ব্যাচেলরের ঠাঁই মেলে না ইট-পাথরের শহরে

আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৪৮ এএম

ইট-পাথরের দেয়ালে ঘেরা যান্ত্রিক নগর ঢাকা। প্রতিদিন উচ্চশিক্ষা ও জীবিকার সন্ধানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এই রাজধানী-শহরে আসেন হাজারো মানুষ, যাদের একটি বড় অংশ তরুণ-তরুণী। নতুন শহরে নিজের জায়গা করে নেওয়ার লড়াই শুরু হয় তাদের। কিন্তু ক্লাস, পরীক্ষা, পড়াশোনা কিংবা চাকরির আগেই তাদের সামনে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায় থাকবেন কোথায়?

ঢাকায় ব্যাচেলরদের, বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের জন্য বাসা খোঁজা যেন আলাদা এক ভোগান্তির নাম। অনেক বাড়ির মালিক সরাসরি ব্যাচেলরদের বাসা ভাড়া দিতে চান না। কোথাও বাসা পাওয়া গেলেও শর্তের শেষ থাকে না। আবার কেউ ভাড়া দিতে রাজি হলে একই এলাকার পরিবার নিয়ে থাকা ভাড়াটিয়ার তুলনায় ব্যাচেলরদের কাছ থেকে বাড়তি টাকা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

ফলে, সামর্থ্য অনুযায়ী ভালো বাসা বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকে না নিম্ন কিংবা মধ্য আয়ের অনেক ব্যাচেলরের, বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের। কম খরচে থাকার জন্য তাদের আশ্রয় নিতে হয় অনেকের সঙ্গে মেস বা ছোট কক্ষে। সেখানে একই কক্ষে তিন-চারজনও থাকেন; অনেক সময় এরচেয়ে বেশিও থাকেন। ব্যক্তিগত পরিসর বলতে কিছু থাকে না। পড়াশোনা, ঘুম, খাওয়া সবকিছুই চলে একই জায়গায়।

ব্যাচেলর শুনলেই বাসা দিতে চান না : রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্প্রতি পড়াশোনা শেষ করে চাকরির প্রস্তুতি নিতে ঢাকায় এসেছেন পঙ্কজ দেবনাথ। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪ জন শিক্ষার্থী মিলে বাসা ভাড়া নিতে চাই। কিন্তু ব্যাচেলর শুনে কেউ ভাড়া দিতে রাজি হয়নি।’ তিনি বলেন, ‘বাসা খুঁজতে গেলে প্রথমেই জিজ্ঞেস করে ব্যাচেলর কি না। ব্যাচেলর বললে অনেকেই আর কথা বলতে চান না। কয়েক জায়গায় বাসা দেখার পরও শেষ মুহূর্তে বলা হয়েছে ব্যাচেলরকে দেওয়া হবে না। ফলে বাধ্য হয়ে মেসে উঠি।’

তার মতো শিক্ষার্থীদের জন্য শেষ পর্যন্ত মেসই হয়ে ওঠে ভরসা। কিন্তু মেসে কম খরচে থাকার বিনিময়ে ছাড়তে হয় ব্যক্তিগত স্বস্তিÑ এমন অভিমত আরেক শিক্ষার্থী ইসমাইল রিফাতের। তিনি থাকেন বাংলামোটরের নেভি হাউজ এলাকার মেসের একটি কক্ষে। একই কক্ষে আরও তিনজন থাকেন। তিনি বলেন, ‘একসঙ্গে কয়েকজন থাকায় নিজের মতো করে পড়াশোনা করার সুযোগ নেই। একজন ঘুমালে অন্যজন পড়তে পারে না। আবার কারও পরীক্ষা থাকলে সবার রুটিনে প্রভাব পড়ে’।

শুধু কক্ষ ভাগাভাগিই নয়, অনেক মেসে শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করতে হয় সীমিত সংখ্যক ওয়াশরুম।

