খাদ্য ব্যবসা করতে হলে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) থেকে নিতে হবে লাইসেন্স। এ নিয়ম নতুন আসা ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি পুরনোদের জন্যও। আগামী ১ নভেম্বর থেকে এ সিদ্ধান্ত কার্যকরের ঘোষণা দিয়েছে সংস্থাটি। জানা গেছে, নতুন নিয়মে পথের ধারের অস্থায়ী ফুসকার দোকান থেকে শুরু করে যত খাদ্য ব্যবসায়ী রয়েছেন, তাদের সবাইকে আসতে হবে নিবন্ধনের আওতায়।
গতকাল বুধবার বিএফএসএর পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সম্প্রতি নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩-এর আওতায় জারি করা হয়েছে নিরাপদ খাদ্য (রেজিস্ট্রেশন ও লাইসেন্স) প্রবিধানমালা-২০২৬। এ প্রবিধানমালার আওতায় বাধ্যতামূলক করা হয়েছে কর্তৃপক্ষের লাইসেন্স। আগামী ১ নভেম্বর থেকে খাদ্য ব্যবসায়ীরা নিবন্ধন ও লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে পারবেন।
বিএফএসএ জানিয়েছে, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণ এবং খাদ্য ব্যবসাকে একটি সুশৃঙ্খল কাঠামো এবং জাবাবদিহিতায় আনার জন্যই জারি করা হয়েছে এ নতুন নীতি। নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩ এবং নিরাপদ খাদ্য (রেজিস্ট্রেশন ও লাইসেন্স) প্রবিধানমালা-২০২৬ অনুযায়ী, নির্ধারিত ৪ শ্রেণির খাদ্য ব্যবসার ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক লাইসেন্স, প্রিমিসেস লাইসেন্স, উৎপাদন ও আমদানিকৃত পণ্যের লাইসেন্স এবং লাইসেন্সপ্রাপ্ত পণ্যসমূহের নিবন্ধন গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। একই সঙ্গে নির্ধারিত ১৬টি শ্রেণির খাদ্য ব্যবসা ও খাদ্য স্থাপনার ক্ষেত্রেও নিবন্ধন গ্রহণের বিধান রাখা হয়েছে।
ফলে পথের ধারে ভ্রাম্যমাণ বা অস্থায়ী খাবারের দোকান, ছোট রেস্তোরাঁ থেকে শুরু করে আমদানিকারক ও বড় আকারের খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান, খাবারের ব্যবসায় জড়িত এমন সব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকেই এখন থেকে নির্ধারিত কর্তৃপক্ষ থেকে রেজিস্ট্রেশন নিতে হবে।
প্রবিধানের তফসিলে খাদ্য ব্যবসাকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রচলিত ১৬ ধরনের খাদ্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য শুধু নিবন্ধনই যথেষ্ট হবে। তবে যারা বিশেষ ধরনের বা সুপার ফুড পণ্য নিয়ে কাজ করেন, তাদেরও লাইসেন্স নিতে হবে।
রেস্তোরাঁ, বেকারি, ফলের জুসের দোকান, পেস্ট্রি শপ এবং ক্যাটারিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ থেকে নিবন্ধন নিতে হবে। প্যাকেটজাত বা মোড়কজাত খাবার উৎপাদনকারী, মিষ্টির দোকান, দুগ্ধপণ্য প্রস্তুতকারী এবং আমদানিকারকদেরও (কাঁচা ও তাজা খাবার বাদে) নিবন্ধন করতে হবে। এমনকি রাস্তার পাশে যারা পিঠা, পুরি ও পেঁয়াজুর মতো খাবারের ব্যবসা করেন, নতুন এ নিয়মের আওতায় তাদেরও নিবন্ধন নিতে হবে।
