ক্যানসার ভ্যাকসিনের পরীক্ষায় বড় সাফল্য

বিশ্বের প্রথম ব্যক্তিনির্ভর ক্যানসার টিকার তৃতীয় ধাপের ক্লিনিক্যাল পরীক্ষায় বড় সাফল্যের খবর দিয়েছে ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান মডার্না। প্রতিষ্ঠানটির তৈরি এমআরএনএ প্রযুক্তির এই টিকা ব্যবহারে মেলানোমা বা এক ধরনের ত্বকের ক্যানসার ফিরে আসা কিংবা রোগীর মৃত্যুর ঝুঁকি ৪২ শতাংশ কমেছে। গবেষণার এ ফলাফলকে ক্যানসার চিকিৎসায় যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। ‘দ্য অস্ট্রেলিয়ান’ এর বরাত দিয়ে নিউজ ডটকম ডটএইউ এই তথ্য জানিয়েছে। 

২৩ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্যে জানা যায়, মডার্নার এই টিকার আনুষ্ঠানিক পরীক্ষার ফল ইউরোপিয়ান সোসাইটি ফর মেডিক্যাল অনকোলজির বার্ষিক সম্মেলনে উপস্থাপনের কথা রয়েছে।

টিকাটির নাম ইনটিসমেরান (ইনটিসমেরান)। এটি রোগীর নিজস্ব টিউমারের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে বিশেষভাবে তৈরি করা হয়। পেমব্রোলিজুমাব নামের একটি ইমিউনোথেরাপি ওষুধের সঙ্গে টিকাটি প্রয়োগ করে গবেষণায় উল্লেখযোগ্য ফল পাওয়া গেছে।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, চিকিৎসার দুই বছর পর টিকা ও ইমিউনোথেরাপি গ্রহণকারী রোগীদের ৮২ শতাংশের ক্ষেত্রে ক্যানসার ফিরে আসেনি। একই সময়ে শরীরের দূরবর্তী অঙ্গে ক্যানসার ছড়িয়ে পড়া ছাড়াই বেঁচে থাকার হার ছিল ৮৮ দশমিক ৫ শতাংশ। সামগ্রিকভাবে ক্যানসার পুনরাবৃত্তি কিংবা মৃত্যুর ঝুঁকি কমেছে ৪২ শতাংশ।

গবেষণাটির প্রধান অনুসন্ধানকারী ও অস্ট্রেলিয়ার মেলানোমা ইনস্টিটিউটের মেডিক্যাল ডিরেক্টর অধ্যাপক জর্জিনা লং এ ফলাফলকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘ভিত্তিগত পরিবর্তন’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

তিনি বলেন, এটি যেন প্রথম উড়োজাহাজের উড্ডয়ন। এর প্রভাব শুধু মেলানোমার রোগীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; সম্ভাব্যভাবে অন্যান্য ক্যানসারের চিকিৎসাতেও তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

অধ্যাপক লংয়ের মতে, এমআরএনএ প্রযুক্তি, ব্যক্তিভিত্তিক চিকিৎসা এবং অ্যালগরিদম ও তথ্য বিশ্লেষণের সমন্বয় ক্যানসার চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তিনি এই পরিবর্তনকে যোগাযোগব্যবস্থায় ই-মেইলের আবির্ভাবের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

যেভাবে কাজ করে টিকাটি: ইনটিসমেরান টিকা রোগীর টিউমারের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়। ক্যানসার কোষের পৃষ্ঠে থাকা অস্বাভাবিক প্রোটিন শনাক্ত করে সেগুলোর তথ্য এমআরএনএ প্রযুক্তির মাধ্যমে শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার কাছে উপস্থাপন করা হয়। এর ফলে রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা নির্দিষ্ট ক্যানসার কোষ শনাক্ত করে সেগুলোর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে টিউমার অপসারণের পরও যেসব রোগীর ক্যানসার ফিরে আসার ঝুঁকি বেশি থাকে, তাঁদের ক্ষেত্রে এ ধরনের চিকিৎসা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

গবেষণাটিতে বিশ্বের ১৫০টির বেশি কেন্দ্রে ১ হাজার ১৩৭ জন রোগী অংশ নেন। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে মেলানোমা অপসারণের পরও যাঁদের ক্যানসার ফিরে আসার ঝুঁকি অনেক বেশি ছিল, তাঁদের ওপর টিকাটির কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়। অস্ট্রেলিয়ার কয়েকটি কেন্দ্রও এ গবেষণায় অংশ নেয়।

এর আগে গত আগস্টে মডার্না জানিয়েছিল, পরীক্ষার ফলাফল ইতিবাচক হয়েছে। ওই ঘোষণার পর প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল।

অধ্যাপক জর্জিনা লং মেলানোমা গবেষণা ও ইমিউনোথেরাপিতে অবদানের জন্য ২০২৪ সালে অধ্যাপক রিচার্ড স্কোলিয়ারের সঙ্গে যৌথভাবে অস্ট্রেলিয়ান অব দ্য ইয়ার নির্বাচিত হন।

তবে টিকাটি সাধারণ রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহারের আগে গবেষণার পূর্ণাঙ্গ ফলাফল পর্যালোচনা এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন প্রয়োজন হবে।