প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হলো দুর্গোৎসব

শারদীয় দুর্গোৎসবের বিজয়া দশমী উদযাপিত হয়েছে। প্রতিমা বিসর্জন, সিঁদুর খেলা, পুষ্পাঞ্জলি, মিষ্টিমুখ ও শুভেচ্ছা বিনিময়ের মধ্য দিয়ে গতকাল বুধবার রাজধানীসহ সারা দেশে উদযাপিত হয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার বিজয়া দশমী। দেবী দুর্গাকে বিদায় জানানোর মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে পাঁচ দিনের দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা। বিসর্জনের মধ্যেও ভক্তদের প্রার্থনায় ছিল পরিবার, সমাজ ও দেশের মঙ্গল কামনা।

এদিন বিভিন্ন পূজামন্ডপে সকালে দশমীর বিহিত পূজা অনুষ্ঠিত হয়। পূজা শেষে শুরু হয় প্রতিমা বিসর্জনের প্রস্তুতি। বিভিন্ন মন্ডপে নারীরা একে অপরকে সিঁদুর পরিয়ে দেন। সিঁদুর খেলা, মিষ্টিমুখ, পুষ্পাঞ্জলি ও শুভেচ্ছা বিনিময়ের মধ্য দিয়ে উৎসবে যোগ হয় বিদায়ের আবেগ ও আনন্দ।

মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটির আয়োজনে গতকাল বিকেল ৪টায় রাজধানীর পলাশীর মোড় থেকে একটি শোভাযাত্রা বের হয়। শোভাযাত্রার শুরুতে বক্তব্য ৎ দেন বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের (কেন্দ্রীয় কমিটি) সাধারণ সম্পাদক সন্তোষ শর্মা। পরে শোভাযাত্রাটি সদরঘাটে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। শোভাযাত্রাকে ঘিরে ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষ তৎপর।

সন্তোষ শর্মা বলেন, ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সারা দেশে দুর্গাপূজা উদযাপিত হয়েছে। এবার পূজার ছুটি ও সময় বেশি থাকায় উৎসবের আনন্দও বেড়েছে। রাত ২টা-৩টা পর্যন্ত নারী-পুরুষ নির্বিশেষে মানুষ পূজামন্ডপ ঘুরে দেখেছেন।

তিনি বলেন, দেবী দুর্গার কাছে বাংলাদেশের উন্নতি, সমৃদ্ধি, অশান্তি দূরীকরণ এবং প্রতিটি নাগরিকের ভাগ্য পরিবর্তনের প্রার্থনা করেন ভক্তরা। পাশাপাশি সবাই যেন ভালো ও সুস্থ থাকেন এবং একটি সুন্দর জাতি গড়ে ওঠে সেই কামনাও করেন।

মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক শুভাশীষ কুমার বিশ্বাস সাধন দেশ রূপান্তরকে বলেন, গতকাল সকালে ঢাকেশ্বরী মন্দিরে বিজয়া দশমীর পূজা শেষে দর্পণ বিসর্জন হয়। ম-পে দিনভর প্রচুর মানুষের সমাগম ছিল। বিকেলে হাজারো মানুষের অংশগ্রহণে শোভাযাত্রা শেষে বুড়িগঙ্গায় প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়।

এবারের পূজা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিগত সময়ের তুলনায় এবারে মানুষের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা ও উৎসবের সর্বজনীনতা বেশি দেখা গেছে। সর্বসাধারণের অংশগ্রহণে সম্প্রীতির বন্ধন আরও সুদৃঢ় হয়েছে। এই প্রাপ্তিকে সামনে রেখে আমরা আগামী দিনের নতুন বাংলাদেশ দেখতে চাই।

ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের পুরোহিত প্রণব চক্রবর্তী দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিজয়া দশমীতে দেবী দুর্গার বিসর্জনের মধ্য দিয়ে পূজার আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়। সিঁদুর খেলা, মিষ্টিমুখ ও পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময়ের মাধ্যমে ভক্তরা বিজয়া দশমী উদযাপন করেন।

বিসর্জনের পর মন্ত্রপাঠের মাধ্যমে শান্তির প্রতীক হিসেবে জল বিতরণ করা হয়। এর মধ্য দিয়ে সবার মঙ্গল এবং আগামী দিনগুলো ভালো কাটার প্রার্থনা করা হয় উল্লেখ করে প্রণব চক্রবর্তী জানান, ধর্মীয় নিয়ম অনুযায়ী ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত প্রতিদিনই বিহিত পূজা অনুষ্ঠিত হয়। গতকাল দশমী তিথি ছিল বেলা ১১টা ১৬ মিনিট পর্যন্ত। এ সময়ের মধ্যে দশমীর বিহিত পূজা সম্পন্ন করে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দুর্গোৎসবের সমাপ্তি ঘটে।

বিজয়া দশমী উপলক্ষে বিভিন্ন এলাকায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ নানা আয়োজনও ছিল। কোথাও ভক্তরা নিরামিষ আহার করেন, আবার অনেকেই মাছ-মাংসসহ বিভিন্ন খাবারের আয়োজন করেন। অঞ্চলভেদে এসব রীতিতে ভিন্নতা থাকলেও উৎসবের মূল সুর ছিল শুভ কামনা ও মঙ্গল প্রার্থনা।

বিজয়া দশমী উপলক্ষে গতকাল বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত বঙ্গভবনে আয়োজিত শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি উপস্থিত সনাতন ধর্মাবলম্বী সম্প্রদায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। সেখানে ঢাকেশ্বরী মন্দিরের পূজা কমিটির প্রায় ১০০ সদস্য অংশগ্রহণ করেন।

এ বছর দেবীর আগমন ঘোটকে (ঘোড়ায়) এবং গমন হয় নৌকায়। শাস্ত্রমতে, ঘোটকে আগমনের ফলে ছত্রভঙ্গ ও রোগব্যাধির আশঙ্কা থাকে। আর নৌকায় গমনের অর্থ শস্যে সমৃদ্ধির ইঙ্গিত।

গত ১০ অক্টোবর মহালয়ায় দেবীকে আবাহনের মধ্য দিয়ে দুর্গোৎসবের পুণ্যলগ্ন ও দেবীপক্ষ শুরু হয়। এরপর ১৬ অক্টোবর ষষ্ঠীতে বেলতলায় (বিল্ব বৃক্ষ) পূজার পর দেবীকে আমন্ত্রণ ও অধিবাসের মধ্য দিয়ে দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। গত শনিবার ও রবিবার এ দুদিন মহাসপ্তমী, সোমবার মহাষ্টমী ও মঙ্গলবার মহানবমী উদযাপিত হয়। গতকাল বিজয়া দশমী উদযাপিত হয়েছে। এবার ঢাকা মহানগরে ২৫৮টিসহ সারা দেশে মোট ৩৩ হাজার ৮৫১টি মন্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

বিজয়া দশমী শুধু দেবী দুর্গার বিদায়ের দিন নয়, এটি সৌহার্দ্য ও শুভেচ্ছা বিনিময়েরও উপলক্ষ। প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি হলেও ভক্তদের মনে থেকে যায় আগামী বছর আবারও দেবীর আগমনের প্রত্যাশা।