ফ্রান্সে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং শিক্ষা খাতের সংকটের প্রতিবাদে নতুন করে তীব্র নাগরিক অস্থিরতা ও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর মেয়াদের শেষ সময়ে এসে এই আন্দোলন তার সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হিসেবে দেখা দিয়েছে। খবর রয়টার্স
শনিবারের (২৪ অক্টোবর) বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে প্রায় ৭০,০০০ পুলিশ ও নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে, যাতে পূর্ববর্তী সপ্তাহের মতো বড় আকারের লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের পুনরাবৃত্তি না ঘটে।
জননিরাপত্তা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রক্ষার জন্য প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকরনু আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষগুলোকে বিভিন্ন শহরে আংশিক ও স্থানভিত্তিক কারফিউ জারির ক্ষমতা দিয়েছেন। এছাড়া সতর্কতাবশত প্যারিসের বিখ্যাত লুভর জাদুঘর, মুসে দ'র্সে ও গ্রঁ পালে সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়।
এর মধ্যেই বিক্ষোভকারীরা দলে দলে রাজধানী প্যারিসের রাস্তায় নেমেছে। দেশজুড়ে বিক্ষোবের অংশ হিসাবে ১ লাখ ১০ হাজার মানুষ রাজধানীর রাস্তায় মিছিল করেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। পতাকা হাতে সমবেত বিক্ষোভকারীদের কেউ কেউ স্লোগান দিচ্ছিল ‘রাষ্ট্র, পুলিশ এবং ফ্যাসিস্টদের পতন হোক’।
বিভিন্ন নগরীতে চলা বিক্ষোভে অন্তত ১৩৫ জনকে আটক করা হয়েছে। প্যারিসসহ মন্টপেলিয়ার, রুয়া ও নিসের মতো শহরগুলোর কেন্দ্রস্থলে সভা-সমাবেশ ও মিছিলের ওপর কড়াকড়ি ও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।
ওর্লেয়াঁ শহরে কট্টর ডানপন্থি দল ন্যাশনাল র্যালির (আরএন) বার্ষিক সম্মেলনকে কেন্দ্র করেও বিক্ষোভ হয়েছে। সেখানে প্রায় ১১ হাজার মানুষ অংশ নেয়।
কয়েকটি নগরীতে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হলেও রাজধানী প্যারিসের বড় সমাবেশ মোটামুটি শান্তিপূর্ণ ছিল এবং গত সপ্তাহের তুলনায় পরিস্থিতি কম গুরুতর ছিল।
প্যারিস পুলিশ এবং গণমাধ্যমের তথ্যানুযায়ী, মূল মিছিল শান্তিপূর্ণ ভাবে সম্পন্ন হয়েছে। তবে শেষভাগে কিছু জায়গায় বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ জলকামান ব্যবহার করে।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনিয়েজ জানিয়েছেন, গত ১৭ অক্টোবরের তুলনায় এবার ১০ হাজার বেশি পুলিশ ও জেন্ডারমেরি সদস্য মোতায়েন করা হয়।
আগের সপ্তাহে বিক্ষোভের একপর্যায়ে বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুর ও লুটপাট ছড়িয়ে পড়েছিল। পরিস্থিতি মোকাবেলায় এবার পুলিশকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। নুনিয়েজের দাবি, উগ্র বামপন্থি গোষ্ঠী ও অপরাধী চক্রের তৎপরতায় সহিংসতার ঝুঁকি বেড়েছে।
প্যারিসের কেন্দ্রীয় এলাকায় শনিবার কড়া নিরাপত্তাব্যবস্থার কারণে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়েছে। নগরী লকডাউনের মতো আবস্থায় ছিল। ২০টির বেশি মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখা হয় এবং লুভর জাদুঘর, মুসে দর্সে ও প্যারিস অপেরাসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ।
সরকার ঘোষণা করেছে যে, যারা সম্পত্তির ক্ষতি সাধন করেছে, তাদের অর্থ দিয়েই তা মেরামত করার জন্য নতুন আইন প্রণয়ন করা হবে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের সহায়তায় বিশেষ জরুরি তহবিল ও আর্থিক প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়েছে।
দাঙ্গার সময় বিলাসবহুল ব্র্যান্ডসহ বিভিন্ন দোকান থেকে লুট হওয়া পণ্য যাতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বিক্রি হতে না পারে, সেজন্য অনলাইন মার্কেটপ্লেসগুলোর ওপর কঠোর নজরদারি চালানো হচ্ছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-কর্মীর তীব্র সংকট ও জরাজীর্ণ পরিবেশের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ থেকে এই আন্দোলনের সূত্রপাত হলেও, পরবর্তীতে তা জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয়, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি (পেট্রোল ২.২০ ইউরো ও ডিজেল ২.৩০ ইউরো) এবং সরকারের অর্থনৈতিক ও কর নীতির বিরুদ্ধে একটি বহুমুখী গণবিক্ষোভে রূপ নেয়।