লেখকপত্রে মুগ্ধ গুণী লেখকরা

লেখকপত্র। ত্রৈমাসিক সাহিত্য সাময়িকী। সম্পাদক জহির উদ্দিন বাবর। লেখকদের অন্তর্জগৎ, লেখালেখির প্রেরণা, সংগ্রাম ও সৃজনযাত্রা নিয়ে প্রকাশিত এই বিশেষ সাময়িকী ইতিমধ্যে আট বছর পূর্ণ করেছে। এর ত্রিশতম সংখ্যায় দেশের গুণী আলেম লেখক ও গবেষকদের মূল্যায়ন, সাক্ষাৎকার, স্মৃতিচারণ এবং সাহিত্যচর্চার নানা দিক উঠে এসেছে। 

সাবেক ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন লেখকপত্রকে বাংলা সাময়িকীর জগতে এক উজ্জ্বল ও স্বকীয় নক্ষত্র হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার মতে, সাময়িকীটির মুদ্রণসৌষ্ঠব, শিল্পিত প্রচ্ছদ এবং গাম্ভীর্যপূর্ণ বিষয়বস্তু উচ্চমার্গীয় শিল্পবোধের পরিচয় বহন করে। মননশীলতার চর্চা ও মেধার সুষম বিন্যাসে এটি প্রথাগত ধারার বাইরে স্বতন্ত্র পরিচয় প্রতিষ্ঠা করেছে।

মাওলানা লিয়াকত আলী একে ম্যাগাজিন প্রকাশনা জগতের একটি অনন্য সংযোজন হিসেবে দেখেছেন। তার মতে, এটি লেখক ও পাঠকদের মধ্যে সুন্দর সেতুবন্ধ তৈরি করছে। লেখকদের লেখক হয়ে ওঠার পেছনের প্রেরণা ও বিপত্তি সম্পর্কে জানার মাধ্যমে নবীন লেখকরা উজ্জীবিত হন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, লেখকপত্র অচিরেই লেখকদের চরিতাভিধান হিসেবে পরিগণিত হবে।

মাওলানা ফয়সল আহমদ জালালী লেখকপত্রের বলিষ্ঠ উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে বলেছেন, একদল উদ্যমশীল কলমযোদ্ধার যৌথ প্রচেষ্টায় এটি প্রকাশিত হচ্ছে। তিনি সম্পাদক জহির উদ্দিন বাবরকে ঝুঁকি নেওয়ার মতো একজন সাহসী কলম সৈনিক হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

মুফতি এনায়েতুল্লাহ উল্লেখ করেছেন, ডিজিটাল ও স্মার্টফোনের যুগেও ছাপা কাগজের প্রতি তার আকর্ষণ বজায় থাকার অন্যতম কারণ লেখকপত্র। এর আয়োজন, বিন্যাস ও ধারাবাহিকতা অনলাইনের দ্রুততার বিপরীতে আলাদা মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। কাগজের পত্রিকার নিজস্ব আবেগ রয়েছে এবং লেখকপত্র লেখালেখি ও সাহিত্যচর্চায় ভিন্ন বলয় ও প্রভাব সৃষ্টি করতে পেরেছে।

মাওলানা মুনির আহমদ লেখকপত্রকে নিছক একটি সাময়িকী নয়, বরং আত্মিক সম্পর্কের জায়গা বলে মনে করেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, প্রবীণ লেখকদের জীবন, কর্ম ও স্মৃতি সংরক্ষণে এর প্রয়াস অত্যন্ত মূল্যবান। এআই ও সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে যখন দীর্ঘ ও মনোযোগী পাঠের অভ্যাস সংকুচিত হচ্ছে, তখন এটি মনোযোগ ফিরিয়ে আনার চমৎকার মাধ্যম হয়ে উঠেছে।

