এম আবদুল আলীম প্রবন্ধসাহিত্যে এনেছেন নতুন দার্ঢ্য। তার নির্বাচিত প্রবন্ধ গ্রন্থে দীর্ঘ এক সময়ের যাত্রাপথের হদিস পাওয়া যাবে। প্রাঞ্জল, সংযত ও সংহত ভাষায় সমকালীন সাহিত্যতত্ত্ব, বাঙালি মনীষা ও সাহিত্যিকদের সাহিত্যকর্মের মূল্যায়ন করেছেন লেখক। তিনি জানিয়েছেন : ‘পরীক্ষা, চাকরির বৈতরণী পার হওয়া কিংবা পত্রপত্রিকার ফাই-ফরমাস মেটাতে গিয়ে লিখতে হয়েছে বিস্তর। প্রথাগত গবেষণা কিংবা সাহিত্য-সংস্কৃতি, ইতিহাস-ঐতিহ্যের অন্বেষণেও কম লিখতে হয়নি। সেসব লেখা থেকে বাছাই করা কিছু লেখা স্থান পেল নির্বাচিত প্রবন্ধ গ্রন্থে।’ গ্রন্থটিতে লেখকের প্রথম দিককার লেখা যেমন আছে, পরিণত বয়সের লেখাও আছে। বিষয়বৈচিত্র্যের জন্য লেখকের সতর্কতাকে আলাদা কুর্নিশ। বৈচিত্র্য অবশ্যই প্রয়োজন, তবে বৈচিত্র্যের খাতিরে যা ইচ্ছা তা-ই ছাপা বেমানান ও বিসদৃশ। লেখক তার সতর্কতা ও তৎপরতার জন্য সে দায় থেকে অবশ্যই রেহাই পেতে পারেন। কোথাও কোনো শৈথিল্যের সুযোগ রাখেননি তিনি। তার প্রধান কৃতিত্ব সম্ভবত এটাই যে, তিনি গবেষণালব্ধ তথ্য ও ব্যক্তিগত পাঠ-অভিজ্ঞতার মধ্যে সুষ্ঠু ভারসাম্য বজায় রাখতে পেরেছেন।
গ্রন্থটিতে ৩টি অংশ ও ১৮টি প্রবন্ধ রয়েছে। এর সূচিপত্রের দিকে তাকালেই বাংলা সাহিত্য, ভাষা, সংস্কৃতি ও মননচর্চার বিচিত্র পরিসর সম্পর্কে লেখকের অনুসন্ধিৎসা এবং বিশ্লেষণী দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় পাওয়া যায়। বিষয়বস্তুর বিন্যাসে তাত্ত্বিক অন্বেষণ, সাহিত্য-ইতিহাসের পুনর্মূল্যায়ন, মনীষী-ব্যক্তিত্বের চিন্তাজগতের উন্মোচন এবং বিশিষ্ট কবিদের সৃজনসত্তার বিশ্লেষণ—মূলত এই চারটি প্রবণতা বিশেষভাবে লক্ষণীয়।
বিশ শতকে বঙ্গভঙ্গ, বিশ্বযুদ্ধ, খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলন, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এবং দুর্ভিক্ষের মতো ঐতিহাসিক অভিঘাত বাঙালি মধ্যবিত্তের মানসে গভীর সংকট ও বিচ্ছিন্নতাবোধের জন্ম দেয়। ঔপনিবেশিক শাসনের কূটকৌশল, গণতান্ত্রিক চেতনার অসংগত বিকাশ এবং পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার শোষণ এই বিচ্ছিন্নতাকে আরও তীব্র করে। মূলত আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক জটিলতার মধ্য দিয়ে বিচ্ছিন্নতাবোধের উদ্ভব ও রূপান্তর ঘটে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর অবক্ষয় ও বৈশ্বিক বিপর্যয় মানুষের অস্তিত্বসংকটকে গভীরতর করে। ব্যক্তিমানসের এই দ্বন্দ্ব, নিঃসঙ্গতা ও অনন্বয়ের বেদনা আধুনিক শিল্প-সাহিত্যে বহুমাত্রিক অভিব্যক্তি লাভ করে। ‘বিচ্ছিন্নতা : তত্ত্বগত অন্বীক্ষা’ প্রবন্ধে এই বিষয়টিই নাতিদীর্ঘ তাত্ত্বিক পরিসরে উপস্থাপিত হয়েছে।
সাহিত্যতত্ত্বের ধারায় উত্তর-আধুনিকতা সমকালীন তাত্ত্বিক কাঠামোর ভিত্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। সভ্যতার পরিবর্তনশীল স্বরূপ, সামাজিক রূপান্তর এবং সাংস্কৃতিক বহুত্বের অভিঘাতে এর উদ্ভব। ‘উত্তর-আধুনিক সাহিত্য : তত্ত্ব-তথ্য ও বিষয়মত’ শীর্ষক প্রবন্ধে লেখক দেখিয়েছেন : প্রকৃতই বহুস্বর, বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতা ও বিচিত্র জীবনবাস্তবতার সমন্বয়েই এর নির্মাণ। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের ভিন্ন আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে এর চর্চা পেয়েছে স্বতন্ত্র মাত্রা। এ নিয়ে বিতর্ক ও বিশ্লেষণ অব্যাহত থাকলেও উত্তর-আধুনিকতার প্রকৃত স্বরূপ ও স্থায়িত্ব নির্ধারিত হবে এর সৃজনশীল সাহিত্যকীর্তির মধ্য দিয়েই।
