প্রচ্ছদ রচনা

সাহিত্য কীভাবে প্রতিবন্ধী চরিত্র ডিল করবে

আপডেট : ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৩২ পিএম

সাহিত্যে কোন চরিত্ররা উপস্থিত হয় আর কারা অনুপস্থিত থাকে? প্রশ্নটা আপাত সরল মনে হলেও এর রাজনৈতিক তাৎপর্য গুরুতর। সাহিত্যে বিশেষ কোনো চরিত্রের অনুপস্থিতি ক্ষেত্রবিশেষে মৌলিক কোনো অভিজ্ঞতার ভাষাহীন হয়ে থাকার বাস্তবতা তৈরি করে। সোজা কথায় বললে, সাহিত্যে যাদের নিয়ে লেখা হয়, সেসব চরিত্রকে মূলত সাহিত্যে জায়গা দেওয়া হয়; একইভাবে যাদের নিয়ে লেখা হয় না বা কম লেখা হয়—তাদের অনুভূতি, আশা-আকাঙ্ক্ষা, শরীর ও জীবনকে ভাষার বাইরে রেখে দেওয়া হয়। এভাবে এক ধরনের সামাজিক অদৃশ্যতার মধ্যেও তাদের ঠেলে দেওয়া হয়। প্রতিবন্ধী মানুষের চরিত্রায়ণের ক্ষেত্রে এই অদৃশ্যতা বিশেষভাবে লক্ষণীয়।

বাংলা সাহিত্যে প্রতিবন্ধী চরিত্রের উপস্থিতি একেবারে অলভ্য নয়। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের রজনী উপন্যাসের রজনী; মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘প্রাগৈতিহাসিক’ গল্পের ভিখু ও পাঁচী; তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘নারী ও নাগিনী’ গল্পের খোঁড়া শেখ প্রমুখ। তবু প্রশ্ন হলো, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে লেখক কতটা তার নিজস্ব অনুভূতি, আকাঙ্ক্ষা ও দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ডিল করতে পেরেছে? গল্পের করুণ অনুষঙ্গ, সংগ্রামের প্রতীক কিংবা অন্যের মানবতাবোধের পরীক্ষাক্ষেত্র না হয়ে পূর্ণ মানুষ হিসেবে কি এই চরিত্ররা উঠে আসতে পেরেছে? প্রতিবন্ধী চরিত্রের প্রেম, যৌনতা, ঈর্ষা, রাগ, অহংকার, আনন্দ কিংবা নান্দনিকতাবোধকে সাহিত্য কতটা ধারণ করে পারল? সাহিত্যে প্রতিবন্ধী মানুষের শরীর কি শুধু ‘সমস্যা’ হিসেবেই উপস্থিত থাকবে?

প্রতিবন্ধিতা নিয়ে সমকালীন ‘ডিসঅ্যাবিলিটি স্টাডিজে’র একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা এই যে, প্রতিবন্ধিতাকে শুধু ব্যক্তির শারীরিক বা মানসিক সীমাবদ্ধতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। সামাজিক কাঠামো, স্থাপত্য, যোগাযোগব্যবস্থা, ভাষা এবং ক্ষমতার সম্পর্কও নির্ধারণ করে কে কতটা ‘অক্ষম’ বলে বিবেচিত হবে। ব্রিটিশ সমাজতাত্ত্বিক মাইকেল অলিভারের প্রস্তাবিত ‘স্যোশাল মডেল অব ডিসঅ্যাবিলিটি’ এই জায়গায় একটি গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক পরিবর্তন ঘটিয়েছে। শরীরের impairment এবং সমাজের তৈরি disability-কে এক করে না দেখে তিনি প্রস্তাব করেন, অনেক ‘অক্ষমতা’ আসলে সামাজিক ব্যবস্থার তৈরি প্রতিবন্ধকতারই ফল।

একজন হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী মানুষ কোনো একটি ভবনে ঢুকতে পারছেন না—সমস্যাটা কি শুধু তার শারীরিক অক্ষমতার, নাকি সিঁড়িনির্ভর স্থাপত্যেরও? একজন শ্রবণপ্রতিবন্ধী মানুষ একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পারছেন না—সমস্যাটা কি সেই অনুষ্ঠানে কোনো বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা না থাকারও নয়? একই রকমভাবে একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষ যখন কোনো তথ্য পাচ্ছেন না—সমস্যাটা শুধু তার চোখের নয়, তথ্যপ্রবাহের মাধ্যম হিসেবে দৃশ্যনির্ভর ব্যবস্থারও।

