নিষেধাজ্ঞায় থামেনি ইলিশ বিক্রি

ইলিশ মাছ ধরার ওপর সরকারি নিষেধাজ্ঞার ১২ দিন পেরিয়ে গেলেও মাদারীপুরের শিবচরে পদ্মা নদীর পাড়ে থামেনি। নদী থেকে ধরে আনা মা-ইলিশ বিক্রি হচ্ছে একেবারে প্রকাশ্যেই। পদ্মার বিভিন্ন পয়েন্টে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টাই বসছে অস্থায়ী মাছের হাট। তাজা ইলিশের টানে শিবচরসহ আশপাশের বিভিন্ন উপজেলা থেকে প্রতিনিয়ত ছুটে আসছেন ক্রেতারা। তবে দুর্গম চরাঞ্চলে এভাবে অবাধে মাছ বিক্রি চলায় সরকারি নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন নিয়ে উঠেছে বড় প্রশ্ন।

আকারভেদে এসব হাটে ভিন্ন ভিন্ন দামে দেদার বিক্রি হচ্ছে পদ্মার রুপালি ইলিশ। এক থেকে দেড় কেজি ওজনের ইলিশের পাশাপাশি বাজারে মিলছে দুই কেজি ওজনের বড় মাছও। মূলত নদী থেকে সদ্য ধরা একদম তাজা ইলিশ পাওয়ার আশায় দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসছেন সাধারণ ক্রেতারা। তারা বাজারে এসে নিজেদের পছন্দ ও সামর্থ্য অনুযায়ী দাম হাঁকিয়ে ইলিশ কিনছেন।

শিবচর উপজেলার বন্দরখোলা ইউনিয়নের কাজিরসূরা বাজার সংলগ্ন পদ্মার পাড়, মাদবরেরচর ইউনিয়নের পুরানকান্দি এবং চরজানাজাত ইউনিয়নের হীরাখাঁর বাজার সংলগ্ন নদীর পাড় এখন ইলিশ বিক্রির প্রধান কেন্দ্র। এসব পয়েন্টে প্রতিদিন সকাল ও গভীর রাতে অস্থায়ী হাট সবচেয়ে বেশি জমজমাট হয়ে ওঠে। তবে এই নির্দিষ্ট সময়ের বাইরেও সেখানে দিনভর বিরতিহীনভাবে চলে ইলিশের বেচাকেনা।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বন্দরখোলা ইউনিয়নের কাজিরসূরা বাজারে সড়কপথে সহজেই যাতায়াত করা যায়। ফলে বিভিন্ন যানবাহনে করে ক্রেতারা সেখানে গিয়ে ইলিশ কিনছেন। অন্যদিকে, চরজানাজাত ইউনিয়নের হীরাখাঁর বাজার পদ্মার উত্তর পাড়ে হওয়ায় সেখানে যেতে নদী পার হতে হয়। মাদবরেরচরের পুরানকান্দি এলাকাতেও যাতায়াত বেশ দুর্গম। এসব স্থানে যেতে ক্রেতাদের পায়ে হেঁটে ও ছোট নৌকায় নদী পার হতে হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, দুর্গম এসব এলাকায় প্রশাসনের নজরদারি তুলনামূলক কম থাকায় ইলিশ বিক্রি বন্ধ হচ্ছে না।

বন্দরখোলা ইউনিয়নের কাজীরসূরা বাজারসংলগ্ন পদ্মার পাড়ের চরাঞ্চলে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে ক্রেতা-বিক্রেতার বেশ সরব উপস্থিতি। লোকসমাগম দেখে মনে হচ্ছিল, যেন কোনো উৎসবের আয়োজন চলছে। ক্রেতাদের আনাগোনাকে কেন্দ্র করে নদীর পাড়ে গড়ে উঠেছে অস্থায়ী দোকানপাট। নদী থেকে ট্রলারভর্তি মাছ নিয়ে জেলেরা তীরে পৌঁছানোর আগেই মাছ কেনার জন্য ট্রলারের দিকে ছুটে যাচ্ছেন ক্রেতারা। সেখানে ক্রেতারা দরদাম করে কিনছেন পছন্দের ইলিশ।

শিবচরের চরজানাজাত নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পুলিশ পরিদর্শক নাসিম আহমেদ বলেন, এ পর্যন্ত আমাদের অভিযানে নিয়মিত মামলা হয়েছে ১১টিÑ এতে আসামি ২৮ জন। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ১৩ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে জেল ও ৪ জনকে জরিমানা করা হয়। এছাড়া অভিযানে মোট ১১টি নৌকা জব্দ করা হয়। এ সময় মোট জাল উদ্ধার ১২ লাখ বর্গমিটার। তবে জাল পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়েছে সাড়ে ৩ লাখ মিটার।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ কারেন্ট জাল জব্দ, জেলেদের কারাদ- ও জরিমানা করা হলেও পদ্মা পাড়ের অস্থায়ী হাটগুলোতে ইলিশের বেচাকেনা অব্যাহত রয়েছে। ফলে একদিকে চলছে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে অভিযান, অন্যদিকে নদীর পাড়ে জমজমাট ইলিশের হাট। এমন পরিস্থিতিতে ইলিশের নির্বিঘœ প্রজনন নিশ্চিত করতে দুর্গম চরাঞ্চলসহ মাছ বিক্রির স্পটগুলোতে নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

ইলিশ বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শুধু শিবচর নয়, মুন্সীগঞ্জ ও শরীয়তপুরের জেলেরাও পদ্মার বিভিন্ন স্থানে মাছ ধরেন। তাদের ভাষ্য, অন্য এলাকার জেলেরা মাছ ধরলেও তারা মাছ ধরা বন্ধ রাখলে জীবিকা নির্বাহ করবেন কীভাবে? এ যুক্তিতেই কেউ কেউ নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও মাছ ধরা ও বিক্রি চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

শিবচর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সত্যজিৎ মজুমদার বলেন, ‘জনবল সংকটের কারণে পুরো এলাকায় শতভাগ নজরদারি নিশ্চিত করা কঠিন। তবে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে দ্রুত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। পদ্মার পাড়ের যতগুলো মাছ বিক্রির স্পট আছে, সেগুলো ভেঙে দেওয়া হবে। কাজিরসূরা বাজারের হাট গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন থেকে ক্রেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া, আমাদের নিয়মিত অভিযান চলবে।’