হ্যারি কেইনের পুরোনো অভ্যাসে আবারও আর্সেনাল সমর্থকদের বুকে কাঁপন ধরেছিল। টটেনহ্যামের দিনগুলো থেকেই উত্তর লন্ডন ডার্বির সর্বোচ্চ ১৪ গোলদাতা এই ইংলিশ স্ট্রাইকার আজ অ্যালিয়াঞ্জ অ্যারেনাতেও আর্সেনালকে নিজের পুরোনো শিকার বানানোর সব জোগাড়ই শেষ করে এনেছিলেন।
তবে মিকেল আর্তেতার অপ্রতিরোধ্য আর্সেনাল যে কোনো দুর্গেই এখন নিজেদের উপস্থিতি জাহির করতে পারে, ম্যাচের ৮২ মিনিটে ডেকলান রাইসের সেই দুর্দান্ত গোলটি যেন তারই চূড়ান্ত সাক্ষ্য দিল। বায়ার্ন মিউনিখের দুর্গে গিয়ে দুইবার পিছিয়ে পড়ার উপক্রম সামলে শেষ পর্যন্ত ২-২ গোলের নাটকীয় ড্র নিয়ে মাঠ ছেড়েছে আর্সেনাল।
অ্যালিয়াঞ্জ অ্যারেনায় শুরু থেকেই আক্রমণের আগুন জ্বালালেও ১০ মিনিটে আর্সেনাল শিবিরে নেমে আসে বিশাল এক দুশ্চিন্তার কালো মেঘ। উরুর চোটে তাড়াহুড়ো করে মাঠ ছাড়তে হয় অধিনায়ক বুকাও সাকাকে। তার চোটের তীব্রতা নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে দুশ্চিন্তা প্রকাশ করে আর্সেনাল কোচ আর্তেতা বলেন, ‘তারা বেশ চিন্তিত। তীব্র যন্ত্রণা নিয়ে যখন কোনো খেলোয়াড়কে মাঠ ছাড়তে হয়, তখন তা কখনোই ভালো খবর নয়। আমাদের অপেক্ষা করে দেখতে হবে।’
সাকার জায়গায় মাঠে নেমেই ২৫ মিনিটে মার্টিন ওডেগার্ডের এক সুনির্দিষ্ট পাস নিয়ন্ত্রণে নিয়ে চমৎকার নিখুঁত শটে গানারদের এগিয়ে দেন এবেরেচি এজে। প্রাথমিক অফসাইডের শঙ্কা উড়িয়ে ভিএআর পরীক্ষা শেষে স্বাগতিকদের চমকে গোলটি বৈধ ঘোষিত হয়।
কিন্তু প্রতিপক্ষ যখন আর্সেনাল সেখানে কেইনের গোল করা আর থামায় কে? ব্যালন ডি’অরের রেসে শীর্ষে থাকা কেইন কারিশমা দেখালেন ৩৫ মিনিটে; নিজের অর্ধ থেকে বাড়ানো এক অসাধারণ থ্রু বল বাড়িয়ে আলফনসো ডেভিসকে দিয়ে সমতা ফেরান।
বিরতির পর বল ও গ্লাভসের জমজমাট লড়াই দেখে ফুটবল বিশ্ব। ব্রুনো গিমারেসের নিশ্চিত হেড মানুয়েল নয়ারের অভাবনীয় স্পর্শে ক্রসবারে লেগে ফিরে আসে, তো অন্যদিকে দায়ো উপামেকানোর পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক হেড রুখে দেন আর্সেনাল গোলরক্ষক ডেভিড রায়া। তবে ৬৯ মিনিটে জুরিয়েন টিম্বারের হ্যান্ডবলের সৌজন্যে পেনাল্টি পেয়ে যায় বায়ার্ন।
সেখানে ঠাণ্ডা মাথায় বরফশীতল শটে বল জালে জড়িয়েই এক নতুন ইতিহাসে নাম লেখান কেইন। প্রথম ফুটবলার হিসেবে কোনো এক নির্দিষ্ট দলের বিপক্ষে টানা সব মৌসুমে (২০১৪-১৫ থেকে ২০২৩-২৪) গোল করার বিরল এক কীর্তি গড়লেন এই ইংলিশ তারকা। সঙ্গে চ্যাম্পিয়নস লিগের মঞ্চেও এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছালেন তিনি। এটি চ্যাম্পিয়নস লিগে তার টানা ১০ ম্যাচে গোল, যা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর টানা ১১ ম্যাচে গোলের ঐতিহাসিক রেকর্ডের অলঙ্কৃত সিংহাসন থেকে মাত্র এক কদম দূরে দাঁড় করিয়ে দিল।
গানারদের জালে ১৬তম গোল আর রেকর্ডের মহিমা নিয়ে ‘টিএনটি স্পোর্টস’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হ্যারি কেইন মজা করে বলেন, ‘পেনাল্টি নিয়ে কোনো অনিশ্চয়তা ছিল না। প্রচুর অনুশীলন আর কঠোর পরিশ্রম থাকে এর পেছনে। স্কোরশিটে নাম তুলতে পেরে ভালো লেগেছে। আর্সেনালের বিপক্ষে আমি সব সময়ই পেনাল্টি পাই!’
কিন্তু বায়ার্ন যখন ভেবেছিল কেনের রেকর্ডের রাতে তাদের টানা ৩৯ ম্যাচের অপরাজিত হোম রেকর্ড অক্ষুণ্ণ রেখে জয় সুনিশ্চিত, ঠিক তখনই দৃশ্যপটে আর্বিভাব ঘটল রাইসের। ৮২ মিনিটে বদলি নামা ভিক্টর গিয়োকারেসের সুনির্দিষ্ট বাড়ানো বল ধরে বক্সের কোণ থেকে ক্লিনিকাল ফিনিশিংয়ে বায়ার্নের জয় ছিনিয়ে নেন রাইস। ম্যাচ শেষ হয় ২-২ ব্যবধানের ড্রয়ে।
আর্সেনালের এই হার না মানা মানসিকতা ও দলের আত্মনিবেদন নিয়ে ম্যাচ শেষে আর্সেনাল কোচ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, ‘কী এক ম্যাচ হলো! সাম্প্রতিক সময়ে আমরা যত ফুটবল খেলেছি, প্রতিপক্ষের মান ও চাহিদার বিচারে আজকের ম্যাচটি ছিল তার অন্যতম সেরা পর্যায়। ছেলেরা আজ যা করে দেখিয়েছে, তা সত্যিই বিশেষ কিছু।’
এদিকে পুরো ৯০ মিনিটের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পর ম্যাচটিতে পূর্ণ ৩ পয়েন্ট হাতছাড়া হলেও অর্জিত ১ পয়েন্টকে ন্যায্য বলেই মেনে নিয়েছেন বায়ার্ন স্ট্রাইকার কেইন। ‘একটু তো হতাশা আছেই, তবে আপনি যদি পুরো ৯০ মিনিটের দিকে তাকান, তবে এই ড্র একটি একদমই ন্যায্য ফলাফল।’