এই প্রশ্ন ও বিবেচনাগুলো সাহিত্যের ক্ষেত্রেও একইভাবে প্রযোজ্য। সাহিত্যিক জগৎ যদি ধরে নেয় মানুষ মানেই দেখতে, শুনতে ও দ্রুত চলতে পারার সক্ষমতা, নির্দিষ্ট উচ্চারণে কথা বলার এবং নির্দিষ্ট ছাঁচের শরীরের অধিকারী হওয়া, তাহলে সেই সাহিত্য স্বভাবতই কিছু মানুষকে কেন্দ্রের বাইরে রাখবে।

এখানেই দেহরাজনীতির প্রশ্নটিও আসে। মিশেল ফুকোর ভাষায়, শরীর কখনোই শুধু জৈবিক শরীরমাত্র নয়, ক্ষমতা শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করে, শ্রেণিবদ্ধ করে, পর্যবেক্ষণ করে এবং ‘স্বাভাবিক’ করে তোলে। কোন শরীর সুস্থ, কোন শরীর সুন্দর, কোন শরীর সক্ষম, কোন শরীর কাঙ্ক্ষিত—এসব ধারণা কোনো চিরন্তন সত্য নয়। এগুলো সামাজিকভাবে নির্মিত। সাহিত্যের সৌন্দর্যবোধও সেই নির্মাণের বাইরে নয়।

বাংলা কবিতার দীর্ঘ ঐতিহ্যের দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রেম ও সৌন্দর্যের ভাষায় শরীরের কিছু নির্দিষ্ট আদর্শ বারবার ফিরে আসে। চোখ, মুখ, চুল, ঠোঁট, হাত, পদক্ষেপ—শরীরের যে অংশগুলোকে আমরা সৌন্দর্যের ভাষায় সহজেই রূপক বানাতে পারি; সেগুলোর বিপরীতে এমন বহু শরীর আছে যাদের নিয়ে আমাদের ভাষা অপ্রস্তুত। হুইলচেয়ারে বসা শরীর, কৃত্রিম অঙ্গ ব্যবহার করা শরীর, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শরীর, শ্রবণপ্রতিবন্ধী শরীর, নিউরোডাইভার্জেন্ট শরীর—এসব শরীরকে প্রায়ই আমরা সাহিত্যের নন্দনতত্ত্বে স্বাভাবিকভাবে প্রয়োগ করতে পারি না।

কারণ আমরা শরীরকে শুধু দেখি না, বিচারও করি। এই বিচারিক বোধ আবার নারীবাদী তত্ত্বের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। নারীবাদ বহুদিন ধরে দেখিয়ে আসছে, সামাজিক প্রত্যাশা, পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টি এবং সৌন্দর্যের মানদণ্ড কীভাবে নারীর শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করে। সিমোন দ্য বোভোয়ার থেকে শুরু করে পরবর্তী নারীবাদী চিন্তায় নারী হয়ে ওঠার সামাজিক নির্মাণ নিয়ে যে আলোচনা হয়েছে, তা প্রতিবন্ধী নারীর অভিজ্ঞতা বোঝার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একজন প্রতিবন্ধী নারী একই সঙ্গে নারী এবং প্রতিবন্ধী—দুটি সামাজিক অবস্থানের মধ্য দিয়ে নিজের শরীরকে অনুভব করেন।

এখানেই কিম্বার্লে ক্রেনশর ‘ইন্টারসেকশনালিটি’ ধারণাটি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। যা আমাদের বলছে, একজন মানুষের অভিজ্ঞতাকেও একক কোনো পরিচয়ের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যায় না। লিঙ্গ, শ্রেণি, জাতি, যৌনতা, প্রতিবন্ধিতা—বিভিন্ন সামাজিক অবস্থান পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নিজস্ব অভিজ্ঞতা তৈরি করে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও এই প্রশ্ন জরুরি। কারণ প্রতিবন্ধী নারীর সাহিত্যিক উপস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে শুধু ‘প্রতিবন্ধী নারী’ পরিচয়ই যথেষ্ট নয়। দেখতে হবে তার শ্রেণিগত অবস্থান, পারিবারিক পরিবেশ, শিক্ষার সুযোগ, নগর বা গ্রামীণ জীবন, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং সামাজিক নিরাপত্তার দিকটিও। তার শরীরকে সমাজ যেমন প্রতিবন্ধিতার চোখে দেখে, তেমনি নারীত্বের প্রচলিত মাপকাঠিতেও বিচার করে। এই দ্বৈত দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে তার নিজের দেখাটি কোথায়?

