সাত বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে হুইলচেয়ারে বন্দি সুনামগঞ্জের আকলিমার জীবন। দুর্ঘটনায় তার মেরুদণ্ড ও দুই পা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর দীর্ঘ সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসা করানো হলেও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি তিনি। পারিবারিক অসচ্ছলতার কারণে উন্নত চিকিৎসাও নেওয়া হয়নি। আকলিমা সুনামগঞ্জের সীমান্তবর্তী বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ধনপুর ইউনিয়নের চিনাকান্দি বালুচর গ্রামের মৃত আব্দুর রাশিদের মেয়ে।
একসময় অন্য সবার মতোই স্বাভাবিক ছিল আকলিমার জীবন। ছিল স্বপ্ন, ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা পরিকল্পনা, সংসার গড়ার ইচ্ছে। পরিবার-পরিজনকে নিয়ে সুখী জীবনের স্বপ্ন দেখতেন তিনি। কিন্তু একটি সড়ক দুর্ঘটনা মুহূর্তেই বদলে দেয় তার জীবনের পুরো গল্প। দেশ রূপান্তরকে দেওয়া ভিডিওবার্তায় আকলিমার করুণ আর্তি, ‘আমি আবারও উঠে দাঁড়াতে চাই। আমি নিজের পায়ে হাঁটতে চাই। আমি গরিব, দেশবাসী আমাকে সাহায্য করুন।’
একই আকুলতা সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ফেনীর ফুলগাজী থানার ইসলামপুর গ্রামের তারিকুল ও চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার কুতুবপুর ইউনিয়নের সিন্দুরিয়া আবদার মোড় এলাকার তরুণ সজীবেরও। তারাও দীর্ঘদিন ধরে পঙ্গুত্বের সঙ্গে লড়াই করছেন। এখন হুইলচেয়ারই তাদের একমাত্র সঙ্গী। সড়কে গণপরিবহন দুর্ঘটনায় দেশব্যাপী এমন হাজারো আহত পঙ্গুত্ব নিয়ে বেঁচে থাকা ব্যক্তির গল্পের সঙ্গে মিশে আছে প্রতি বছর হাজার হাজার নারী-শিশু, বয়োজ্যেষ্ঠ ও তারুণ্যের মৃত্যুর উপাখ্যান। কিন্তু সড়ক-মহাসড়ক জনসাধারণের চলাচলের জন্য নিরাপদ হয়নি। আজ ২২ অক্টোবর জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসের প্রতিপাদ্য : নিরাপদ সড়ক, সমৃদ্ধ দেশ; সবার আগে বাংলাদেশ।
গতকাল মঙ্গলবার এই রিপোর্ট লেখার দিনে নাটোরের বড়াইগ্রামে বাস ও ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে ঝরে গেছে ১২টি তাজা প্রাণ। আহত হয়েছেন আরও অন্তত ৩০ জন। ওইদিন ভোর সোয়া ৪টায় উপজেলার বনপাড়া পুলিশ তদন্তকেন্দ্রের সামনে এ দুর্ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইফতেখারুল আলম।
আগেরদিন ১৯ অক্টোবর (সোমবার) সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন হবিগঞ্জে ২ মোটরসাইকেল আরোহী, কিশোরগঞ্জে ১ শিশু, মানিকগঞ্জ, গোপালগঞ্জ, কুড়িগ্রাম ও বগুড়ায় ১ জন করে। এর আগে ১৭ অক্টোবর কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার জাদুরচর ইউনিয়নের শীবেরডাঙ্গী (সায়েদাবাদ) বাজারে একটি দ্রুতগতির পণ্যবোঝাই ট্রাক দাঁড়িয়ে থাকা একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকে চাপা দেয়। এতে ঘটনাস্থলে ও হাসপাতালে নেওয়ার পথে ৫ জনের মৃত্যু হয়। নিহতদের মধ্যে মা, দুই শিশুসন্তান ও খালাসহ একই পরিবারের চারজন এবং অটোরিকশাচালক রয়েছেন। এভাবেই সড়কে মৃত্যুর উপাখ্যান রচিত হচ্ছে নিয়মিত। এসব ঘটনায় মামলা হলেও বিচার পায় না ভুক্তভোগীর পরিবার। আবার প্রশাসনের কাছ থেকেও পর্যাপ্ত আর্থিক ও আইনগত সহায়তা পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ রয়েছে।
