ঐতিহাসিক বাবা আদম মসজিদ

মুন্সীগঞ্জ জেলার ঐতিহাসিক ও প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলোর মধ্যে অন্যতম বাবা আদম মসজিদ। মসজিদটি মুন্সীগঞ্জ সদরের রামপাল ইউনিয়নের মীরকাদিম এলাকার দরগাবাড়ি নামক স্থানে অবস্থিত। সুলতানি আমলের স্থাপত্যকলার অনন্য নিদর্শন হিসেবে এই মসজিদটি আজও দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক অমূল্য দলিল হিসেবে টিকে আছে।

ঐতিহাসিক পটভূমি : সুলতানি আমলে ১৪৮৩ সালে সুলতান জালাল উদ্দীন ফাতেহ শাহের শাসনামলে এই ঐতিহাসিক মসজিদটি নির্মিত হয়। স্থানীয় জনশ্রুতি ও ইতিহাস অনুযায়ী, ইসলাম প্রচারের মহান ব্রত নিয়ে সুফি সাধক বাবা আদম শহীদ (রহ.) সুদূর সৌদি আরবের তায়েফ নগরী থেকে এই অঞ্চলে আগমন করেন। হিন্দু রাজা বল্লাল সেনের সঙ্গে সংঘর্ষে তিনি এখানেই শাহাদাতবরণ করেন। তার স্মৃতি ও নামের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েই এই মসজিদটির নামকরণ করা হয় বাবা আদম মসজিদ।

স্থাপত্যশৈলী ও গঠনবৈচিত্র্য : এটি মূলত মধ্যযুগের প্রারম্ভিক সুলতানি আমলের ছয় গম্বুজবিশিষ্ট একটি প্রাচীন মসজিদ। মসজিদটির দেয়ালগুলো অত্যন্ত প্রশস্ত ও মজবুত। মসজিদটি দৈর্ঘ্যে ৪৩ ফুট এবং প্রস্থে ৩৬ ফুট। এর দেয়াল ইটে নির্মিত, যা প্রায় ৪ ফুট প্রশস্ত। এখানে ব্যবহৃত ইটগুলোর আকার যথাক্রমে ১০ ইঞ্চি, ৭ ইঞ্চি, ৬ ইঞ্চি ও ৫ ইঞ্চি। এগুলো লাল পোড়ামাটির ইট। সম্মুখভাগে তিনটি খিলানাকৃতির প্রবেশ পথ রয়েছে। অভ্যন্তরভাগে পশ্চিম দেয়ালে তিনটি মেহরাব রয়েছে। আর পূর্ব দেয়ালে রয়েছে আরবি লিপিতে উৎকীর্ণ একটি শিলাফলক।

মসজিদটির বাইরে ও ভেতরের দেয়ালে পোড়ামাটির ফলকে নান্দনিক কারুকার্য লক্ষ করা যায়, যা তৎকালীন শিল্পীদের নিখুঁত হাতের কাজের পরিচয় বহন করে। মসজিদটির প্রবেশদ্বার, খিলান এবং মেহরাবগুলোর সূক্ষ্ম নকশায় মধ্যপ্রাচ্য ও বাংলার নিজস্ব সংস্কৃতির এক অপূর্ব মিলন ঘটেছে।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পরিবেশ : প্রাচীন এই স্থাপনাটি শান্ত, স্নিগ্ধ ও মনোরম পরিবেশে অবস্থিত। এর আশপাশের সবুজ প্রকৃতি, গাছপালা এবং প্রাচীন স্থাপত্যের লালচে ইটের রূপ দর্শনার্থীদের মন কেড়ে নেয়। বর্তমানে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে এই মসজিদটি সংরক্ষিত রয়েছে। ইতিহাসপ্রেমী, গবেষক ও ভ্রমণপিপাষুরা প্রাচীন বাংলার মুসলিম ঐতিহ্য ও স্থাপত্যশৈলী সম্পর্কে জানতে নিয়মিত এখানে ভিড় জমান।

ঢাকা থেকে সড়ক পথে মুন্সীগঞ্জের দূরত্ব মাত্র ২৩ কিলোমিটার। ঢাকার গুলিস্তান, আবদুল্লাহপুর বা মিরপুর থেকে মাওয়াগামী বাসে চড়ে মুন্সীগঞ্জে যাওয়া যায়। মুন্সীগঞ্জ থেকে রিকশা নিয়ে ৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিলেই বাবা আদম মসজিদ পৌঁছা যায়।

চাইলে নৌপথেও যাওয়া যায়। সেক্ষেত্রে ঢাকার সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল থেকে মুন্সীগঞ্জগামী লঞ্চে চড়তে হবে। এরপর মুন্সীগঞ্জ থেকে রিকশা নিয়ে সরাসরি যাওয়া যাবে বাবা আদম মসজিদে।

লেখক : সংবাদকর্মী