, মৃত্যুদ- কার্যকর হ্ওয়া দুই ব্যক্তির নাম তালিকায় আছে কি না।
কূটনৈতিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তারের নাম সৌদি কর্তৃপক্ষের দেওয়া বন্দি তালিকায় ছিল। তবে ওই তালিকায় তাদের মৃত্যুদ-ের সাজা হওয়ার কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।
মৃতদেহ আনায় বিলম্ব : সৌদি আরবে মৃত্যুদ- কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশি কর্মীর দেহাবশেষ দেশে আনা দেশটির সঙ্গে আকাশপথে যোগাযোগ বন্ধ থাকায় বিলম্ব হচ্ছে। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী গতকাল সাংবাদিকদের এ বিষয়টি জানান।
ঢাকায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি ও সম্প্রতি সৌদি আরবে হুতিদের হামলার পরিপ্রেক্ষিতে দেশটির সঙ্গে আকাশপথে যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। এ কারণে সেখানে সম্প্রতি মৃত্যুদন্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশির মরদেহ দেশে আনতে বিলম্ব হচ্ছে।
দেশ রূপান্তরের ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি নজরুল ইসলামের পরিবারের সদস্যদের উদ্ধৃত করে জানান, নজরুল ২০২২ সালের নভেম্বরে সৌদি আরবে যান। মক্কার হারাম শরিফে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ করতেন তিনি। সৌদি আরবে যাওয়ার আট মাসের মাথায় সেখানকার পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। এরপর থেকেই তিনি দেশটির কারাগারে ছিলেন। গ্রেপ্তারের এক মাস পর বিষয়টি জানতে পারে পরিবার।
মাঝেমধ্যে বাবা-মায়ের সঙ্গে কয়েক মিনিট কথা বলার সুযোগ পেতেন নজরুল। তাদের সঙ্গে তার সর্বশেষ কথা হয় ১১ অক্টোবর। সেদিন দুই থেকে আড়াই মিনিট কথা হয়। এরপর গত বুধবার বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে সৌদি আরব থেকে একজন ফোন করে নজরুলের মৃত্যুদন্ড কার্যকরের বিষয়টি পরিবারকে জানান।
নজরুলের বাবা আবদুল বাছির বলেন, আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ছয় লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ছেলেকে সৌদি আরবে পাঠান। প্রথম সাত-আট মাসে ছেলে প্রায় দেড় লাখ টাকা পাঠিয়েছিল। এরপর তিন বছর ধরে ছেলে সেদেশের জেলে। এখন শুধু ছেলের মরদেহ দেখার অপেক্ষায় আছেন তিনি।
ছেলে হারানোর শোকে গত কয়েক দিন টানা কাঁদছেন নজরুলের মা রহিমা বেগম। তিনি বলেন, ছেলেই এক মাস পরপর ফোন করত। এক থেকে দুই মিনিট কথা বলত। তিনি শেষবারের মতো ছেলের লাশ দেখতে চ্ওায়ার আগ্রহের কথা জানান।
পরিবারের সদস্যরা জানান, নজরুলের মৃত্যুদন্ড কার্যকর হওয়ার খবর শুনে তার ফুফু আবেদা বেগম (৬৫) গত বুধবার মারা যান।
তবে সুইটি আক্তারের বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।