অতীতের ভুল নিয়ে অনুশোচনা

অতীতের গুরুত্ব অনেক। অতীতের অভিজ্ঞতা মানুষকে শিক্ষা দেয়, নিজের দুর্বলতা বুঝতে সাহায্য করে এবং ভবিষ্যতের পথ চলতে সতর্ক করে। তবে অতীতের ভুল নিয়ে অতিরিক্ত হতাশা মানুষকে কর্মবিমুখ করে দিতে পারে। নিজের ভুলের জন্য অনুশোচনা করা ভালো, কিন্তু সেই অনুশোচনা যেন আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়ার কারণ না হয়। বরং অনুশোচনাকে আত্মশুদ্ধি ও পরিবর্তনের উপলক্ষ হিসেবে গ্রহণ করাই ইসলামের শিক্ষা।

ভুল স্বীকার সংশোধনের প্রথম ধাপ : মানুষের একটি স্বাভাবিক প্রবণতা হলো নিজের ভুল আড়াল করা। অনেক সময় নিজের সম্মান রক্ষার জন্য মানুষ ভুলের পক্ষে যুক্তি দাঁড় করায়। কেউ অন্যের প্রতি অন্যায় করেও নিজের আচরণকে সঠিক প্রমাণ করতে চায়। আবার কেউ ভুল বুঝতে পারলেও তা স্বীকার করতে লজ্জা পায়। অথচ ভুল স্বীকার করার মধ্যেই সংশোধনের প্রথম ধাপ নিহিত রয়েছে।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর যারা কোনো অশ্লীল কাজ করে ফেললে অথবা নিজেদের প্রতি জুলুম করলে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজেদের পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। আল্লাহ ছাড়া আর কে পাপ ক্ষমা করবেন? আর তারা জেনে-শুনে নিজেদের কৃতকর্মের ওপর অবিচল থাকে না।’ (সুরা আলে ইমরান ১৩৫)

এই আয়াতে মুমিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হয়েছে। ভুল হয়ে গেলে সে নিজের অন্যায়ের ওপর অটল থাকে না। বরং আল্লাহকে স্মরণ করে, নিজের অপরাধ উপলব্ধি করে এবং ক্ষমা প্রার্থনা করে। অর্থাৎ ভুল করে ফেলা একজন মানুষের জন্য শেষ কথা নয়। ভুলের পর তার আচরণ কেমন হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

অনুশোচনায় তওবার পথে খুলে : অনুশোচনা কেবল দুঃখবোধের নাম নয়। এটি মানুষকে পাপ থেকে ফিরে আসতে এবং আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করতে সাহায্য করে। কেউ অতীতে অন্যায় করে থাকলে তার উচিত আন্তরিকভাবে তওবা করা, পাপের কাজ পরিত্যাগ করা এবং ভবিষ্যতে সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি না করার সংকল্প করা।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে আমার বান্দারা! যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দেন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা জুমার ৫৩)

এই আয়াত মানুষকে আশার বার্তা দেয়। জীবনে যত বড় ভুলই হয়ে থাকুক, তওবার দরজা খোলা রয়েছে। তাই অতীতের পাপ স্মরণ করে হতাশ হয়ে পড়া কিংবা নিজেকে ক্ষমার অযোগ্য মনে করা উচিত নয়। বরং আল্লাহর ক্ষমার প্রতি আশা রেখে নিজের জীবন সংশোধনের চেষ্টা করতে হবে।

উদাহরণ হিসেবে এমন একজন ব্যক্তির কথা বলা যায়, যিনি দীর্ঘদিন নামাজে অবহেলা করেছেন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিজের ভুল বুঝতে পারলেন। এখন অতীতের অবহেলার কথা ভেবে হতাশ না হয়ে তার উচিত নিয়মিত নামাজ আদায় করা, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া, ভবিষ্যতে নামাজের প্রতি যতœবান থাকা এবং পূর্বের কাজা হওয়া নামাজগুলো আদায় করা। অতীতের ভুল তাকে যেন বর্তমানের ভালো কাজ থেকে বিরত রাখতে না পারে।

আন্তরিক অনুশোচনা, পাপ পরিত্যাগ এবং সংশোধনের দৃঢ় সংকল্প তওবার গুরুত্বপূর্ণ দিক। কারও অধিকার নষ্ট করে থাকলে সেই অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া বা যথাযথভাবে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার চেষ্টাও করতে হবে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের ওপর কোনো জুলুম করেছে, সে যেন আজই তার কাছ থেকে ক্ষমা নিয়ে নেয়।’ (সহিহ বুখারি)

এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, অন্যের প্রতি অন্যায় করে থাকলে তা অবহেলা করা উচিত নয়। বরং যথাসম্ভব দ্রুত সংশোধনের উদ্যোগ নিতে হবে।

ধরা যাক, একজন ব্যবসায়ী অতীতে একজন ক্রেতার কাছ থেকে পণ্যের প্রকৃত মূল্য গোপন করে অতিরিক্ত টাকা নিয়েছেন। পরে তিনি নিজের অন্যায় বুঝতে পারলেন। এখন তার দায়িত্ব শুধু আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ায় সীমাবদ্ধ নয়। সম্ভব হলে ক্রেতাকে খুঁজে বের করে তার পাওনা ফিরিয়ে দিতে হবে। অন্যথায় ওই ক্রেতাকে সওয়াব পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে দান-সদকা করতে হবে। এভাবে তিনি নিজের ভুলের প্রতিকার করার চেষ্টা করবেন।

অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা : একই ভুল বারবার করা মানুষের দুর্বলতার পরিচয়। তাই অতীতের ভুল স্মরণ করার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত নিজের দুর্বলতা চিহ্নিত করা এবং ভবিষ্যতে তা এড়িয়ে চলার ব্যবস্থা নেওয়া। যে ভুলের কারণে মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেই ভুলের কারণ খুঁজে বের করা প্রয়োজন।

কেউ যদি রাগের মাথায় বারবার পরিবারের সদস্যদের কষ্ট দেন, তাহলে তাকে রাগ নিয়ন্ত্রণের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। কথা বলার আগে কিছুক্ষণ থেমে যাওয়া, উত্তেজিত অবস্থায় তর্ক এড়িয়ে চলা এবং অন্যের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনার অভ্যাস তাকে সাহায্য করতে পারে। একইভাবে কেউ যদি অসতর্কতার কারণে সময় নষ্ট করেন, তাহলে দৈনন্দিন কাজের পরিকল্পনা তৈরি করতে পারেন। আর কেউ যদি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে ভুল করে থাকেন, তাহলে অভিজ্ঞ ব্যক্তির পরামর্শ নেওয়া এবং আয়-ব্যয়ের হিসাব রাখা প্রয়োজন।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। প্রত্যেক ব্যক্তির উচিত চিন্তা করে দেখা, সে আগামীকালের জন্য কী পাঠিয়েছে।’ (সুরা হাশর ১৮)

এই আয়াত মানুষকে নিজের কাজ পর্যালোচনা করার শিক্ষা দেয়। একজন মুমিনের উচিত প্রতিদিন নিজের আচরণ, দায়িত্ব ও কাজের হিসাব নেওয়া। কোথায় ভুল হয়েছে, কারও প্রতি অন্যায় হয়েছে কিনা এবং আগামী দিনে কীভাবে আরও ভালো হওয়া যায়, তা নিয়ে চিন্তা করা প্রয়োজন।

ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি : অতীতকে পরিবর্তন করার ক্ষমতা মানুষের নেই। কিন্তু অতীতের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বর্তমানকে সুন্দর করা এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব। তাই অনুশোচনায় ডুবে থেকে বর্তমানের দায়িত্ব অবহেলা করা উচিত নয়।

কেউ হয়তো জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কেউ ভালো একটি সুযোগ হারিয়েছেন, কেউ প্রিয়জনের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করেছেন, আবার কেউ নিজের দায়িত্ব পালনে অবহেলা করেছেন। এসব স্মৃতি তাকে কষ্ট দিতে পারে। কিন্তু প্রতিটি ভুলের পর জীবনের সব সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায় না। পরিস্থিতি অনুযায়ী নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়া, সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা করা এবং দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমে সামনে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।

ইসলাম মানুষকে তার সামর্থ্য অনুযায়ী সৎকর্মে মনোযোগী হতে উৎসাহিত করে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই সৎকর্ম অসৎকর্মকে মিটিয়ে দেয়।’ (সুরা হুদ ১১৪)

এই আয়াতের শিক্ষা হলো, ভুলের পর ভালো কাজের দিকে ফিরে আসতে হবে। কেউ অতীতে মানুষের সঙ্গে খারাপ আচরণ করে থাকলে এখন মানুষের উপকার করতে পারেন। কেউ সময় নষ্ট করে থাকলে এখন সময়ের সদ্ব্যবহার করতে পারেন। কেউ ইবাদতে অবহেলা করে থাকলে এখন ইবাদতে মনোযোগী হতে পারেন। তবে ভালো কাজ করার অর্থ মানুষের অধিকার নষ্ট করার দায় এড়িয়ে যাওয়া নয়। বরং তওবা, অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া এবং সৎকর্মের মাধ্যমে জীবনকে সংশোধন করতে হবে।

নিজেকে ঘৃণা নয়, সংশোধন করুন : অনেক মানুষ অতীতের ভুলের কথা মনে করে নিজেকে অত্যন্ত তুচ্ছ মনে করেন। তারা ভাবেন, তাদের দ্বারা আর ভালো কিছু সম্ভব নয়। এই ধারণা মানুষকে হতাশ করে এবং পরিবর্তনের আগ্রহ কমিয়ে দেয়। অথচ নিজের ভুলকে ঘৃণা করা আর নিজেকে ঘৃণা করা এক বিষয় নয়। ভুলকে প্রত্যাখ্যান করে নিজেকে সংশোধন করতে হবে।

মানুষের জীবনে পরিবর্তনের সুযোগ থাকা জরুরি। নিজের ভুল উপলব্ধি করে যে ব্যক্তি সংশোধনের চেষ্টা করেন, তিনি অতীতের তুলনায় উন্নত মানুষ হয়ে ওঠার সুযোগ পান। এ জন্য প্রয়োজন সততা, ধৈর্য এবং নিয়মিত আত্মসমালোচনা।

লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও ধর্মীয় নিবন্ধকার