নিধন হচ্ছে শামুক-কাঁকড়া

পাবনার বিভিন্ন বিল, নদী ও নিচু এলাকা থেকে প্রতিদিন আশঙ্কাজনক হারে নিধন করা হচ্ছে প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের অকৃত্রিম বন্ধু শামুক ও কাঁকড়া। সরকারি তদারকির অভাবকে কাজে লাগিয়ে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী স্থানীয়দের মাধ্যমে নামমাত্র মূল্যে এসব সংগ্রহ করছেন। এরপর বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে তা পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। পরিবেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই দুই জলজ প্রাণী নির্বিচারে নিধনের ফলে পাবনার সামগ্রিক জলজ ইকোসিস্টেম বা প্রাকৃতিক ভারসাম্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মূলত হাঁসের খামার, মাছের খাদ্য প্রস্তুত এবং দেশের দক্ষিণাঞ্চলের চিংড়ি ঘেরে ব্যবহারের জন্য পাবনার বিভিন্ন জলাশয় থেকে বিপুল পরিমাণ শামুক ও কাঁকড়া ধরা হচ্ছে। গ্রাম্য দরিদ্র মানুষ, বিশেষ করে নারী ও শিশুরা সামান্য কিছু বাড়তি আয়ের আশায় দিনভর জলাশয়ে নেমে বস্তা ভরে এগুলো সংগ্রহ করছে। পরবর্তী সময়ে আড়তদার ও মধ্যস্বত্বভোগীরা তাদের কাছ থেকে নামমাত্র মূল্যে এগুলো কিনে নিচ্ছেন এবং বস্তাবন্দি করে ট্রাকে করে বিভিন্ন জেলায় চালান করে দিচ্ছেন।

পরিবেশবাদীরা জানান, শামুক মূলত প্রকৃতির ‘ফিল্টার’ বা পানি শোধনকারী হিসেবে কাজ করে। জলাশয়ের ময়লা-আবর্জনা ও ক্ষতিকর উপাদান খেয়ে এরা পানি পরিষ্কার রাখে এবং প্রাকৃতিকভাবে পানির গুণগত মান বজায় রাখতে সাহায্য করে। অন্যদিকে, কাঁকড়া মাটি ও পানির জৈব উপাদান নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পরিবেশবিদদের আশঙ্কা, এভাবে শামুক ও কাঁকড়া বিলুপ্ত হতে থাকলে জলাশয়ের পানি দ্রুত দূষিত হয়ে পড়বে এবং মাটির উর্বরতা নষ্ট হবে। একই সঙ্গে প্রাকৃতিকভাবে শামুক ও কাঁকড়া খেয়ে বেঁচে থাকা বিভিন্ন দেশি প্রজাতির মাছ এবং জলজ পাখিও তীব্র খাদ্য সংকটে পড়বে, যা পুরো অঞ্চলের জীববৈচিত্র্যকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেবে।

সরেজমিনে ভাঙ্গুড়া ও চাটমোহর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বিক্রির উদ্দেশ্যে সড়কের পাশে বস্তায় ভরে প্যাকেট করে রাখা হয়েছে শামুক। কেউ কেউ আবার ছোট ডিঙি নৌকায় করে বিভিন্ন জাল ও সরঞ্জাম দিয়ে বিল থেকে তুলছেন শামুক ও ঝিনুক। বিভিন্ন বিল থেকে নারী ও পুরুষরা শামুক সংগ্রহ করে এনে প্রতি কেজি ৮-১০ টাকা দরে বিক্রি করছেন। আর পাইকারি ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন হাঁস ও মাছের খামারিদের কাছে বিক্রি করছেন ১৫-২০ টাকা কেজি দরে।

অষ্টমনিষা গ্রামের নাহিদা জানান, শামুক তোলার আইনকানুন কিছু জানেন না তিনি। এ বিষয়ে তাকে কেউ কখনো কিছু বলেওনি। এই সময় কাজ-কাম না থাকায় নৌকা নিয়ে আবার কখনো নৌকা ছাড়াই শামুক ধরেন। পরে সেগুলো বস্তায় ভরে পাইকারি ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করেন। গড়ে ৪০০-৫০০ টাকা ইনকাম করা যায় বলে জানান তিনি।

খানমরিচ গ্রামের আলতাফ হোসেন জানান, পানি কম থাকলে হাত দিয়ে শামুক ধরা যায়। আর পানি বেশি থাকলে বিভিন্ন জাল দিয়ে ধরতে হয়। প্রতি কেজি শামুক ৮-১০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করা হয়। এ দিয়ে কাজ না থাকার এই সময়ে টুকটাক বাজার-সদাই চলে বলে জানান তিনি। বর্ষা মৌসুমে তাদের বাড়তি আয় হলেও প্রকৃতির জন্য হুমকি স্বরূপ বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, শামুক পানির ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান শুষে নেয়। এগুলো না থাকলে কৃষিজমিতে রোগবালাই বৃদ্ধি পাবে এবং কৃষকদের অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারে করতে বাধ্য হবে। তাই এগুলো বন্ধে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ করা দরকার।

পাটুল এলাকার বাসিন্দা লিটন বলেন, প্রতিদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত বিভিন্ন সরঞ্জাম দিয়ে বিল থেকে শামুক, ঝিনুকের পাশাপাশি কাঁকড়া ও কচ্ছপ ধরে, পাইকারদের কাছে নামমাত্র দামে এগুলো বিক্রি করেন তারা। তিনি জানান, পুকুর খনন, অবকাঠামো উন্নয়ন, বাড়িঘর নির্মাণসহ দিন দিন এমনিতেই চলনবিলের আয়তন কমে আসছে, এরপর আবার যদি এভাবে চলনবিলের জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করা হয় তাহলে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সম্ভাবনা দেখা দেবে বলে জানান তিনি।

অভিজ্ঞরা জানান, প্রতি বছরই বর্ষা মৌসুমে নদীনালা খালবিল থেকে প্রচুর পরিমাণে শামুক নিধন করা হয়। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইনে প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করা দ-নীয় অপরাধ হলেও স্থানীয়ভাবে এই নিধন বন্ধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না থাকায় প্রতিদিন হাজারো শামুক-কাঁকড়া নিধন হচ্ছে বলে জানান তিনি।

ভাঙ্গুড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. আরিফুজ্জামান বলেন, উপজেলা প্রশাসন ও মৎস্য অফিস গিয়ে তাদের শামুক উত্তোলন বন্ধে নিষেধ করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে যদি আবারও উত্তোলন করা হয় তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া করা হবে।