সাহিত্যে প্রতিবন্ধী মানুষের প্রতিনিধিত্বের সবচেয়ে বড় সংকট সম্ভবত এখানেই। যারা তাদের নিয়ে লিখেছেন, তাদের হয়ে চিন্তাভাবনা করার ও কথা বলার অভ্যাসও লেখককেই তৈরি করে নিতে হয়েছে। একজন অ-প্রতিবন্ধী লেখক যখন কোনো প্রতিবন্ধী চরিত্র নির্মাণ করেন, তখন তিনি অবশ্যই সৃজনশীল কল্পনার অধিকার প্রয়োগ করতে পারেন। যেহেতু সাহিত্য শুধু নিজের জীবনের সীমানায় আবদ্ধ থাকায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নয়। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়, সেই কল্পনা চরিত্রের মানবিক জটিলতা কমাতে পারছে, নাকি প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গিরই পুনরুৎপাদন করছে?

প্রতিবন্ধী চরিত্র কি শুধু করুণারই উৎপাদক? অথবা কেবলই সাহস আর অনুপ্রেরণাদায়ী? তার কি প্রেম নেই? কামনা নেই? ঈর্ষা নেই? অহংকার নেই? রাগ নেই? অন্যের প্রতি নিষ্ঠুর হওয়ার সম্ভাবনা নেই? এই প্রশ্নগুলো গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রতিবন্ধী মানুষকে ‘ভালো মানুষ’ বানানোর মধ্যেও এক ধরনের অবিচার থাকতে পারে। অন্যদের মতো একজন প্রতিবন্ধী মানুষও নৈতিকভাবে নিখুঁত হতে বাধ্য নন। কিন্তু সাহিত্যে তাকে প্রায়ই এমন এক নৈতিক উচ্চতায়, অযৌন মধ্যস্থতায় প্রতিস্থাপিত করা হয়, যেখানে তার মানবিক ত্রুটির জায়গা থাকে না। ফলে তিনি চরিত্র না হয়ে প্রতীকে পরিণত হন।

আরেকটি প্রচলিত ফাঁদ হলো ‘inspiration porn’—প্রতিবন্ধী মানুষের জীবনকে অ-প্রতিবন্ধী মানুষের অনুপ্রেরণার উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা। একজন প্রতিবন্ধী মানুষ পড়াশোনা করছেন, চাকরি করছেন, প্রেম করছেন, সন্তান লালন করছেন—এসব দেখে বিস্মিত হওয়ার প্রবণতা একটি অস্বস্তিকর সামাজিক ধারণাকে প্রকাশ করে যে আমরা প্রতিবন্ধী মানুষের কাছ থেকে সাধারণ জীবন আসলে প্রত্যাশা করি না। তিনি যখন স্বাভাবিক জীবনযাপন করেন, তখন সেটাকে আমাদের কাছে অসাধারণ বলে মনে হয়।

এখানে সাহিত্যের একটি বড় দায়িত্ব আছে। প্রতিবন্ধী মানুষের জীবনকে অসাধারণ বা করুণ—এই দুই চরমপন্থার বাইরে এনে দৈনন্দিন করে তোলা। তিনি হয়তো প্রেমে পড়েছেন, কিন্তু গল্পটির লক্ষ্য তার প্রতিবন্ধিতা নয়। হতে পারে তিনি বন্ধুর সঙ্গে ঝগড়া করছেন। নিজের চাকরি নিয়ে অসন্তুষ্ট। কবিতা লিখছেন। প্রেমিককে সন্দেহ করছেন। অথবা অলস দুপুরে জানালার পাশে বসে আছেন। নিজের শরীর নিয়ে কখনো গর্বিত, কখনো অস্বস্তিতে ভুগছেন। এই সাধারণতা আরোপই হতে পারে অসাধারণ রাজনৈতিক কাজ। মনে রাখতে হবে, তাকে ‘স্বাভাবিক’ করে দেখানো মানেই তার প্রতিবন্ধিতাকে অস্বীকার করা নয় বা প্রতিবন্ধী হিসেবে তার বিশেষ কোনো সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্তির অধিকারের বিরুদ্ধাচরণও করা নয়। বরং তার পরিচয়কে একটি মাত্র বৈশিষ্ট্যের মধ্যে আটকে না রাখা।

একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখতে হবে : প্রতিবন্ধী চরিত্রের উপস্থিতি আর প্রতিবন্ধী subjectivity এক জিনিস নয়। প্রথমটি হলো—সাহিত্যে একজন প্রতিবন্ধী মানুষ আছেন। দ্বিতীয়টি হলো—তিনি নিজে পৃথিবীকে কীভাবে অনুভব করেন, তার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি, তার শরীরের অভিজ্ঞতা তার ভাষাকে কীভাবে বদলায়। একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষ পৃথিবীকে ‘কম’ অনুভব করেন—এই ধারণাটি আসলে দৃষ্টিনির্ভর সমাজের ধারণা। কীভাবে স্পর্শ, শব্দ, গন্ধ, স্মৃতি, চলাচল ও ভাষার মধ্য দিয়ে তার পৃথিবীর নিজস্ব অনুভব তৈরি হয়, সেই অভিজ্ঞতাকে সাহিত্য কতটা ধারণ করতে পেরেছে?

একজন শ্রবণপ্রতিবন্ধী মানুষের জন্য নীরবতা কি সত্যিই শুধু ‘শূন্যতা’? নাকি নীরবতারও নিজস্ব শব্দ, স্মৃতি ও অর্থ আছে? একজন হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীর জন্য শহর কি কেবল চলাচলের সমস্যা? নাকি শহরকে অন্যভাবে পড়ারও একটি সুযোগ?

এখানেই ‘ডিসঅ্যাবিলিটি এস্থেটিকস’ বা প্রতিবন্ধিতার নিজস্ব নন্দনতত্ত্বের সম্ভাবনা তৈরি হয়। টবিন সিগালের মতো গবেষকরা দীর্ঘদিন ধরে যে প্রশ্নটি সামনে এনেছেন, তার একটি দিক হলো—প্রতিবন্ধিতাকে শুধু ঘাটতি হিসেবে না দেখে সাংস্কৃতিক ও নান্দনিক অভিজ্ঞতার উৎস হিসেবেও দেখা। অর্থাৎ প্রতিবন্ধী দেহকে ‘অপূর্ণ’ দেহ না ধরে নিয়ে অন্য ধরনের দেহ হিসেবে দেখা। এটা সাহিত্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক সংযোজনী প্রস্তাব। কারণ তখন প্রশ্নটি আর প্রতিবন্ধী মানুষ কীভাবে ‘স্বাভাবিক’ মানুষের মতো হতে পারেন, এই রকম থাকে না। হয়ে উঠতে পারে—আমরা কেন ধরে নিচ্ছি যে ‘স্বাভাবিক’ হওয়ার একটি মাত্র পদ্ধতিই আছে? এই প্রশ্ন আমাদের কবিতার ভাষাকেও বদলে দিতে পারে।

একজন কবি যদি হুইলচেয়ারে বসে পৃথিবীকে দেখেন, তার কাছে ‘দূরত্ব’ শব্দটির মানে কি আমাদের অনুভবের মতো হবে? একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী কবির কাছে ‘আলো’ শুধু দৃশ্যমানতার রূপক? একজন শ্রবণপ্রতিবন্ধী কবির কাছে ‘নীরবতা’ কি আমাদের কবিতার নীরবতার মতো? এই প্রশ্নগুলো শুধু সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করবে না, সাহিত্যের প্রচলিত রূপকভাণ্ডারকেও প্রশ্ন করবে। হয়তো নতুনভাবে বিনির্মাণ করবে। 

সমাজ এখনো প্রতিবন্ধী মানুষকে নির্ভরশীল বা ‘অসহায়’ হিসেবে দেখে। ফলে তার কোনো যৌন আকাঙ্ক্ষাও বাকিদের জন্য অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। সাহিত্য যেহেতু মানুষকে পূর্ণ জটিলতাসহ নিরীক্ষণের একটি সুযোগ, সেখানে প্রতিবন্ধী মানুষের যৌনতা, প্রেম, প্রত্যাখ্যান, আকাঙ্ক্ষা ও শরীরবোধের জায়গাগুলো উন্মোচিত হতে পারে।

