বনের পাশে বেগুনি ফুল

মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানসংলগ্ন সড়কের পাশে দেখা মিলছে বেগুনি রঙের এক ফুল। বড় বড় সবুজ পাতার ফাঁকে লম্বা মঞ্জুরিতে ফুটে থাকা ফুলগুলো প্রতি বছর অক্টোবর মাস থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত দেখা যায়। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের কাছে এ ফুলটির ব্যাপক পরিমাণে দেখা যায় বছর দুয়েক আগে। ফুলটি সম্পর্কে স্থানীয়দের খুব একটা ধারণা ছিল না। দেখে মনে হয় শিমফুল। আসলে না। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মোহিনী এ ফুলের নাম ‘কুডজু’। লাউয়াছড়া ভ্রমণে আসা দেশি-বিদেশি পর্যটক কিংবা স্থানীয় মানুষজন দৈনন্দিন চলার পথে প্রকৃতির অপরূপ উপহার কুডজু ফুলের মনোরম দৃশ্য দেখে বিমোহীত হন। কেউ কেউ গাড়ি থামিয়ে এ ফুলটির ছবি ও ভিডিও ধারণ করে নেন মোবাইলফোনে।

কুডজু লতা ও ফুল সম্পর্কে প্রকৃতিবিষয়ক লেখক ও গবেষক চয়ন বিকাশ ভদ্র বলেন, ‘প্রকৃতির উদ্ভিদজগতে এমন কিছু লতানো উদ্ভিদ রয়েছে, যাদের বৃদ্ধি ও বিস্তারের ক্ষমতা সত্যিই বিস্ময়কর। অল্প সময়ের মধ্যে তারা বিস্তীর্ণ এলাকা সবুজে ঢেকে দিতে পারে। তেমনই একটি উদ্ভিদ কুডজু। এই বহুবর্ষজীবী লতা একদিকে যেমন মাটির আচ্ছাদন, পশুখাদ্য ও মাটির উর্বরতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে, অন্যদিকে অনুকূল পরিবেশে অতিরিক্ত বিস্তারের মাধ্যমে স্থানীয় উদ্ভিদজগতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।’

কুডজু উদ্ভিদটি পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে বিশেষত চীন, জাপান ও আশপাশের অঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে জন্মে। অঞ্চলভেদে এর বিভিন্ন উপপ্রজাতি ও নাম প্রচলিত রয়েছে। ইংরেজিতে একে কঁফুঁ বলা হয়। উদ্ভিদটি মূলত উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়ায় ভালো জন্মে। পর্যাপ্ত সূর্যালোক, আর্দ্রতা এবং বেড়ে ওঠার উপযোগী মাটি পেলে এর লতা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এর কান্ড লম্বা, নমনীয় এবং বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা কাষ্ঠল হয়ে ওঠে। উপযুক্ত পরিবেশে লতাগুলো প্রায় ১০ থেকে ৩০ মিটার পর্যন্ত দীর্ঘ হতে পারে। মাটির ওপর দিয়ে ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি অন্য উদ্ভিদ, গাছের কা- কিংবা অবলম্বন আঁকড়ে ধরে ওপরের দিকে উঠে যায়।

কুডজুর পাতার গঠন বেশ আকর্ষণীয়। প্রতিটি যৌগিক পাতা সাধারণত তিনটি প্রশস্ত পত্রক নিয়ে গঠিত। পত্রকগুলো ডিম্বাকার থেকে কিছুটা হৃদ্পিন্ডাকৃতির হতে পারে। প্রজাতি ও পরিবেশভেদে পাতার কিনারা অখন্ড অথবা খাঁজযুক্ত দেখা যায়। পাতার সবুজ আচ্ছাদন উদ্ভিদটিকে সহজেই শনাক্ত করতে সাহায্য করে। এর ফুলও বেশ দৃষ্টিনন্দন। বেগুনি, গোলাপি-বেগুনি কিংবা লালচে-বেগুনি রঙের প্রজাপতি-সদৃশ ফুল লম্বা পুষ্পমঞ্জরিতে ফোটে। কুডজুর ফুলে মিষ্টি সুবাসও থাকে। ফুলের  পর চ্যাপ্টা শুঁটির মতো ফল তৈরি হয়। ফলের মধ্যে বীজ থাকে। কুডজুর বিস্তারে শুধু বীজ নয়, মাটিতে ছড়িয়ে পড়া কান্ড ও শিকড়েরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এর শিকড় খাবার ঘন করতে ব্যবহৃত হয়। এ ছাড়া এর লতা থেকে তৈরি আঁশ দিয়ে বস্ত্র, কাগজ ও ঝুঁড়ি তৈরি করা যায়।

কুডজুর রয়েছে নানা ব্যবহারিক গুরুত্ব। অতীতে বিভিন্ন অঞ্চলে মাটির ক্ষয়রোধ, অনাবাদি জমি আচ্ছাদন এবং গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবে উদ্ভিদটি চাষ করা হয়েছে। এর শিকড় থেকে শ্বেতসারসমৃদ্ধ উপাদান সংগ্রহ করা হয়, যা পূর্ব এশিয়ার কিছু অঞ্চলে খাদ্য প্রস্তুতিতে ব্যবহৃত হয়। শিকড়ের গুঁড়া ঐতিহ্যগতভাবে বিভিন্ন পানীয় ও খাদ্যেও ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

শিম বা মটরশুঁটি পরিবারের একটি বহুবর্ষজীবী আরোহী উদ্ভিদ কুডজু। যুক্তরাজ্যের রয়্যাল বোটানিক গার্ডেনস কিউয়ের প্ল্যান্টস অব দ্য ওয়ার্ল্ড অনলাইন তথ্যভান্ডার অনুযায়ী এ প্রজাতিটির আদি বিস্তৃৃতি এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে উত্তর অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত। বাংলাদেশও এর স্বাভাবিক বিস্তৃতির অন্তর্ভুক্ত। এর ফুলগুলো সাধারণত লম্বা মঞ্জরিতে গুচ্ছাকারে সাজানো থাকে। পাপড়ির রঙ বেগুনি, গোলাপি-বেগুনি কিংবা লালচে-বেগুনি হতে পারে। ফুলের ওপরের বড় পাপড়ির গোড়ায় হলুদ দাগ বা অংশ দেখা যায়। উদ্ভিদবিজ্ঞানে শিমজাতীয় পরিবারের এ ধরনের ফুলকে প্রজাপতি-আকৃতির প্যাপিলিওনেশিয়াস ফুল বলা হয়।