আত্মশুদ্ধি ও উত্তম চরিত্র গঠনে সফলতা

মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করে আখেরাতে সফলতা লাভ করা আমাদের জীবনের মূল উদ্দেশ্য। এই লক্ষ্য অর্জনের দুটি প্রধান স্তম্ভ হলো আত্মশুদ্ধি অর্জন ও চরিত্র গঠন। মানুষের ভেতরের কুপ্রবৃত্তি, অহংকার ও হিংসা-বিদ্বেষ দূর করে অন্তরকে পবিত্র করাই হলো আত্মশুদ্ধি। আর সেই পবিত্র অন্তরের বাহ্যিক প্রতিফলনই হলো সুন্দর চরিত্র।

ইসলামে আত্মশুদ্ধির গুরুত্ব অপরিসীম। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনের সুরা শামসে ঘোষণা করেছেন, ‘যে নিজের আত্মাকে পবিত্র করেছে, সেই সফলকাম হয়েছে। আর যে নিজেকে কলুষিত করেছে, সে ব্যর্থ হয়েছে।’ (সুরা শামস ৯-১০)

অন্তর হলো শরীরের পরিচালিকা শক্তি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, জেনে রাখো! শরীরের মধ্যে একটি গোশতের টুকরো আছে, যা ঠিক থাকলে পুরো শরীর ঠিক হয়ে যায়। আর তা নষ্ট হলে পুরো শরীর নষ্ট হয়ে যায়। আর তা হলো অন্তর। (সহিহ বুখারি)

অন্তরকে হিংসা, রিয়া (লোক দেখানো ইবাদত), লোভ, পরশ্রীকাতরতা এবং অহংকারের মতো আত্মিক ব্যাধি থেকে মুক্ত রাখাই হলো আত্মশুদ্ধির প্রথম ধাপ।

নিয়মিত তওবা, ইস্তিগফার, জিকির এবং মহান আল্লাহর ভয়ে পাপকাজ ত্যাগ করার মাধ্যমে অন্তর পাপাচারমুক্ত ও জাগ্রত হয়।

আত্মশুদ্ধির স্বাভাবিক ও অনিবার্য ফলাফল হলো উত্তম চরিত্র গঠন। উত্তম চরিত্র হলো ইসলামের সৌন্দর্য। রাসুলুল্লাহ (সা.) তার নবুয়তের লক্ষ্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন, উত্তম চরিত্রকে পূর্ণতা দান করার জন্যই আমি প্রেরিত হয়েছি। (মুসতাদরাকে হাকেম)

নবীজি (সা.) হলেন সুমহান চরিত্রের সর্বোচ্চ প্রতীক। পবিত্র কোরআনে তার সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের ওপর অধিষ্ঠিত।’ (সুরা কলম ৪)

একজন প্রকৃত মুমিনের চরিত্র হবে সততা, বিনয়, ধৈর্য, দয়া, প্রতিশ্রুতি রক্ষা ও ক্ষমাশীলতায় উজ্জ্বল। কথা ও কাজে সততা বজায় রাখা, মা-বাবা, আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীর অধিকার আদায় করা এবং মানুষের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলাও চরিত্র গঠনের অংশ।

আত্মশুদ্ধি ও চরিত্র গঠনের মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ভেতরের আত্মশুদ্ধি ছাড়া মানুষের বাহ্যিক চরিত্র সুন্দর হতে পারে না। কারণ বাহ্যিক আচরণ হলো ভেতরের অন্তরেরই প্রতিচ্ছবি। কোনো ব্যক্তি যদি বাহ্যিকভাবে ভালো আচরণের অভিনয় করে, কিন্তু তার অন্তরে অহংকার বা হিংসা লুকিয়ে থাকে, তবে তা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। পক্ষান্তরে, যখন অন্তর খাঁটি হয়, তখন মানুষের প্রতিটি আচরণে দয়া, সহানুভূতি ও শালীনতা প্রস্ফুটিত হয়ে ওঠে।