সাহিত্যে ‘প্রতিবন্ধী লেখকের’ উপস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তারা নতুন কিছু চরিত্রমাত্র যোগ করবেন না, বৈষম্যময় ভাষার কেন্দ্রটিকেই সরিয়ে দিতে পারেন। তাদের লেখা আমাদের প্রচলিত উপমা, বর্ণনা, গতি, সৌন্দর্য ও স্বাভাবিকতার ধারণাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করতে পারে। তবে তার অর্থ এ-ও নয় যে শুধু প্রতিবন্ধী লেখকরাই প্রতিবন্ধী চরিত্র নিয়ে লিখবেন। তাদের লেখা, অভিজ্ঞতা ও কণ্ঠকে সাহিত্যের প্রান্তিক ‘বিশেষ কণ্ঠ’ হিসেবে না দেখে বাংলা সাহিত্যের মূল স্রোতের অংশ হিসেবে পড়তে হবে।

তবে শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু প্রতিবন্ধী মানুষেরই নয়, সাহিত্যেরও। আমরা কেমন সাহিত্য চাই? এমন সাহিত্য, যেখানে একটি নির্দিষ্ট ধরনের শরীরকে পরিপূর্ণ মানুষ হওয়ার আদর্শ ধরে নেওয়া হবে। নাকি এমন সাহিত্য, যেখানে মানুষের শরীরের বৈচিত্র্য তার অভিজ্ঞতার বৈচিত্র্যের মতোই স্বাভাবিক?

প্রতিবন্ধী মানুষের অনুভূতির অনুপস্থিতি আমাদের অনুভূতির অভিধানেরও একটি সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করে। আমরা যদি তাদের প্রেমের ভাষা না জানি, তাহলে আমাদের প্রেমের ভাষাও অসম্পূর্ণ। আমরা যদি তাদের শরীরকে সৌন্দর্যের ভাষায় দেখতে না পারি, তাহলে আমাদের সৌন্দর্যবোধই সীমিত থাকে। আমরা যদি তাদের আর্তির ভাষা শুনতে না পাই, তাহলে আমাদের মানবিকতার ধারণাই অসম্পূর্ণ।

সাহিত্য নতুন জীবন তৈরি করে না, কিন্তু জীবনকে দেখার নতুন পদ্ধতি তৈরি করতে পারে। তাই প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য সাহিত্যে জায়গা তৈরি করা মানে সাহিত্যে আরও কয়েকটি চরিত্র যোগ করাই নয়। সাহিত্যের জানালাটি একটু বড় করা। এমন কিছু শরীর, অনুভূতি ও অভিজ্ঞতাকে ভাষার ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া, যেগুলো এতদিন দরজার বাইরে অপেক্ষা করেছে।

যে দেহকে সমাজ ‘অসম্পূর্ণ’ বলেছে, সাহিত্য তাকে সম্পূর্ণতার প্রমাণ দিতে বাধ্য না করতে পারে। যে মানুষকে সমাজ করুণার চোখে দেখে অভ্যস্ত, সাহিত্য তাকে আকাঙ্ক্ষার চোখেও দেখাতে শেখাতে পারে। যে কণ্ঠকে এতদিন অন্যরা ব্যাখ্যা করেছে, সে কণ্ঠ নিজের ভাষা নিজেই তৈরি করতে পারে।

তখন হয়তো বাংলা কবিতারও একটি নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে—যেখানে শরীর শুধু সৌন্দর্যের বিষয় নয়, অভিজ্ঞতারও ভাষা। প্রতিবন্ধিতা শুধু সীমাবদ্ধতা নয়, পৃথিবীকে অনুভব করার এক স্বতন্ত্র পদ্ধতি। সাহিত্যের ইতিহাসে এমন অনেক কণ্ঠই পরে এসে জায়গা পেয়েছে। প্রতিবন্ধী মানুষের কণ্ঠও যদি যুক্ত হয়, তাহলে সেটি কোনো বিশেষ অনুগ্রহ হবে না। বরং বাংলা সাহিত্য নিজেরই এক দীর্ঘ অনুপস্থিতির সঙ্গে মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ পাবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত