বার্সেলোনায় রাজত্ব ও বাবার এক মন্ত্রেই বদলে যাওয়া মেসি

স্পেনের ওভিয়েদো শহরের ঐতিহাসিক ‘হোটেল দে লা রিকনকুইস্তা’র সামনে তখন হাজারো ফুটবলপ্রেমীর ভিড়। স্প্যানিশ রাজপরিবারের হাত থেকে ক্রীড়া জগতের অন্যতম সম্মানজনক 'প্রিন্সেস অব আস্তুরিয়াস অ্যাওয়ার্ড ২০২৬' গ্রহণ করতে সেখানে হাজির হয়েছেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা লিওনেল মেসি। ট্রফি, সাফল্য আর খ্যাতির চূড়ান্ত শিখরে বসেও তিনি ভুলে যাননি শেকড়ের কথা। এই বিশেষ ক্ষণে দাঁড়িয়ে ইন্টার মায়ামি তারকা স্মৃতিচারণ করেছেন বার্সেলোনার সেই সোনালী যুগ, কাতালান শহরের আবেগ এবং ক্যারিয়ার গড়ার পেছনে বাবার দেওয়া সেই অমূল্য পাঠের কথা।

বার্সেলোনায় জাভি হার্নান্দেজ, আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা ও কার্লেস পুয়োলদের মতো মহাতারকাদের সঙ্গে ফুটবলবিশ্ব শাসন করেছিলেন মেসি। জিতেছিলেন একের পর এক ঐতিহাসিক ট্রফি। তবে আধুনিক ফুটবলের সমস্ত সমীকরণ পেছনে ফেলে সেই দলের আসল শক্তি লুকিয়ে ছিল মাঠের বাইরের সহজ ভালোবাসায়। 

পেশাদারিত্বের চরম চাপের মধ্যেও অনুশীলনের প্রতিটি মুহূর্তকে আনন্দময় করে তোলাই যে সেই রাজত্বের গোপন চাবিকাঠি ছিল, তা স্বীকার করেছেন তিনি। স্প্যানিশ বার্তা সংস্থা ইএএফই-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সেই সোনালী দিনগুলোর রহস্য উন্মোচন করে মেসি বলেন, ‘আমরা সৌভাগ্যবান ছিলাম যে সবকিছু জিততে পেরেছিলাম এবং যেভাবে জিতেছিলাম সেটাও দারুণ। আমরা খেলা, জয় এবং বড় কিছু অর্জন উপভোগ করেছি; তবে সবকিছুর চেয়ে বেশি আমরা প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা ও ট্রেনিং সেশনগুলো উপভোগ করতাম। আমাদের সময়টা অসাধারণ কেটেছে।’ 

এক মৌসুমেই ছয় শিরোপা জেতা সেই সময়ে বার্সার জাভি, মেসি, ইনিয়েস্তা, পুয়োলরা, সময়টা ২০০৯-১০ মৌসুমের, ছবি: সংগৃহীত

ফুটবলের আঙিনায় অসংখ্য ক্লাব ও ট্রফি থাকলেও মেসির হৃদয়ের বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে কেবল একটি নাম। বার্সেলোনা কেবল তাঁর খেলার মাঠ ছিল না, সেখানে জন্ম নিয়েছেন তাঁর তিন সন্তান, গড়ে উঠেছে জীবনের সেরা স্মৃতিগুলো। প্যারিস ও মায়ামি ঘুরেও যে সেই নাড়ির টান একটুও কমেনি, তা ব্যক্ত করে মেসি বলেন, ‘বার্সেলোনা আমার জীবনের সেরা ক্লাব। শহর ও ক্লাবের প্রতি আমার খুব, খুবই বিশেষ এবং আলাদা একটা ভালোবাসা রয়েছে।’