সামাজিক জীবনে আত্মশুদ্ধি ও সুচরিত্রের প্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। কোনো সমাজে যখন ব্যক্তিবর্গ আত্মশুদ্ধি অর্জন করে, তখন সেখানে পারস্পরিক বিশ্বাসযোগ্যতা বৃদ্ধি পায়। হিংসা-বিদ্বেষ ও অন্যের ক্ষতি করার প্রবণতা লোপ পায়, ফলে হিংস্রতা ও অন্যায়ের পরিবর্তে বিরাজ করে শান্তি ও সম্প্রীতি। ইসলাম কেবল ব্যক্তিগত ইবাদতের ধর্ম নয়, বরং এটি একটি সম্পূর্ণ সামাজিক জীবনব্যবস্থা। একজন আত্মশুদ্ধিপ্রাপ্ত মুমিন তার পারিবারিক ও পেশাগত জীবনেও আমানতদারী রক্ষা করে। কর্মক্ষেত্রে ফাঁকি না দেওয়া, ব্যবসা-বাণিজ্যে ওজনে কম না দেওয়া কিংবা ভেজাল না মেশানো এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে লেনদেনে স্বচ্ছতা বজায় রাখা চরিত্র গঠনেরই মৌলিক অংশ।

চরিত্র গঠনের ক্ষেত্রে ধৈর্যের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। জীবনে প্রতিকূল পরিস্থিতি, দুঃখ-কষ্ট কিংবা মানুষের উসকানিমূলক আচরণে রাগ নিয়ন্ত্রণ করা এবং ধৈর্যের পরিচয় দেওয়া একজন খাঁটি মুমিনের লক্ষণ।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, সেই ব্যক্তি প্রকৃত বীর নয় যে কুস্তিতে কাউকে হারিয়ে দেয়, বরং সেই প্রকৃত বীর যে রাগের মাথায় নিজেকে সংবরণ করতে পারে। (সহিহ বুখারি)

এর পাশাপাশি ক্ষমাপ্রবণতা হলো চরিত্র গঠনের আরেকটি অন্যতম স্তম্ভ। মানুষের ভুলত্রুটি ক্ষমা করে দেওয়ার মানসিকতা অন্তরকে হিংসা ও ক্ষোভমুক্ত রাখে, যা আত্মশুদ্ধির পথকে আরও মসৃণ করে তোলে।

পারিবারিক জীবনে সুচরিত্রের প্রতিফলন ঘটানো অত্যন্ত জরুরি। ঘরের মানুষদের সঙ্গে নমনীয় আচরণ, সন্তানকে দ্বীনি ও নৈতিক শিক্ষায় বড় করে তোলা এবং তাদের সামনে উত্তম আদর্শ তুলে ধরা পিতামাতার নৈতিক দায়িত্ব। কোনো ব্যক্তি বাইরে যত প্রশংসনীয় আচরণই করুক না কেন, নিজ পরিবারে যদি সে নিষ্ঠুর বা খিটখিটে মেজাজের হয়, তবে তা পূর্ণাঙ্গ সুচরিত্রের লক্ষণ নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন, তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই উত্তম, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম। (সুনানে ইবনে মাজাহ)

তাই পারিবারিক শান্তি ও সম্প্রীতি রক্ষা করাও আত্মশুদ্ধিরই একটি অংশ। ধন-সম্পদের মোহ ত্যাগ করে অল্পে তুষ্টির গুণ অর্জন করা আত্মশুদ্ধির অন্যতম উপায়। অতিরিক্ত লোভ মানুষকে অন্যায় ও পাপাচারের দিকে ঠেলে দেয়। অন্যদিকে, যার অন্তরে আখেরাতের জবাবদিহি ও তাকওয়া (আল্লাহভীতি) বিদ্যমান, সে কখনোই পরধন কিংবা অন্যায় উপার্জনের দিকে হাত বাড়ায় না।

হালাল জীবিকা গ্রহণ করা দোয়া কবুল হওয়া ও অন্তর পবিত্র রাখার পূর্বশর্ত। হারাম ভক্ষণ করলে ইবাদতের মিষ্টতা নষ্ট হয়ে যায় এবং অন্তরে কঠোরতা চলে আসে। তাই চরিত্রকে নিষ্কলঙ্ক রাখতে হালাল রিজিকের ওপর অবিচল থাকা অত্যন্ত জরুরি।

