ধ্বংসের মুখে পানাম নগরী

আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৫০ এএম

প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের অভাবে সোনারগাঁওয়ের ঐতিহাসিক পানাম নগরী এখন ধ্বংসের মুখে। এ নগরীর কয়েকশ বছরের পুরনো ঐতিহাসিক ভবনগুলোর ইট সুরকি ও মূল্যবান নকশা খসে পড়ছে। যথাযথভাবে সংরক্ষণ না করা হলে যেকোনো  সাধারণমাত্রার ভূমিকম্পে এই প্রত্নসম্পদ সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের। 

জানা যায়, ২০০১ সালে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর পানাম নগরীর আংশিক অবৈধ দখলমুক্ত করে প্রথমবারের মতো সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। তবে সে সময় সংস্কারের নামে ৯টি ভবনের মূল সৌন্দর্য বিকৃত করার অভিযোগ ওঠে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের বিরুদ্ধে। যেনতেনভাবে চুন সুরকির প্রলেপ দেওয়া হয় ভবনগুলোয়। ফলে এ সংস্কার কাজ বন্ধ করার জন্য প্রতিবাদ জানান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞদল ও স্থানীয় সুশীল সমাজ। তীব্র প্রতিবাদের মুখে বন্ধ হয় ওই কাজ। এরপর ২০০৩ সালে স্থানীয় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের আন্দোলনের মুখে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর পানাম নগরীকে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে ঘোষণা করে। তবে, পানাম নগরী প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতায় এলেও এটি সংরক্ষণের বিষয়ে কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। ওয়ার্ল্ড মনুমেন্ট ফান্ড ২০০৬ সালে পানাম নগরীকে বিশ্বের ধ্বংসপ্রায় ১০০টি ঐতিহাসিক স্থাপনার তালিকায় স্থান দেয়।

বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ১৬১০ সালের আগপর্যন্ত সোনারগাঁও ছিল বাংলার অন্যতম রাজধানী। এরপর থেকে ধীরে ধীরে পানাম নগরী গড়ে উঠতে শুরু করে। মূলত উনিশ শতকের গোড়ার দিকে ধনাঢ্য হিন্দু জমিদারদের মাধ্যমে পানাম নগরীর গোড়াপত্তন হয়। এ নগরীটি পূর্ব-দক্ষিণে ৬০০ মিটার দীর্ঘ ও ৫ মিটার প্রশস্ত। ভবনগুলো এক তলা থেকে তিন তলাবিশিষ্ট। প্রতিটি ভবনেই ইউরোপীয় রেনেসাঁ ও ভিক্টোরীয় স্থাপত্যরীতির সঙ্গে মোগল স্থাপত্যরীতির মিশ্রণ দেখা যায়। এ ছাড়া কিছু ভবনে আংশিক বাংলার গৌড়ীয় স্থাপত্যরীতিও দেখা যায়।

পানাম নগরী ঘুরে দেখা গেছে, ভবনগুলোর দেয়ালের বেশির ভাগ নকশাই খসে পড়েছে। অনেক ভবনের ছাদ ও দেয়ালের অংশ ধসে গেছে। ভবনগুলোর ভেতরে দর্শনার্থীদের প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। দর্শনার্থীরা ভবনে প্রবেশ করতে না পেরে নগরীর মূল সৌন্দর্য অবলোকন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। নগরীতে টিকে থাকা ৫২টি ভবনের মধ্যে ১০টিকে সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে কর্তৃপক্ষ সাইনবোর্ড সাঁটিয়ে দিয়েছে।

নগরীর চারপাশ ঘিরে যে খাল রয়েছে সেগুলোতে স্থানীয় বাজারের লোকজন ও এলাকাবাসী ময়লা আবর্জনা ফেলে নর্দমায় পরিণত করেছে। তা থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। নগরীর উত্তর পাশের খালটি কচুরিপানায় ভরে গেছে। ফলে নগরীর প্রকৃত সৌন্দর্য উপভোগ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন দর্শকরা। অপর দিকে নগরীর নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে লোকবল প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। ফলে ছুটির দিনগুলোয় দর্শনার্থীও ভিড় সামলাতে সংশ্লিষ্টদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।

জানা গেছে, পানাম নগরী সংস্কারের প্রধান অন্তরায় বাজেট সংকট। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মোট বাজেট ৮৩ কোটি ২১ লাখ টাকা। এখানে উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে মাত্র ১৩ কোটি ১৮ লাখ টাকা আর বাকি ৭০ কোটি ৩ লাখ টাকা হচ্ছে পরিচালন ব্যয়। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতাধীন মোট প্রত্নস্থল রয়েছে ৫৫০টি। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ স্বল্প উন্নয়ন বাজেট দিয়ে কোনোভাবেই প্রত্ন নিদর্শনের সংস্কার ও উন্নয়ন সম্ভব নয়। এ অবস্থায় ঐতিহাসিক পানাম নগরী রক্ষা করতে হলে বিশেষ প্রকল্প হাতে নিতে হবে।

পানাম নগরীর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সহকারী কাস্টোডিয়ান তানজিলুর রহমান জানান, ‘প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের বাজেট প্রয়োজনের তুলনায় অনেকটাই কম। সে জন্য চাইলেই সংস্কার কাজ করা যায় না। তবে পাইলট প্রকল্পের আওতায় দুয়েকটি ভবন সংস্কার করা হয়েছে। আগামীতেও এটি চলমান থাকবে।’

সোনারগাঁওয়ের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণ কমিটির আহ্বায়ক শাহেদ কায়েস বলেন, ‘প্রয়োজনীয় সংস্কারের অভাবে ইতিমধ্যে এ নগরীর ২০টি ভবন সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বাকিগুলোও রয়েছে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে। স্বল্পমাত্রার ভূমিকম্পই এ নগরী ধ্বংসের জন্য যথেষ্ট। পানাম নগরীর আদি সৌন্দর্য ঠিক রেখে অচিরেই এটি সংস্কার ও সংরক্ষণ করা জরুরি।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত