মা ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে চলছে ২২ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা। নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে উপজেলা মৎস্য বিভাগ নিয়মিত অভিযান পরিচালনাসহ বিভিন্ন কার্যক্রম চালালেও থেমে নেই ইলিশ শিকার। নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেই এক শ্রেণির জেলে শিবালয়ের পদ্মা-যমুনায় মেতেছে মা ইলিশ শিকারে। নদী পাড়ের অস্থায়ী বাজারে প্রকাশ্যে চলছে মা ইলিশ বেচাকেনা। ফলে কর্তৃপক্ষের অভিযান ও নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সচেতন মহলে।
প্রতি বছর অক্টোবর মাসে মা ইলিশ রক্ষায় সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এবারও ইলিশ শিকারে নিষেধাজ্ঞা চলছে ৮ অক্টোবর থেকে। কিন্তু সরকারঘোষিত নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও কিছু অসাধু ও মৌসুমি জেলে নদীতে মা ইলিশ ধরছে। সরেজমিন উপজেলার জাফরগঞ্জের সাতুরিয়া, তেওতা, গান্ধাইল, নিহালপুর, আলোকদিয়া, পারুলিয়া, অন্বয়পুর, ঝড়িয়ারবাগ, দাসকান্দি, নয়াকান্দিসহ পদ্মা-যমুনার বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে একই চিত্র। সরকারি বিধিনিষেধ উপেক্ষা করেই জেলেরা নৌকা নিয়ে জাল ফেলে মা ইলিশ শিকার করে নদীর পাড়ে প্রকাশ্যে বিক্রি করছে।
স্থানীয়রা জানান, অভিযানের সময় নদীতে ইলিশ শিকারের সঙ্গে যুক্তদের একটা অংশ প্রকৃত জেলে বাকিরা মৌসুমি জেলে। সাধারণত সারা বছর মৌসুমি জেলেরা খাল, বিল বা নদীতে অন্য মাছ শিকার করেন। কিন্তু ইলিশের প্রজনন মৌসুমে এরা সকাল থেকেই প্রকাশ্যে জাল ও নৌকা নিয়ে নদীতে দাপিয়ে বেড়ান। ইলিশ ধরে দিনের আলোতেই বিভিন্ন অস্থায়ী বাজারে প্রকাশ্যে বেচাকেনা করেন। নদীতে প্রশাসনের অভিযানের সময় তাদের কার্যক্রম সাময়িক বন্ধ হলেও অভিযান শেষ হলেই শুরু হয় পুনরায় মাছ ধরা।
স্থানীয়দের দাবি, জাফরগঞ্জ-তেওতা এলাকায় নদীতে প্রায় ২০০ নৌকা দিয়ে ইলিশ ধরা হচ্ছে। তারা জানান, চরাঞ্চলের আলোকদিয়া টাওয়ার এলাকায় মাছ ধরার নৌকার সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। সম্প্রতি সাতুরিয়া এলাকায় নদীর পাড়ের বসতবাড়ির ফ্রিজ থেকে প্রশাসন ইলিশ মাছ জব্দ করেছে।
এসব ইলিশ কিনতে মানিকগঞ্জ, পাবনাসহ দূর-দূরান্তে থেকে মানুষ ভিড় জমান। বড় বড় ডিমওয়ালা ইলিশ ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকা, মাঝারি ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা ও ছোটগুলো ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা কেজি দরে বেচাকেনা হয়। সকালের দিকে বেশি মাছ বেচাকেনা হয় ওইসব এলাকায়।
নাম না প্রকাশে অনিচ্ছুক আলোকদিয়া গ্রামের এক বাসিন্দা বলেন, কয়েক দিন ধরে নদীতে মাছ কম ধরা পড়ছে যে কারণে দাম একটু বেশি। তবে এ এলাকায় নিষেধাজ্ঞার সময় কয়েক হাজার জেলে নৌকা দিয়ে ইলিশ মাছ ধরে। দিনে নদীতে প্রশাসনের নজরদারি থাকায় বেশিরভাগ জেলে রাতে নদীতে নামে। আগে এখানে হাট বসলেও এখন নদীর কিনারায় নৌকা থেকে এসব মাছ বেচাকেনা হয়।
উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, গত ৮ অক্টোবর থেকে ২০ অক্টোবর পর্যন্ত ১১ দিনে ৬১টি অভিযান পরিচালিত হয়েছে। এ সময় ১২টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে ৩১ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ- দেওয়া হয়েছে। অভিযানে ৩৭ লাখ ৮৭ হাজার মিটার নিষিদ্ধ জাল পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়েছে এবং ৩৪১ কেজি ইলিশ মাছ উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধারকৃত ইলিশ বিভিন্ন এতিমখানা ও উপস্থিত গরিব-দুঃখীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়।
উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা সাথী রানী নিয়োগী মুঠোফোনে জানানা, অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এই বাইরেও যদি ইলিশ শিকার হয়, আপনারা তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেন। নৌ-পুলিশ, কোস্ট গার্ড ও প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে আমরা অভিযান অব্যাহত রাখার চেষ্টা করব।
পাটুরিয়া নৌ ফাঁড়ির ওসি কেএম নজরুল ইসলাম বলেন, এ পর্যন্ত ছয়টি নিয়মিত মামলায় ১৪ জনকে জেল-হাজতে পাঠানো হয়েছে। নিয়মিত নদীতে অভিযানের পাশাপাশি পরিবহন ও বেচাকেনা বন্ধে জনসচেতনায় অনেক ধরনের বৈঠক করেছি। প্রশাসনের তরফ থেকে বরফ কল বন্ধে বিভিন্ন হাট-বাজারে নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
শিবালয় উপজেলা নির্বাহী অফিসার মনিষা রানী কর্মকার দেশ রূপান্তর বলেন, আমাদের জায়গা থেকে মা ইলিশ রক্ষায় সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।