গাজীপুরের যানজট নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনার দাবি

গাজীপুরের যানজট নিরসন, পরিবেশ সুরক্ষা ও পরিকল্পিত নগরায়ণ নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন সংসদ সদস্যসহ বিশিষ্টজনেরা। তাঁরা বিআরটি প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বচ্ছ মূল্যায়ন, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও মেট্রোরেল গাজীপুর পর্যন্ত সম্প্রসারণ এবং সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

শনিবার (২৪ অক্টোবর) সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবে ঢাকাস্থ গাজীপুর সাংবাদিক ফোরাম আয়োজিত ‘দৃশ্যমান সমস্যা অবারিত সম্ভাবনার গাজীপুর’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন।

ফোরামের সভাপতি ফয়সাল আলমের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক রাশেদুল হকের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন গাজীপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য এ কে এম ফজলুল হক মিলন, গাজীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য এস এম রফিকুল ইসলাম বাচ্চু, গাজীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. মজিবুর রহমান, গাজীপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য সালাহ উদ্দিন আইয়ুবী, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সেলিনা সুলতানা নিশিতা, জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া এবং গাজীপুর মহানগর পুলিশের (জিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ তাহেরুল হক চৌহানসহ অন্যরা।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ফোরামের সাংগঠনিক সম্পাদক ফয়সাল খান। এতে গাজীপুরের যানজট, পরিবেশদূষণ, অপরিকল্পিত শিল্পায়ন, মাদক, কিশোর গ্যাং, ছিনতাই, জলাবদ্ধতা, বনভূমি দখল ও কৃষিজমি ভরাটসহ বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরা হয়।

প্রবন্ধে বলা হয়, শিল্পবর্জ্য ও অপরিকল্পিত কলকারখানার কারণে গাজীপুরের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পরিবেশ রক্ষায় শিল্পকারখানার কার্যক্রমে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা জরুরি। এ ছাড়া সড়কে বর্জ্য ফেলা বন্ধ, রেলস্টেশনের কার্যকারিতা বৃদ্ধি এবং শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের আবাসন ও নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

বিআরটি প্রকল্পের বিভিন্ন স্থাপনায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড এবং সামান্য বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতার বিষয়টিও প্রবন্ধে উঠে আসে। শ্রীপুরের সাতখামাইর ও ইজ্জতপুর রেলস্টেশন কার্যকর করা এবং সেখানে প্রয়োজনীয় ট্রেনের যাত্রাবিরতি নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়। পাশাপাশি কালিয়াকৈরে বনভূমি দখল এবং কালীগঞ্জে আবাসন প্রকল্পের নামে কৃষিজমি, খাল-বিল ও জলাভূমি ভরাটের বিষয়ে উদ্বেগ জানানো হয়।

মূল প্রবন্ধে বিআরটি প্রকল্প বাতিল ও নির্মিত অবকাঠামো ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানানো হয়। প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে স্বচ্ছ মূল্যায়নের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুপারিশ করেন বক্তারা। তাঁদের মতে, গাজীপুরবাসীর দীর্ঘ ১৪ বছরের দুর্ভোগ এবং ১৮ জেলার মানুষের যাতায়াতের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত, সাশ্রয়ী ও কার্যকর পরিবহনব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে বিআরটি চালুর সম্ভাবনাও বিবেচনা করার কথা বলা হয়।

প্রকল্প বাতিলের কারণ ও সিদ্ধান্তের পেছনের যুক্তি জনসমক্ষে প্রকাশের পাশাপাশি অনিয়ম, দুর্নীতি বা পরিকল্পনাগত ত্রুটি থাকলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের চিহ্নিত করার সুপারিশ করা হয়। একই সঙ্গে ঢাকা থেকে গাজীপুর পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও মেট্রোরেল সম্প্রসারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়।

গাজীপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য এ কে এম ফজলুল হক মিলন বলেন, বাংলাদেশের এমন কোনো অঞ্চল নেই, যেখানকার মানুষ গাজীপুরে বসবাস করেন না। জনবহুল এই জেলার উন্নয়নে জনসংখ্যা বিবেচনায় নিয়ে মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করা প্রয়োজন।

বিআরটি প্রকল্পের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিআরটি ব্যবস্থা থাকলেও গাজীপুরের মতো জনবহুল এলাকার জন্য পরিকল্পনা প্রণয়নের সময় স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। পুলিশ শুরু থেকেই সক্রিয় ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করলে মাদকের আগ্রাসন কমানো সম্ভব বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

গাজীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য এস এম রফিকুল ইসলাম বাচ্চু বলেন, গাজীপুরের বর্তমান অবস্থা খুবই বিপন্ন। পরিবেশ সুরক্ষা নিশ্চিত না করেই এখানে শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ এই জেলায় বসবাস করেন। তাই আগামী ১০০ বছরের কথা বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা করতে হবে। তা না হলে একসময় গাজীপুর বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়তে পারে।

গাজীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. মজিবুর রহমান বলেন, যানজট নিরসনের লক্ষ্যেই বিআরটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এতে সমস্যার সমাধান হয়েছে কি না, তা পর্যালোচনা করা দরকার। উত্তরা থেকে ফ্লাইওভারের মাধ্যমে কালীগঞ্জ, ময়মনসিংহ ও জয়দেবপুরমুখী সংযোগ তৈরি করা হলে যান চলাচলে সুবিধা হতো বলে তিনি মনে করেন। সড়কের মাঝখানে ডিভাইডার নির্মাণের কারণে চলাচলের জায়গা সংকুচিত হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির ক্যামেরা ব্যবহারের দাবি জানান মো. মজিবুর রহমান। পাশাপাশি মাদক প্রতিরোধে পুলিশ ও প্রশাসনের পাশাপাশি অভিভাবকদেরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

গাজীপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য সালাহ উদ্দিন আইয়ুবী বলেন, বিআরটি প্রকল্পের পরিবর্তে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন। তিনি গাজীপুরের জয়দেবপুরে একটি পার্ক নির্মাণ, বাসভাড়া কমানো এবং এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে গাজীপুর পর্যন্ত সম্প্রসারণের দাবি জানান। মাদক নির্মূলে পুলিশের সংস্কার জরুরি উল্লেখ করে তিনি আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে কাপাসিয়া পৌরসভা গঠনের প্রস্তাবও দেন।

বৈঠকে আরও বক্তব্য দেন ফোরামের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি আতাউর রহমান, দপ্তর সম্পাদক এস এম নূর মোহাম্মদ, যোগাযোগবিষয়ক সম্পাদক সাব্বির আহমেদ, জ্যেষ্ঠ সদস্য মঞ্জুর বারী ও কার্যনির্বাহী সদস্য সাইফুল ইসলাম শুভ প্রমুখ।