কোথাও ১৫ থেকে ২০ জনের জন্য রয়েছে মাত্র একটি ওয়াশরুম। সকালে ক্লাসে যাওয়ার সময় এ সমস্যা আরও প্রকট হয়ে ওঠে। একই সময়ে অনেকের বের হওয়ার তাড়া থাকায় ওয়াশরুম ব্যবহারের জন্য অপেক্ষা করতে হয়।

ইসমাইল রিফাত বলেন, ‘একটা বাসায় এত মানুষ থাকে, কিন্তু সুযোগ-সুবিধা সেই অনুপাতে নেই। ওয়াশরুম একটি, অথচ ব্যবহার করতে হয় অনেককে। সকালে ক্লাস থাকলে সময় মেলানো কঠিন।’

ভালো বাসা যেন ব্যাচেলরদের জন্য নয় : ঢাকার  বিভিন্ন এলাকায় বাসা ভাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রে ‘ফ্যামিলি’ ও ‘ব্যাচেলর’ এই দুই শ্রেণির ভাড়াটিয়ার মধ্যে পার্থক্য করার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ব্যাচেলরদের নিয়ে বাড়িওয়ালাদের একটি অংশের মধ্যে নানা ধরনের নেতিবাচক ধারণা রয়েছে। অনেক বাড়ির মালিকের আশঙ্কা ব্যাচেলর ভাড়াটিয়ার কারণে বাড়ির পরিবেশ নষ্ট হতে পারে, বেশি মানুষ আসা-যাওয়া করতে পারে এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গে সমস্যা তৈরি হতে পারে। এসব আশঙ্কার কারণে তারা ব্যাচেলরদের ভাড়া দিতে চান না বলে জানিয়েছেন কয়েকজন বাড়ি-মালিক।

বাড়তি ভাড়ায় জীবনযাত্রায় চাপ : একজন শিক্ষার্থীর জন্য মাসিক বাসাভাড়া শুধু একটি খরচ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে খাবার, যাতায়াত, পড়াশোনার খরচ, ইন্টারনেট, শিক্ষা উপকরণসহ নানা ব্যয়। ফলে আবাসনের খরচ বেড়ে গেলে তার প্রভাব পড়ে পুরো জীবনযাত্রায়। বিশেষ করে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ পরিবার থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা নিয়ে ঢাকায় থাকেন। তাদের অনেকের পক্ষে বাড়তি কয়েক হাজার টাকা বাসাভাড়া দেওয়া সহজ নয়। ফলে একজন শিক্ষার্থীকে কখনো বাসা বদলাতে হয়, কখনো মেসে নতুন সদস্য খুঁজতে হয়, আবার কখনো একই ঘরে আরও একজনকে জায়গা দিতে হয় শুধু মাসের খরচটা সামলে রাখার জন্য।

অন্য এক ঢাকা : ঢাকার ব্যস্ত সড়ক, উঁচু ভবন, ঝলমলে শপিংমল কিংবা অফিসপাড়ার বাইরে রয়েছে ব্যাচেলরদের আরেক ঢাকা। সেই ঢাকায় কয়েকজন মিলে একটি ছোট ঘর ভাগাভাগি করে থাকেন। একই ঘরে হয়তো একজন পড়েন, কেউ অফিসের হোম ওয়ার্ক করেন, আরেকজন করেন অনলাইনে ক্লাস।

দিন শেষে ক্লান্ত শরীর নিয়ে যে ঘরে ফেরেন তারা, সেখানে নিজের বলে আলাদা কোনো জায়গা থাকে না। তবু সেই ঘরই তাদের কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করা, স্বল্প বেতনের চাকরিতে নিজের খরচ চালিয়ে গ্রামে বাবা-মা, অনেক সময় ছোট ভাইবোনকে টাকা পাঠানো কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। আর আশায় আশায় থাকেন একদিন শেষ হবে ব্যাচেলর জীবন; ভাড়ায় হলেও উঠবেন পুরো একটি বাসায়। বাসাটি এমনকি নিজেরও হতে পারে কে জানে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত