গল্প

বগা সলিম

বেঁচে থাকার জন্য কী কী করতে হয়?

গড়পড়তা একজন মানুষের?

বেঁচে থাকতে হলে টাকাপয়সা লাগে, অতএব টাকাপয়সা রোজগার করতে হয়। কেউ চাকরি করে, কেউ ব্যবসা করে, কেউ টিউশনি করে, কেউ আর্টকালচার করে সেটা করে।

যে এসব কিছুতেই নাই?

চাকরির ইন্টারভিউ দিয়ে চাকরি পায় নাই, ব্যবসার চেষ্টা করে পারে নাই, টিউশনি করার মতো যোগ্যতা নাই, আর্টকালচার থেকে ‘১০০ হাত দূরে থাকুন’ মার্কা চরিত্র।—সে কী করবে বেঁচে থাকার জন্য? বা কিছু আয় রোজগারের জন্য?

সহজ কিছু?

সহজতম কিছু?

বগা সলিম সহজতম পন্থাটাই বেছে নিয়েছে। পুঁজি : অ-মায়া। বগা সলিমের বুকে এক ফোঁটা মায়া নাই। সে কখনো বিচলিত হয় না। তেমন একটা আনন্দিত বা তেমন একটা দুঃখিত হয় না কিছুতে। এজন্য তার কাজটাকে তার সহজতম মনে হতেই পারে—বগা সলিম মানুষ খুন করে।

ফরহাদ মজিদ।
শহীদুল কাফি।
শরীফুজ্জামান মারুফ।
বদিউল আলম।
মুরতাজা মুহাম্মদ আনিস।

এদের আলোড়ন সৃষ্টিকারী হত্যাকাণ্ড এবং দেশের বিচারহীনতার সংস্কৃতি নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া উত্তাল হয়েছিল। কিছু কলমবিদ ফুকো দেরিদা লাঁকা চমস্কিকে টেনে বিদ্যা জাহির করার মওকা পেয়ে উল্লসিতই হয়েছিলেন বটে। খুনি কিন্তু ধরা পড়ে নাই। শহীদুল কাফি ও বদিউল আলম হত্যাকাণ্ডের সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া গিয়েছিল। খুনিকে শনাক্ত করা যায় নাই। শহীদুল কাফির খুনি ঢ্যাঙা, বদিউল আলমের খুনি খর্বাকৃতির। হুডি পরে ছিল দুজনই। সিসিটিভিতে মুখ দেখা যায় নাই। তবে বদিউল আলমের খুনির পা থেকে রক্ত ঝরছিল। বদিউল আলম মৃত্যুর আগে খুনির বাম পায়ের গোড়ালি কামড়ে ধরেছিলেন।

ফরহাদ মজিদ, শরীফুজ্জামান মারুফ, মুরতাজা মুহাম্মদ আনিসের খুনির হদিশ পুলিশ পায় নাই, এসবই পায় নাই। আলামত কী জব্দ হয়েছে সেসব মিডিয়ায় প্রকাশ করা হয় নাই। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা প্রেসমিট করে বলেছেন, ‘খুনিরা ধরা পড়বেই। খুনি যেই হোক ধরা পড়বেই।’

বগা সলিম বলল, ‘খুনিরা। তারা এখনো বলছে খুনিরা।’

আমি বললাম, ‘খুনিরা না?’

‘গুরু, আপনারে আমি বলছি, এসব খুন আমি করছি। আরও করব। বেঁচে থাকার জন্য এরচেয়ে সহজ কোনো উপায় আমি করতে পারি নাই।’

‘বদিউল আলমের খুনি খর্বাকৃতির।’

‘তাতে কী, গুরু?’

‘শহীদুল কাফির খুনি ঢ্যাঙা।’

‘তাতে কী, গুরু?’

‘তুমি মাঝারি আকৃতির মানুষ।’

বিপন্ন দেখা গেল বগা সলিমকে?

না।

বগা সলিমের বুকে মায়া নাই। এ কথা সে নিজে বলেছে। এখন বলল, ‘বেঁচে থাকার জন্য খুন করতে পারব আর লম্বা খাটো হতে পারব না? কিলার আসলাম, কিলার ইমন, কিলার সউদ হতে পারব না? সবার নিজস্ব একটা কৌশল থাকে, গুরু। বেঁচে থাকার কৌশল থাকে। থাকে কিনা বলেন?’

‘তা থাকে।’

‘আমি এই কৌশলে বাঁচি।’

আমি ক্লান্ত ভাবে বললাম, ‘বাঁচো।’

দুদিন পর তার স্টাডিরুমে খুন হয়ে গেলেন বামপন্থী বুদ্ধিজীবী একরাম নিয়োগী। ছয় ঘণ্টার মধ্যে খুনি ধরা পড়ল। কিলার সউদ।

শহীদুল কাফির খুনি ধরা পড়ল। কিলার ইমন।

মুরতাজা মুহাম্মদ আনিসের খুনি ধরা পড়ল। কিলার আসলাম।

ফরহাদ মজিদ, বদিউল আলম, শরীফুজ্জামান মারুফের খুনিও ধরা পড়বে। বগা সলিম ধরা পড়বে না। কোনো দিনই ধরা পড়বে না?

বগা সলিম বলল, ‘গুরু।’

আমি আবার ক্লান্তভাবে বললাম, ‘বাঁচো।’