দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনে বিদ্যুৎ সরবরাহের নামে চলছে নৈরাজ্য। সৌর প্যানেল থেকে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সরবরাহ করা বিদ্যুৎ এমনিতেই মূল ভূখ-ের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি দামে কিনতে হয় দ্বীপবাসীর। এরই মধ্যে একলাফে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম আরও ১০ টাকা বাড়িয়ে ৬৬ টাকা করার ঘোষণা দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এতে পুরো দ্বীপে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাবাসী দ্বীপে অবিলম্বে সরকারি বিদ্যুৎ সরবরাহের দাবিতে সোচ্চার হয়ে উঠেছেন।
এরই মধ্যে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদ ও কয়েকটি দাবিতে গত বুধবার বিকেলে দ্বীপের বাজারে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের দাবিগুলো হচ্ছে সেন্টমার্টিন দ্বীপে সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ সংযোগ চালু করার দ্রুত রোডম্যাপ বাস্তবায়ন করতে হবে। বেসরকারি কোম্পানির চাপিয়ে দেওয়া এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি অবিলম্বে বাতিল করতে হবে এবং জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় কমাতে এবং দ্বীপবাসীর মৌলিক নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে সরকারকে কার্যকর তদারকি করতে হবে।
ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতার সুযোগে নৈরাজ্য, দিশেহারা ১০ হাজার বাসিন্দা : কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলা থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার দক্ষিণে সাগরের বুকে অবস্থিত পর্যটনকেন্দ্র সেন্টমার্টিন ইউনিয়নে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন প্রায় ১০ হাজার মানুষ। মূল ভূখ-ের জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সংযোগ না থাকা দ্বীপটির বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা সৌরবিদ্যুৎ কিংবা নিজস্ব জেনারেটরের ওপর নির্ভরশীল। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ব্লু-মেরিন এনার্জি লিমিটেড দ্বীপে ২০১৯ সাল থেকে সৌর প্যানেল থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কোনো ধরনের গণশুনানি বা নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানটি চলতি মাস থেকে একতরফাভাবে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১০ টাকা বাড়িয়ে ৬৬ টাকা নির্ধারণের ঘোষণা দিয়েছে। এতে করে খেটে খাওয়া মানুষের পাশাপাশি দ্বীপের শত শত হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট মালিকরা চরম বিপাকে পড়েছেন। দ্বীপবাসীর অভিযোগ, এত দাম দেওয়ার পরও সারা দিনে তারা বিদ্যুৎ পাচ্ছেন মাত্র চার ঘণ্টার মতো।
সেন্টমার্টিনের স্থায়ী বাসিন্দা ও মৎস্যজীবী নুর মোহাম্মদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা সাগরে মাছ ধরে কিংবা ছোটখাটো ব্যবসা করে কোনোমতে সংসার চালাই। দেশের বাকি এলাকার মানুষ যেখানে সস্তায় বিদ্যুৎ পাচ্ছে, সেখানে আমাদের ওপর কেন এই জুলুম? প্রতি ইউনিটে ৬৬ টাকা বিল দেওয়া আমাদের পক্ষে অসম্ভব। এখন সন্তানদের রাতে মোমবাতি জ্বালিয়ে পড়াতে হবে, ডিজিটাল সব সেবা থেকে আমাদের বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে হবে।’
দ্বীপের রিসোর্ট ব্যবসায়ী ও পর্যটন উদ্যোক্তা আবদুর রহমান বলেন, ‘সেন্টমার্টিনে ব্যবসা করা এমনিতেই ব্যয়বহুল। টেকনাফ থেকে প্রতিটি মালামাল বাড়তি খরচে নৌপথে আনতে হয়। এর ওপর যদি বিদ্যুতের দাম এত বাড়ানো হয়, তবে আমাদের হোটেলের রুম ভাড়া ও রেস্তোরাঁগুলোর খাবারের দাম অনেক বাড়িয়ে দিতে হবে। এতে পর্যটকরা সেন্টমার্টিন বিমুখ হবেন এবং দেশের সামগ্রিক পর্যটন শিল্প বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়বে।’
ব্লু-মেরিন এনার্জির দাবি উৎপাদন ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ বেড়েছে : ব্লু-মেরিন এনার্জি লিমিটেডের স্থানীয় ইনচার্জ ইঞ্জিনিয়ার রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বিদ্যুৎ বিল বা ট্যারিফ বাড়ানোর সিদ্ধান্তটি মূলত কোম্পানির মালিক পক্ষের। দ্বীপ অঞ্চলে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ও অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণের খরচ অনেক বেশি। উৎপাদন সক্ষমতা বজায় রাখতে এবং নিরবচ্ছিন্ন সেবা নিশ্চিত করতেই এই সমন্বয় করার কথা বলা হচ্ছে।’
এ বিষয়ে সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বলেন, ‘বিদ্যুতের এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই দ্বীপবাসীর পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। সেন্টমার্টিন শুধু একটা পর্যটনকেন্দ্র নয়, এটি হাজার হাজার মানুষের স্থায়ী বসতভিটা। দ্বীপবাসীর মৌলিক নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। আমরা সরকারের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি, অবিলম্বে সেন্টমার্টিনে সরকারি ব্যবস্থাপনায় বিদ্যুৎ সরবরাহের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হোক।’
এ বিষয়ে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এসএম অনীক চৌধুরী বলেন, ‘সেন্টমার্টিনের পরিবেশগত সংবেদনশীলতা ও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সেখানে সাগরের তলদেশ দিয়ে সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে প্রথাগত জাতীয় গ্রিড পৌঁছানো অত্যন্ত জটিল ও পরিবেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তবে সরকার সেন্টমার্টিনের জন্য পরিবেশবান্ধব ও টেকসই বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিকল্প কিছু পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। বর্তমান সংকট নিরসনে বেসরকারি কোম্পানির সঙ্গে কথা বলে দ্রুত একটি সহনীয় সুরাহা করার চেষ্টা চলছে।’
দ্বীপবাসীর স্পষ্ট বার্তা, তারা কোনো বিশেষ অনুকম্পা বা অনুদান চান না, দেশের নাগরিক হিসেবে তারা তাদের ন্যায্য অধিকার চান। প্রবাল দ্বীপের জনজীবন সচল রাখতে এবং দেশের অন্যতম প্রধান এই অর্থনৈতিক পর্যটন খাতকে বাঁচাতে দ্রুত বিদ্যুৎ সংকটের স্থায়ী সমাধানের দাবি তাদের।