এ ছাড়া পাইকারি মুদি খাদ্য ব্যবসা, কাঁচা ও তাজা খাদ্য আমদানি, খাদ্য সংরক্ষণাগার ও কোল্ডস্টোরেজ, ভোজ্যতেল ও ভোজ্য লবণ উৎপাদন, বিশেষ খাদ্য, পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য, স্বাস্থ্য সহায়ক ও সম্পূরক খাদ্য, বিশেষ পথ্য, চিকিৎসা সংক্রান্ত বিশেষ পথ্য, প্রোবায়োটিক ও প্রিবায়োটিক খাদ্য, জৈব-খাদ্য, পরিবর্তিত খাদ্য, অভিনব খাদ্য, ব্যবহারিক খাদ্য, একাধিক ধাপে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য এবং খাদ্য সংযোজন দ্রব্যের উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ, মজুদ, আমদানি, রপ্তানি ও বিপণন সংশ্লিষ্ট নির্ধারিত ব্যবসার জন্য নিবন্ধন বা রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
অন্যদিকে যেসব প্রতিষ্ঠান বিশেষায়িত খাদ্যপণ্য নিয়ে কাজ করে, যেমন শিশুদের ফর্মুলা দুধ এবং বয়স্ক বা নির্দিষ্ট রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য তৈরিকৃত বিশেষ ধরনের খাবার এমন চার ধরনের ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে এ প্রবিধানের মাধ্যমে বাধ্যতামূলক লাইসেন্সের আওতায় নিয়ে আসা হবে। এর মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্য সহায়ক ও সম্পূরক খাদ্য, বিশেষ পথ্য ও চিকিৎসাসংক্রান্ত বিশেষ পথ্য, প্রোবায়োটিক ও প্রিবায়োটিক খাদ্য এবং নিউট্রাসিউটিক্যালসহ অনুরূপ খাদ্যের উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ, মজুদ, আমদানি ও বিপণন।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিরাপদ খাদ্য (রেজিস্ট্রেশন ও লাইসেন্স) প্রবিধানমালা-২০২৬-এর তফসিল-১০-এ নির্ধারিত ফি পরিশোধ করে সংশ্লিষ্ট প্রবিধানে বর্ণিত শর্তপূরণ সাপেক্ষে আবেদন করতে হবে। বাধ্যতামূলক লাইসেন্সের ক্ষেত্রে নির্ধারিত ফরমে আবেদন করতে হবে।
কর্তৃপক্ষ আরও জানায়, নিবন্ধন বা লাইসেন্স গ্রহণের বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও নিবন্ধন বা লাইসেন্স ছাড়া খাদ্য ব্যবসা পরিচালনা করা নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩-এর সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী দ-নীয় অপরাধ। এ কারণে সংশ্লিষ্ট খাদ্য ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্ধারিত সময় থেকে প্রযোজ্য নিবন্ধন ও লাইসেন্স গ্রহণের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
নিবন্ধন ও লাইসেন্সের মেয়াদ হবে তিন বছর : বিধিমালা অনুযায়ী, প্রচলিত ১৬ ক্যাটাগরির খাদ্য ব্যবসার প্রথমবার নিবন্ধন বিনামূল্যে করা হয়েছে। সুপারফুড প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের প্রিমিসেস লাইসেন্স ফি ফ্লোরের আকারের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারণ করা হবে। ১০০ বর্গমিটার বা তার নিম্নে প্রতিষ্ঠানের জন্য এই ফি ১০ হাজার টাকা এবং ১০ হাজার বর্গমিটারের চেয়ে বড় প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে নতুন লাইসেন্স নিতে ৬০ হাজার টাকা ফি দিতে হবে।
প্রতিটি খাদ্যপণ্যের প্যাকেটে বিএফএসএ রেজিস্ট্রেশন নম্বর উল্লেখ করতে হবে। এতে ভোক্তা পণ্য দেখেই প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন রয়েছে কি না, তা বুঝতে পারবেন এবং যেকোনো অভিযোগ রেজিস্ট্রেশন নম্বর উল্লেখ করেই করতে পারবেন। প্রাথমিক অবস্থায় কর্তৃপক্ষ, সংশ্লিষ্ট জেলা কার্যালয় থেকে লাইসেন্স ও রেজিস্ট্রেশনের জন্য আবেদন করা যাবে। তবে কর্তৃপক্ষ ধাপে ধাপে শতভাগ অনলাইন আবেদন গ্রহণের কার্যক্রম গ্রহণ করেছে।