‘বাংলা ভাষার বিশ্বায়ন: পর্ব থেকে পর্বান্তরে’ প্রবন্ধে লেখকের মূল্যায়ন : বিশ্বায়ন পারস্পরিক ক্রিয়া, আন্তঃসংযোগ এবং আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের এক ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। সভ্যতার ক্রমবিকাশের সঙ্গে এর সম্পর্ক সুপ্রাচীন। তবে যোগাযোগ-প্রযুক্তির অগ্রগতিতে বিশ্বায়নের গতি ও প্রকৃতি বদলে গেছে। বাংলা ভাষার বিশ্বায়নও কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এটি দীর্ঘকালব্যাপী জাতিগত সংযোগ, অভিবাসন, বাণিজ্য ও জ্ঞানচর্চার ঐতিহাসিক পরিণতি। একদিকে সংস্কৃত, আরবি, ফারসি, পর্তুগিজ, ইংরেজিসহ বিভিন্ন ভাষার শব্দ, বাক্রীতি ও সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ আত্মস্থ করে বাংলা সমৃদ্ধ হয়েছে; অন্যদিকে প্রবাসী বাঙালির জীবনযাপন, সাহিত্যচর্চা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে বিশ্বের নানা প্রান্তে বাংলা ভাষার প্রভাব বিস্তৃত হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থায় ইংরেজির আধিপত্য বহু ভাষার অস্তিত্বকে সংকটাপন্ন করেছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলা ভাষার বিশ্বায়নের ঐতিহাসিক পর্বান্তর, আন্তর্ভাষিক মিথস্ক্রিয়া, আন্তর্জাতিক বিস্তার এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা বিশ্লেষণ করা হয়েছে ‘বাংলা ভাষার বিশ্বায়ন: পর্ব থেকে পর্বান্তরে’ প্রবন্ধে।
দ্বিতীয় পর্বে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, মনীষা ও বৌদ্ধিক ঐতিহ্যের নানা অনুষঙ্গ আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। বিদ্যাসাগর-বঙ্কিমের তুলনামূলক বিচার, মশাররফের মানসে সমন্বয়ী জীবনবোধ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার অনুসন্ধান এবং ‘সবুজপত্র’-এর শতবর্ষে পুনঃপাঠ ও পুনর্মূল্যায়ন বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশধারাকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনার অবকাশ তৈরি করে। আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, কাজী মোতাহার হোসেন, আনিসুজ্জামান ও হুমায়ুন আজাদকে নিয়ে রচিত প্রবন্ধগুলোতে ঐতিহ্যসন্ধান, ভাষাচর্চা, মুক্তবুদ্ধি, বিজ্ঞানমনস্কতা, বক্তৃতাশৈলী, পাণ্ডিত্য ও মনীষার স্বতন্ত্র তাৎপর্য উন্মোচিত হয়েছে।
তৃতীয় পর্বে মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ, শামসুর রাহমান, শহীদ কাদরী ও ওমর আলীর কবিসত্তার বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে বাংলা কবিতার বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতা ও নন্দনচেতনার পরিচয় পাওয়া যায়। এখানে কবির ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের পাশাপাশি বিদ্রোহ, ইতিহাসচেতনা, কালজ্ঞান, জাতীয়তাবোধ ও নৈঃসঙ্গ্যের মতো বিষয়ও আলোচনার পরিসর লাভ করেছে। সব মিলিয়ে গ্রন্থটির প্রবন্ধগুলো বাংলাসাহিত্যকে বিচ্ছিন্ন রচনা কিংবা ব্যক্তিকেন্দ্রিক মূল্যায়নের সীমায় আবদ্ধ না রেখে বৃহত্তর ঐতিহাসিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক পরিপ্রেক্ষিতে পাঠ করার সম্ভাবনা তৈরি করে। বিষয়বৈচিত্র্য ও আলোচনার বহুমুখিতায় গ্রন্থটি বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির পরিচিত অধ্যায়গুলোর পুনর্বিবেচনার পাশাপাশি পাঠককে নতুন প্রশ্ন উত্থাপন এবং প্রচলিত মূল্যায়নপদ্ধতি সম্পর্কে পুনরায় ভাবতে উৎসাহিত করবে।