বাবার এক অমর মন্ত্রে গড়ে ওঠা এক অপরাজেয় যোদ্ধা

বার্সেলোনার সেই রাজকীয় দিনগুলোর সূচনা কিন্তু এক রাতে হয়নি। এর পেছনে ছিল ছোটবেলা থেকে মানসিক দৃঢ়তা তৈরির এক দীর্ঘ গল্প, যার নেপথ্য কারিগর ছিলেন তাঁর প্রয়াত বাবা হোর্হে মেসি। ক্যারিয়ারের প্রতিটি কঠিন মোড়ে বাবার দিকনির্দেশনাই কিশোর মেসিকে বানিয়েছিল অপ্রতিরোধ্য। ব্যর্থতার পর থমকে না গিয়ে নতুন করে শুরুর সেই মানসিকতা তিনি পেয়েছিলেন পরিবার থেকেই। 

বাবার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে মেসি বলেন, ‘বাবা বলতেন, বল ধরে যেন চেষ্টা চালিয়ে যাই, তা ভালো হোক কিংবা খারাপ। কোনো কিছুতেই যেন সন্তুষ্ট হয়ে না পড়ি, কারণ সব সময় আরও একটা সুযোগ সামনে থাকে।’ 

বাবা হোর্হে মেসির সঙ্গে বার্সেলোনার সেই তরুণ মেসি, ছবি: সংগৃহীত

বাবার এই মন্ত্র বুকে নিয়েই ক্যাম্প ন্যু-এর বি দল থেকে মূল দলে জায়গা করে নেওয়ার লড়াই চালান মেসি। আর সেই আত্মবিশ্বাসই তাঁকে পরবর্তীতে পৌঁছে দেয় বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ চূড়ায়।

ফুটবলবিশ্ব যেভাবে মনে রাখবে মেসিকে 

বার্সেলোনায় ক্লাব ফুটবলের সমস্ত শিরোপা জেতার পর ২০২২ সালে কাতারের মাটিতে বিশ্বকাপ উঁচিয়ে ধরে নিজের ক্যারিয়ারকে পূর্ণতা দেন এই জাদুকর। বিশ্বকাপের ফাইনালের গোলগুলোকে নিজের জীবনের সেরা মুহূর্ত হিসেবে আখ্যায়িত করলেও, অর্জনের চেয়ে নিজের লড়াইয়ের মানসিকতাকেই সবার সামনে রেখে যেতে চান তিনি। 

স্পেনের ওভিয়েদো শহরের ঐতিহাসিক ‘হোটেল দে লা রিকনকুইস্তা’র সামনে ভক্তদের সাথে সময় কাটান মেসি, ছবি: সংগৃহীত

খেলার মাঠ থেকে বিদায় নেওয়ার পর ফুটবলবিশ্ব তাঁকে ঠিক কীভাবে মনে রাখবে, সেই দর্শনটাও নিজেই তুলে ধরেছেন ৮ বারের ব্যালন ডি'অর বিজয়ী। নিজের লেগাসি বা উত্তরাধিকার নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মেসি বলেন, ‘আমি এমন একজন ক্রীড়াবিদ হিসেবে স্মরণীয় হতে চাই যিনি সবসময় নিজের লক্ষ্য ও স্বপ্নের জন্য লড়াই করেছেন। কখনও সফল হয়েছি, কখনও ব্যর্থ, কিন্তু সামনে যা এসেছে তার সবই জেতার চেষ্টা করা কখনোই থামাইনি।’ 

স্পেনের ঐতিহ্যবাহী রাজকীয় মঞ্চে দাঁড়িয়ে রাফায়েল নাদাল, মাইকেল শুমাখার ও সেরেনা উইলিয়ামসের মতো কিংবদন্তিদের সারিতে নিজের নাম তুলে নেওয়াকে জীবনের বড় এক রোমাঞ্চ বলে উল্লেখ করেন মেসি। শত সাফল্য সত্ত্বেও এই বিনয় ও লড়াইয়ের মানসিকতাই মেসিকে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা নায়ক হিসেবে অমর করে রাখবে।