মাওলানা লাবীব আব্দুল্লাহ এই ম্যাগাজিনটির টিকে থাকাকে প্রশংসনীয় বলেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, লেখকদের লেখক হয়ে ওঠার গল্প এবং তাদের জীবন ও জীবিকার গল্প পড়ার তীব্র আগ্রহ থেকে তিনি এটি নিয়মিত পড়েন। তিনি ভবিষ্যতে নির্বাচিত লেখা নিয়ে একটি সংকলন প্রকাশের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন।

ইমতিয়াজ বিন মাহতাব লেখকপত্রের মেদহীন ও শুদ্ধ ভাষাসমৃদ্ধ উপস্থাপনার প্রশংসা করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, সাধারণত জীবিত লেখকদের আত্মজৈবনিক কথা সহজে জানা যায় না, কিন্তু লেখকপত্র সেই চাহিদা পূরণ করে চলেছে। এছাড়া নবীন ও প্রবীণ সবাইকে সমানভাবে এক মলাটে নিয়ে আসার ব্যাপারটি অত্যন্ত প্রশংসনীয় বলে উল্লেখ করেছেন।

হুমায়ুন আইয়ুব লেখকপত্রকে একটি নিয়মতান্ত্রিক ধারার লেখকদের কাগজ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, পত্রিকাটি শুরু থেকেই লেখকদের সুখ-দুঃখ, স্বপ্ন ও বেড়ে ওঠার গল্প অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে তুলে ধরে আসছে। নির্ভুল বানান, ঝরঝরে গদ্য এবং পরিমিত উপস্থাপনার পাশাপাশি প্রচ্ছদ থেকে শুরু করে ভেতরের প্রতিটি পাতায় সৌন্দর্য ও পরিচ্ছন্নতার ছাপ থাকে।

মাসউদুল কাদির লেখকপত্রকে নীরব বিপ্লব হিসেবে অভিহিত করেছেন। কবির ভেতরের হাহাকার ও লেখক মানসকে উপজীব্য করে সাহসিক চিন্তার খোরাক জোগানো এই সাময়িকীকে আরও সমৃদ্ধ করতে তিনি বার্ষিক পদক বা সম্মাননা চালুর পরামর্শ দিয়েছেন।

জিয়াউল আশরাফ লেখকপত্রকে তরুণদের জন্য উচ্ছ্বাসের এক আনন্দময় উপলক্ষ বলে অভিহিত করেছেন।

প্রযুক্তির অবাধ প্রবাহের এই যুগে মানুষের কাছে সহজলভ্য হয়েছে মোবাইল-ইন্টারনেট। সবাই দ্রুতগতির সংবাদের পেছনে ছুটে। কাগজের পত্রিকার কদর দিন দিন কমছে। এই কঠিন সময়েও লেখকপত্র নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে। এটি খুব বড় একটি কাজের বিষয়।

এই সংখ্যার অন্যতম আকর্ষণ হলো দুটি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎকার। প্রথমটি আল্লামা মামুনুল হকের। দ্বিতীয়টি শায়খ আহমাদুল্লাহর। আল্লামা মামুনুল হকের সাক্ষাৎকারে তার কারাবন্দি জীবনের ডায়েরি, লেখালেখি নিয়ে ভাবনা এবং আলেম সমাজের করণীয় বিষয়গুলো উঠে এসেছে। 

শায়খ আহমাদুল্লাহ তার বই প্রকাশের অভিজ্ঞতা এবং সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের কথা বলেছেন। এই সাক্ষাৎকারগুলো পাঠকদের মনে গভীর রেখাপাত করবে। তরুণ লেখকদের জন্য এখানে অনেক দিকনির্দেশনা রয়েছে।

লেখকপত্রের সম্পাদক জহির উদ্দিন বাবর। ছবি : সংগৃহীত

সম্পাদক জহির উদ্দিন বাবর বিশেষ সাক্ষাৎকারে মুখোমুখি হয়েছেন ত্রিশটি তীক্ষ্ণ প্রশ্নের। ম্যাগাজিন প্রকাশের পেছনের সংগ্রাম, সম্পাদনার অভিজ্ঞতা, লেখক ও সম্পাদকের পার্থক্য এবং একশতম সংখ্যায় লেখকপত্রকে কোথায় দেখতে চান, এসব বিষয়ে তার মননশীল আত্মকথন ফুটে উঠেছে।

