কক্সবাজার সৈকতে তিন পর্যটকের মৃত্যু, নিখোঁজ ২

কক্সবাজারের সুনীল জলরাশি আর ঢেউয়ের গর্জন উপভোগ করতে ঢাকা থেকে এসেছিলেন সাত বন্ধু। পাহাড় আর সমুদ্রের মেলবন্ধনে হারিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে শুরু হওয়া সেই আনন্দযাত্রা মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে রূপ নিয়েছে এক বিভীষিকাময়। কক্সবাজারের হিমছড়ি জাদুঘরসংলগ্ন সৈকতে গোসল করতে নেমে স্রোতের টানে ভেসে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ঢাকার উত্তরার দুই তরুণসহ তিন যুবক। এখনো সাগরের উত্তাল ঢেউয়ে নিখোঁজ রয়েছেন আরও দুজন। নিহতরা হলেন ঢাকার উত্তরার  দিয়াবাড়ির মুকাররম হোসেনের ছেলে আল মাহিবুর ইবনে মোকাররম, সাইবুল হক জিসান এবং  নিখোঁজ রয়েছেন উত্তরার আজিমপুরের নাবিবুর রহমানের ছেলে এসএম নাফিসুর রহমান নিবিড়। তবে উদ্ধারকারী দলের মৃত যুবক ও নিখোঁজ আরেকজনের পরিচয় জানা যায়নি।

জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেল থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, ঢাকার উত্তরার বাসিন্দা সামিন ইসরাত নাফি, রুহুল আমিন শাফি, ঐশ্বর্য অক্ষর, সুফি আমিন নাবিল, আল মাহিবুর ইবনে মোকাররম, সাইবুল হক জিসান ও এসএম নাফিসুর রহমান নিবিড় সাত বন্ধু গত ১৮ অক্টোবর বেরিয়েছিলেন। তাদের লক্ষ্য ছিল পাহাড়ি কন্যা বান্দরবান। সেখানে দুদিন পাহাড়ের মেঘ-কুয়াশার মিতালী দেখে গতকাল বুধবার বেলা সাড়ে ১১টায় তারা এসে পৌঁছান পর্যটননগরী কক্সবাজারে। দুপুর ১টার দিকে হিমছড়ির প্যাঁচার দ্বীপসংলগ্ন একটি রিসোর্টে ব্যাগপত্র রেখে তারা দুপুরের খাবার সেরে নেন। পরে পাহাড় ভ্রমণের ক্লান্তি মুছতে বিকেল ৪টার দিকে সবাই মিলে নামেন রিসোর্টসংলগ্ন সৈকতে। সাগরের নীল জলে মেতে ওঠা উচ্ছ্বাস মুহূর্তে বিষাদে পরিণত হয়। জানা গেছে, এই সাত বন্ধুর কেউ-ই সাঁতার জানতেন না। ফলে চোখের পলকে স্রোত তাদের টেনে নেয় গভীর সাগরে। তাদের আর্তচিৎকার ও বাঁচার আকুতি শুনে ছুটে আসেন স্থানীয় জেলে ও সৈকতের বাসিন্দারা। তারা নিজেদের জীবনবাজি রেখে সাগরে ঝাঁপিয়ে পড়েন উদ্ধারকাজে। স্থানীয়দের আপ্রাণ চেষ্টায় সামিন, শাফি, অক্ষর ও নাবিল নামের চার তরুণকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হলেও বাঁচানো যায়নি আল মাহিবুর ইবনে মোকাররম ও সাইবুল হক জিসানকে।

অন্যদিকে তাদের বাঁচাতে এগিয়ে আসা তরুণদের মাঝে একজনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তার পরিচয় শনাক্ত করা যায়। এ ছাড়া এখনো নিখোঁজ রয়েছেন উদ্ধারকারী দলের আরও একজন।

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. সুবক্তাগীন মাহমুদ সোহেল বলেন, হাসপাতালে তিনজনের মরদেহ রয়েছে। এ ছাড়া একজনকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জিল্লুর রহমান বলেন, সমুদ্রে গোসলে নেমে দুই পর্যটক নিহত এবং একজন নিখোঁজ রয়েছেন। আর গোসলে নামা দলটিকে উদ্ধারে গিয়ে স্থানীয় এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া আরেকজন নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। 

কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের জ্যেষ্ঠ স্টেশন কর্মকর্তা দোলন আচার্য্য জানিয়েছেন, নিখোঁজ পর্যটকদের উদ্ধারে সাগরে অভিযান চলছে।

বেসরকারি লাইফগার্ড প্রতিষ্ঠান সি-সেফের আঞ্চলিক পরিচালক ইমতিয়াজ আহমেদ জানান, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের কলাতলী থেকে লাবণী পয়েন্ট পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকায় গোসলে নেমে কেউ নিখোঁজ হলে উদ্ধারের জন্য সি-সেফের ২৭ জন লাইফগার্ডকর্মী রয়েছেন। কিন্তু কলাতলী থেকে দক্ষিণে দরিয়ানগর, হিমছড়ি, পাটুয়ারটেক, ইনানী হয়ে টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তীর্ণ সৈকতে উদ্ধার তৎপরতা চালানোর মতো পর্যাপ্ত কর্মী নেই।

হিমছড়ি-দরিয়ানগরসহ কলাতলী, সুগন্ধা ও লাবণী পয়েন্টে বর্তমানে অন্তত ২০টি গুপ্তখালের সৃষ্টি হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় গোসলে নামতে নিষেধ করে একাধিক স্থানে লাল নিশানা ওড়ানো হলেও অনেকে তা মানছেন না।

উল্লেখ্য, কক্সবাজারে বর্তমানে তিন লাখের বেশি পর্যটক অবস্থান করছেন। পাঁচ শতাধিক হোটেল, গেস্ট হাউজ, রিসোর্ট ও কটেজের কোনো কক্ষ খালি নেই বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।

সর্বশেষ গত ২৭ সেপ্টেম্বর কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের লাবণী পয়েন্টে সাগরে ভেসে গিয়ে এক পর্যটকের মৃত্যু হয়েছিল।