বিলুপ্তির পথে মনকাঁটা গাছ ও ফল

একসময় গ্রামবাংলার অধিকাংশ বাড়িতে দেখা মিলত মনকাঁটা গাছের। গাছে ধরত অম্লমধুর স্বাদের মনকাঁটা ফল, যা কোনো কোনো অঞ্চলে ‘ঢেপারু ফল’ বা ‘মুয়ানা ফল’ নামে পরিচিত ছিল। তবে কালের বিবর্তনে গাছটি এখন বিলুপ্তির পথে। গ্রামে-গঞ্জে কালেভদ্রে দেখা মেলে এই গাছের।

মনকাঁটা গাছের বৈজ্ঞানিক নাম Grewia laevigata Roxb.। এটি Rubiaceae পরিবারের অন্তর্গত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গাছটি ‘মইনগুলা’, ‘ময়নাকাঁটা’, ‘বিষকাঁটা’, ‘মনফল গাছ’ ও ‘মনগুটা গাছ’ নামেও পরিচিত।

প্রাপ্তবয়স্ক মনকাঁটা গাছের কাণ্ড বেশ মোটা ও শক্ত হয়। গাছের নিচ থেকে ওপর পর্যন্ত থাকে অত্যন্ত ধারালো ও শক্তিশালী কাঁটা। কাঁটাগুলো দেখতে অনেকটা দুই থেকে ছয় ইঞ্চি লম্বা পেরেকের মতো।

নানা কাজে ব্যবহৃত হতো মনকাঁটা গাছ
প্রাচীনকালে গ্রামের জমিদার ও জোতদারেরা মনকাঁটা গাছ কেটে দুই থেকে পাঁচ হাত লম্বা লাঠির মতো তৈরি করতেন। কাঁটাসহ এসব লাঠি প্রায় এক মাস বা তারও বেশি সময় পুকুর কিংবা দীঘির পানিতে ভিজিয়ে রাখা হতো। পরে জমি বা চর দখল নিয়ে সংঘর্ষে জোতদারদের লাঠিয়ালরা এগুলো ব্যবহার করতেন।

এ ছাড়া মাছভর্তি খাল-বিল ও পুকুরের সুরক্ষায় কাদাসহ মনকাঁটা গাছের ডালপালা জলাশয়ের চারপাশে ফেলে রাখা হতো। কেউ চুরি করে জাল দিয়ে মাছ ধরতে গেলে গাছের কাঁটায় জাল ছিন্নভিন্ন হয়ে যেত।

আগে শরীরে ফোঁড়া হলে তা পাকার পর গলানোর জন্যও মনকাঁটা গাছের ধারালো কাঁটা ব্যবহার করা হতো বলে জানা যায়।

নবজাতকের চুল ফেলার ঐতিহ্যেও ছিল মনকাঁটা
সিলেট ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে নবজাতকের প্রথমবার চুল ফেলার সময়ও মনকাঁটা গাছের কাঁটা ব্যবহারের ঐতিহ্য ছিল। নাপিতের সামনে কলাপাতায় শান্ত ও নম্রতার প্রতীক দুর্বাঘাস এবং সবকিছু মনে রাখার ক্ষমতা অর্জনের আশায় মনকাঁটা গাছের কাঁটা রাখা হতো। এরপর নবজাতকের চুল ফেলা হতো।

চুল ফেলা শেষে নবজাতকের চুল, দুর্বাঘাস ও মনকাঁটা গাছের কাঁটা কলাপাতায় মুড়িয়ে পানিতে ভাসিয়ে দেওয়া হতো। সিলেট ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে এটি ছিল প্রাচীনকালের একটি ঐতিহ্য।

মনকাঁটা গাছের পাতা ও ফল ঔষধি কাজে ব্যবহৃত হতো বলেও জানা যায়। ভারতের মণিপুরের চোথে নামের একটি উপজাতি সম্প্রদায়ের বিশ্বাস, মনকাঁটা গাছের তাজা পাতা দিয়ে তৈরি চাটনি খেলে রক্ত বিশুদ্ধ হয়। নাসিক অঞ্চলের উপজাতিরা নারকেল তেলের সঙ্গে এই গাছের পাতা মিশিয়ে ব্যবহার করেন। তাঁদের বিশ্বাস, এতে বিভিন্ন রোগের উপশম হয়।

অম্লমধুর ফল দিয়ে তৈরি হতো আচার
মনকাঁটা ফল কাঁচা অবস্থায় সবুজ থাকে, আর পাকলে হালকা লাল রং ধারণ করে। অম্লমধুর স্বাদের এই ফল পাকার পর সরাসরি খাওয়া যায়। এ ছাড়া ফলটি দিয়ে সুস্বাদু আচার তৈরি করা সম্ভব।

অতীতে গ্রামের গৃহবধূরা মনকাঁটা ফল দিয়ে আচার তৈরি করে দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করতেন। এ জন্য ফল প্রথমে ভালোভাবে পরিষ্কার করে রোদে শুকানো হতো। পরে লবণ, হলুদ ও অন্যান্য মসলা মিশিয়ে আচার সংরক্ষণ করা হতো। স্বাদে অনন্য এই আচারের পুষ্টিগুণও রয়েছে বলে জানা যায়।

মৌলভীবাজারে এখনো টিকে আছে একটি গাছ
বৃক্ষপ্রেমী বিষ্ণু হাজরা রাজু বলেন, একসময় দেশের গ্রামে-গঞ্জে প্রচুর মনকাঁটা গাছ দেখা গেলেও বর্তমানে তা বিলুপ্তির পথে। এখন গ্রামের পর গ্রাম ঘুরেও একটি মনকাঁটা গাছ খুঁজে পাওয়া অনেকটা লটারি জেতার মতো ব্যাপার।

তিনি জানান, মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার ৮ নম্বর কালিঘাট ইউনিয়নে ফিনলে টি কোম্পানির মালিকানাধীন ভাড়াউড়া চা বাগানের সাবেক শ্রমিক প্রয়াত রসিক দোষাদের বাড়িতে একটি মনকাঁটা গাছ রয়েছে। প্রতিবছর সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে গাছটির ফল পাকে।

স্থানীয় লোকজনের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বৃক্ষ গবেষক, চিত্রগ্রাহক ও পর্যটকেরা গাছটি দেখতে সেখানে যান। তারা গাছ ও ফলের ছবি ধারণ করে নিয়ে আসেন।

বিষ্ণু হাজরা রাজু বলেন, মনকাঁটা গাছ ও ফল দ্রুত প্রকৃতি থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করতে হলে গাছটির সংরক্ষণ জরুরি। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অতীতের এই ঔষধি ও খাদ্যসম্পদ রক্ষা করা প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, আমরা যদি এটি সংরক্ষণে গুরুত্ব না দিই, তবে হয়তো আগামী এক দশক পরে এ বৃক্ষটি আমাদের দেশ থেকে পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে স্মৃতির পাতায় ঠাঁই নেবে।