বর্তমান যুগে আত্মশুদ্ধি ও উত্তম চরিত্র অর্জনের পথ সহজ নয়। চারপাশে পাপের ছড়াছড়ি, সামাজিক মাধ্যমের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার এবং জাগতিক ব্যস্ততা মানুষকে পথভ্রষ্ট করার জন্য প্রতিনিয়ত চেষ্টা চালাচ্ছে। তাই চরিত্র গঠনের জন্য মুমিনকে কয়েকটি নির্দিষ্ট পদক্ষেপ অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে গ্রহণ করতে হবে। তা উল্লেখ করা হলো।

নিয়মিত ইবাদত : নামাজ মানুষকে অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে। তাই ধীরস্থিরভাবে ও খুশু-খুজুর সঙ্গে নামাজ আদায় করতে হবে।

কোরআন-হাদিস চর্চা : অর্থসহ কোরআন তেলাওয়াত এবং রাসুল (সা.) ও সাহাবিদের জীবনী পাঠ মানসিক পরিবর্তন আনে এবং সঠিক দিকনির্দেশনা দেয়।

সৎসঙ্গ গ্রহণ : অসৎ সঙ্গ মানুষের চিন্তাধারা ও চরিত্র নষ্ট করে। তাই সৎ, খোদাভীরু ও দ্বীনদার মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে।

আত্মপর্যালোচনা : প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে নিজের সারা দিনের কাজগুলো পর্যালোচনা করা এবং কোনো ভুল বা পাপ হলে তাৎক্ষণিকভাবে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে শুধরে নেওয়া।

জবান ও দৃষ্টির সংযম : জিহ্বা ও চোখের সঠিক ব্যবহার চরিত্র রক্ষার অন্যতম শর্ত। রাসুল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি তার দুই চোয়ালের মাঝের অংশ (জিহ্বা) এবং দুই রানের মাঝের অংশের (লজ্জাস্থান) জামানত দেবে, আমি তার জান্নাতের জামানত দেব। (সহিহ বুখারি)

অনর্থক কাজ বর্জন : যে কাজ মানুষের মনকে অসচেতন করে তোলে এবং অন্তরে পাপাচারের বীজ রোপণ করে, তা থেকে দূরে থাকা জরুরি। অনর্থক কাজ মানুষের অনেক সময় নষ্ট করে দেয়। মানুষকে এক ধরনের ধোঁকায় ফেলে রাখে। তাই সব ধরনের অনর্থক কাজ বর্জন করতে হবে।

দোয়া করা : একাগ্র চিত্তে নিয়মিত মহান আল্লাহর কাছে উত্তম চরিত্র ও আত্মশুদ্ধি অর্জনের দোয়া করতে হবে এবং নিয়মিত চেষ্টা করে যেতে হবে। তাহলে মহান আল্লাহ আত্মশুদ্ধি অর্জনের তওফিক দান করবেন এবং চরিত্র সুন্দর করে দেবেন।

বান্দা যখন আত্মশুদ্ধি অর্জনের ইচ্ছা করবে, প্রতিনিয়ত মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করে যাবে এবং সঙ্গে সঙ্গে চেষ্টা চালিয়ে যাবে, তখন মহান আল্লাহ তাকে সেই গুণে গুণান্বিত করবেন।

কেয়ামতের দিন মিজানের পাল্লায় বান্দার সবচেয়ে ভারী আমল হবে তার উত্তম চরিত্র। কেবল বাহ্যিক পোশাক বা আচার-অনুষ্ঠানে ইসলাম সীমাবদ্ধ নয়, বরং আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে আত্মাকে খাঁটি করা এবং সুচরিত্রের মাধ্যমে সমাজে আলোর জ্যোতি ছড়িয়ে দেওয়াই ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা। আত্মশুদ্ধি ও উন্নত চরিত্র অর্জনের মাধ্যমেই একজন মানুষ ইহকালে মানসিক শান্তি লাভ করে এবং পরকালে পরম আনন্দের জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত হয়। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে আত্মশুদ্ধি অর্জনের মাধ্যমে সুন্দর ও সুদৃঢ় চরিত্রের অধিকারী হওয়ার তওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক : ধর্মীয় নিবন্ধকার