মুফতি আমীর ইবনে আহমদের কথায় মফস্বল কেন্দ্রিক লেখালেখির বিভিন্ন দিক উঠে এসেছে। তিনি জানান, ময়মনসিংহ অঞ্চল ইসলামি সাহিত্যচর্চার উর্বর ভূমি হলেও সেখানকার লেখকদেরকে ঢাকাকেন্দ্রিক প্রকাশকদের উন্নাসিকতা ও নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়। নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও মফস্বলের লেখকরা নিজেদের মেধা ও লেখালেখির প্রতি একাগ্রতা বজায় রেখে সাহিত্যজগতে নিজেদের টিকিয়ে রেখেছেন।

সাময়িকীটির একটি বড় দিক হলো ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ। এই সংখ্যায় মাদ্রাসা অঙ্গনে বাংলা সাহিত্যচর্চার তিন দূরদর্শী পৃষ্ঠপোষককে স্মরণ করা হয়েছে। তারা হলেন মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী, মাওলানা আতহার আলী ও মাওলানা লুৎফুর রহমান বর্ণভী (রহ.)।

তাদের অবদান ছাড়া মাদ্রাসা অঙ্গনে আজকের এই সাহিত্যচর্চা কল্পনা করা যেত না। মাতৃভাষায় দীনি জ্ঞান প্রচারের জন্য তারা যে সংগ্রাম করেছেন, তা নতুন প্রজন্মের জানা খুব জরুরি। 

তিন কিংবদন্তি আলেম সম্পাদক মাওলানা আকরম খাঁ, মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী ও মাওলানা মুহিউদ্দীন খান (রহ.)-এর বর্ণাঢ্য জীবনের আলোচনা এই সংখ্যাটিকে ইতিহাস ও গবেষণার এক অনন্য দলিলে পরিণত করেছে।

লেখকদের লেখার টেবিল কেমন হয়, তা নিয়ে একটি চমৎকার আয়োজন রয়েছে এই সংখ্যায়। নাম সান্নিধ্যের দ্যুতি। প্রখ্যাত আলেম লেখক মাওলানা মুহাম্মাদ হেমায়েত উদ্দীন, মাওলানা ইয়াহইয়া ইউসুফ নদভী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুফতি মুহাম্মদ গোলাম রব্বানীর কর্মপরিবেশ ও লেখার অভ্যাস নিয়ে এতে আলোচনা করা হয়েছে। কীভাবে তারা বই সাজান, কোন কলম ব্যবহার করেন এবং কীভাবে তাদের চিন্তাগুলো শব্দে রূপ নেয়, এসবের চমৎকার বর্ণনা রয়েছে এখানে।

এই সংখ্যায় আন্তর্জাতিক সাহিত্যের ছোঁয়াও রাখা হয়েছে। সাহিত্যে নোবেলজয়ী কানাডার প্রখ্যাত লেখক অ্যান কারসনের সাহিত্যকর্ম নিয়ে সুন্দর আলোচনা রয়েছে।

সম্প্রতি ইন্তেকাল করা উপমহাদেশের প্রবীণ আলেম ও দারুল উলুম নদওয়াতুল উলামার মুহতামিম ড. মাওলানা সাইদুর রহমান আজমি নদভী (রহ.)-এর সাত দশকের কলম সাধনা নিয়ে লেখা শ্রদ্ধাঞ্জলি সংখ্যাটিকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

লেখকপত্র লেখা ও লেখকের কথা বলে যাক যুগ যুগ ধরে। নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরুক গুণী লেখকদের কর্মসাধনা ও সৃষ্টির নেপথ্য গল্প। সংরক্ষণ করুক বাংলা সাহিত্যচর্চার সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্য। প্রবীণদের অভিজ্ঞতা আর নবীনদের স্বপ্নকে এক মলাটে ধারণ করে লেখকপত্র হয়ে উঠুক লেখক ও পাঠকের প্রিয় আশ্রয়।