বেপরোয়া গতি, চালকের মনোযোগ না থাকা, মোবাইল ফোনে কথা বলায় ব্যস্ত থাকা, অন্য গাড়ির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গাড়ি চালানো, ওভারটেক ও ইউটার্নে ট্রাফিক বিধিনিষেধ না মানাসহ আরও নানা কারণে সড়কে দুর্ঘটনা ঘটছে প্রতিদিন।
ব্র্যাক রোড সেফটি প্রোগ্রাম (জিআরএসপি) ম্যানেজার এম খালিদ মাহমুদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, সেফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ (এসএসএ) না মেনে চলায় দুর্ঘটনা এবং মৃত্যুর সংখ্যা কমানো যাচ্ছে না। তিনি বলেন, বিশ্বব্যাপী এসএসএ নিরূপিত হয় নিরাপদ গাড়ি ও নিরাপদ গতি মেনে চলার মাধ্যমে। এ ছাড়া রিস্ক ফ্যাক্টরগুলোর মধ্যে রয়েছে অনিরাপদ সড়ক অবকাঠামো, ত্রুটিযুক্ত সিগন্যালিং সিস্টেম, ট্রাফিক পুলিশের উপস্থিতি না থাকা, গাড়ির বেপরোয়া গতি, সিটবেল্ট ব্যবহার না করা, মোটরসাইকেলে হেলমেট পরিধান না করা, চালক ও হেলপারের নেশা বা মাদক এড়িয়ে না চলা এবং পথচারীসহ সব সড়ক ব্যবহারকারীর অসতর্ক আচরণ।
খোদ সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্র্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে সড়কে বিভিন্ন পরিবহন দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৪২৩ জন। এর মধ্যে মোটরকার ও জিপ দুর্ঘটনায় দুইজন, বাস ও মিনিবাস দুর্ঘটনায় ৪৬ জন (১০.৮৭%), ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান দুর্ঘটনায় ৪৮ জন (১১.৩৫%), পিকআপ দুর্ঘটনায় ১১ জন (২.৬০%), মাইক্রোবাস দুর্ঘটনায় ৮ জন (১.৮৯%), মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৩০ জন (৩০.৭৩%) ভ্যান দুর্ঘটনায় ২১ জন (৪.৯৬%), ট্রাক্টর দুর্ঘটনায় ১ জন (০.২৪%), ইজিবাইক দুর্ঘটনায় ১৭জন (৪.০২%), ব্যাটারিচালিত রিকশা দুর্ঘটনায় ১১ জন (২.৬০%), অটোরিকশা দুর্ঘটনায় ৩২ জন (৭.৫৭%) ও অন্যান্য যান দুর্ঘটনায় ৯৬ জন (২২.৭০%) রয়েছে। একই বছরে সেপ্টেম্বরে সড়ক দুর্ঘটনায় পতিত হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ৪০৯ জন। চলতি বছরে বিআরটিএ কোনো তথ্য ওয়েবসাইটে আপলোড করেনি।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশন (আরএসএফ) তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা ৯ হাজার ১১১ জন এবং বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী এ সংখ্যা ৫ হাজার ৪৯০ জন। কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে এ সংখ্যা কয়েকগুণ বেশি; প্রতি বছরে ৩১ থেকে ৩২ হাজার ।
সড়ক দুর্ঘটনা, আহত ও নিহতের সংখ্যা সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য নিয়ে সরকারও চিন্তিত বলে জানান নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) আন্দোলনের মহাসচিব লিটন এরশাদ। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, গত ১৪ অক্টোবর একটি জাতীয় সেমিনারে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেছেন, যথাযথ তথ্য সংগ্রহে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে।
গত সোমবার সচিবালয়ের নিজ দপ্তরে শেখ রবিউল আলম এ প্রতিবেদককে বলেন, সড়ক নিরাপত্তার ধারণাটা হলো, একজন যাত্রী একটা গণপরিবহনে নিরাপদে উঠবেন এবং নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাবেন। এই যে উঠানামা এর পুরোটাই নিরাপদ সড়কের ধারণায় অন্তর্ভুক্ত।
তিনি বলেন, আমি যেটা আপনাকে বলতে চাই, একটা ডিটেইলস আইন প্রক্রিয়াধীন, এখনো খসড়াটা চূড়ান্ত করে আমাদের কাছে আসেনি। আশা করছি ২০২৭ এর ডিসেম্বর হবে; মানে অনেক সময় আছে। স্টেকহোল্ডারদের মতামত আমরা নিচ্ছি। কাছাকাছি ওরা যখন খসড়া করে পাঠাবে, তখন আমি ডিটেইলস বলতে পারব।
সাম্প্রতিক সময়ে যাত্রীকে হত্যা করে নগদ অর্থ লুটের ঘটনা এবং বাসে চালক ও হেলপার কর্র্তৃক মহিলা যাত্রী ধর্ষণ ছাড়াও যাত্রীদের সঙ্গে অসদাচরণের বিষয়গুলো সড়ক নিরপত্তার ধারণার মধ্যে পড়ে কি না? এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, কোনো একটা ড্রাইভার রাবারি করল, তার মানে সে ফৌজদারি অপরাধ করেছে। ফৌজদারি অপরাধ আর সড়ক নিরাপত্তা আইনের অপরাধ কাছাকাছি হবে, কিন্তু একটু ভিন্ন হবে। আবার ধরুন ড্রাইভার কিছু জানে না, মাঝখানে এসে ডাকাতির শিকার হয়ে গেল। ড্রাইভার, হেল্পার কেউ কিছু জানে না। তাছাড়াও তো যাত্রীরা ডাকাতিতে পড়তে পারেন, পারে না?
মন্ত্রী বলেন, ডেফিনিটলি সড়ক নিরাপত্তা আইনের মধ্যে যাত্রীর সর্বোচ্চ নিরাপত্তাটা নিশ্চিত করতে আইনি সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার জনসাধারণের আছে।
ব্র্যাক জিআরএসপি ম্যানেজার এম খালিদ মাহমুদ বলেন, সড়ক নিরাপত্তার ধারণায় গাড়িচালক ও হেলপারের আচরণবিধি নিয়েও আমরা কাজ করছি। সরকারের সড়ক পরিবহন আইনের খসড়া তৈরির কাজ আমরাই করছি। আশা করছি এবারে যে আইনটি হবে তাতে যাত্রীর সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, এসডিজি বাস্তবায়নে জাতীয় পরিকল্পনার আলোকে রোড ক্র্যাশে (সড়ক দুর্ঘটনায়) মৃত্যু ও আহতের সংখ্যা কমিয়ে আনতে সরকার ইউএনজিএ-তে এবার অঙ্গীকার করে এসেছে যে, সড়ক পরিবহন আইন আরও শক্তিশালী করা হবে।
নিসচা মহাসচিব লিটন এরশাদ বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা রোধে শুধু আইন যথেষ্ট নয়। এর জন্য দরকার সব পক্ষের (বিভিন্ন সংস্থা ও পরিবহন মালিক, চালক ও কন্ডাক্টর) আন্তরিক প্রচেষ্টা এবং উদ্যোগ। দুর্ঘটনা পরবর্তী সময়ের মামলার বিচারও গুরুত্বপূর্ণ। তবে আদালতকে উপযুক্ত তথ্যপ্রমাণ দিয়ে সহায়তা করতে পুলিশের ভূমিকা আরও জোরালো হতে হবে।
এদিকে, সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮-তে কন্ডাক্টর লাইসেন্স অর্জন ব্যতীত কাউকে গণপরিবহনে কন্ডাক্টর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া নিষিদ্ধ হলেও তা মানছে না গণপরিবহন মালিকরা। মহানগর, বিভাগ ও জেলায় একটি করে যাত্রী ও পণ্যপরিবহন কমিটি গঠনের কথা বলা হলেও তা মানা হয় না। অভিযোগ রয়েছে, দুর্ঘটনা পরবর্তী সময়ে চালক ও হেলপারদের রক্ষায় শ্রমিক ইউনিয়নগুলো মরিয়া হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক সুপারিশও দুর্ঘটনার মামলায় ন্যায়বিচারের পথে বাধা সৃষ্টি করছে।
# ( সুনামগঞ্জ থেকে ছবি ও তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন সেলিম আহমেদ তালুকদার)।