দেশের প্রথম ব্যাংক হিসেবে ১ হাজার কোটি টাকার গ্রিন বন্ড ইস্যু করতে যাচ্ছে ব্র্যাক ব্যাংক। এ বন্ড থেকে সংগৃহীত অর্থ নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পরিবেশবান্ধব ভবন নির্মাণ এবং শিল্পকারখানার জ্বালানি-দক্ষতা বাড়ানোর প্রকল্পে বিনিয়োগ করা হবে। জ্বালানির উচ্চমূল্যের চাপে থাকা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবহারে উৎসাহিত করতে সাশ্রয়ী অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করাও এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
রবিবার (২৫ অক্টোবর) রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তারেক রেফায়াত উল্লাহ খান। এ সময় গ্রিন বন্ড ও সোশ্যাল বন্ডের পার্থক্যও তুলে ধরা হয়।
তারেক রেফাত উল্লাহ খান বলেন, দেশের প্রথম ব্যাংক হিসেবে ১ হাজার কোটি টাকার গ্রিন বন্ড ইস্যুর উদ্যোগ ব্যাংকিং খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এ সময় তিনি টানা দুই বছর দেশের শীর্ষ ব্যাংক হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো চাপের মধ্যে রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে গ্রিন বন্ডের মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে সাশ্রয়ী অর্থায়নের সুযোগ তৈরি হবে। বন্ড থেকে পাওয়া অর্থ পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে বিনিয়োগের পাশাপাশি শিল্পকারখানার জ্বালানি-দক্ষতা বাড়ানোর কাজে ব্যবহার করা হবে।
গ্রিন বন্ড ও সোশ্যাল বন্ডের পার্থক্য
গ্রিন বন্ড ও সোশ্যাল বন্ডের মধ্যে মূল পার্থক্য হলো অর্থ ব্যবহারের উদ্দেশ্য। গ্রিন বন্ডের মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ জ্বালানি সাশ্রয়, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন এবং পরিবেশবান্ধব ভবন নির্মাণের মতো পরিবেশ সুরক্ষামূলক প্রকল্পে বিনিয়োগ করা হয়।
অন্যদিকে, সোশ্যাল বন্ডের অর্থ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন, পানি ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নসহ বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়নমূলক প্রকল্পে ব্যয় করা হয়। অর্থাৎ, গ্রিন বন্ডের মূল লক্ষ্য পরিবেশগত উন্নয়ন এবং সোশ্যাল বন্ডের লক্ষ্য সামাজিক উন্নয়ন। উভয় ধরনের বন্ডই টেকসই উন্নয়নে অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করে, তবে অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্র ভিন্ন।
তিন বছরে সম্ভাব্য আয় ২৪.২৩ শতাংশ
ব্র্যাক ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বন্ডটির মেয়াদ হবে তিন বছর এবং অভিহিত মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ লাখ টাকা। এটি হবে সিনিয়র আনসিকিউরড, অরূপান্তরযোগ্য, সম্পূর্ণ পরিশোধযোগ্য ও জিরো-কুপন বন্ড। ফলে নির্দিষ্ট বিরতিতে সুদ বা কুপন দেওয়া হবে না। বিনিয়োগকারীরা অভিহিত মূল্যের চেয়ে কম দামে বন্ড কিনবেন এবং মেয়াদপূর্তিতে পুরো অভিহিত মূল্য পাবেন। ক্রয়মূল্য ও মেয়াদপূর্তিতে পাওয়া অর্থের পার্থক্যই হবে তাদের আয়।
বার্ষিক ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ ডিসকাউন্ট রেট ধরে তিন বছর মেয়াদি ১০ লাখ টাকা অভিহিত মূল্যের একটি বন্ডের সম্ভাব্য ক্রয়মূল্য হবে প্রায় ৮ লাখ ৪ হাজার ৯৬১ টাকা। মেয়াদপূর্তিতে বিনিয়োগকারী পাবেন ১০ লাখ টাকা। এতে তিন বছরে সম্ভাব্য আয় হবে ১ লাখ ৯৫ হাজার ৩৯ টাকা। অর্থাৎ, এ সময়ে বিনিয়োগের ওপর মোট সম্ভাব্য রিটার্ন হবে ২৪ দশমিক ২৩ শতাংশ।
তারেক রেফাত উল্লাহ খান বলেন, বন্ডটির প্রস্তাবিত হার ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ। বিনিয়োগকারীদের জন্য কর-সুবিধা থাকায় এটি আকর্ষণীয় হবে বলে আশা করছে ব্যাংকটি।
বন্ড থেকে সংগৃহীত অর্থের যথাযথ ব্যবহার ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রতিবছর নিরীক্ষা করা হবে। পাশাপাশি দেশের বন্ড ও পুঁজিবাজার শক্তিশালী করা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের বিকল্প উৎস তৈরিতেও এ উদ্যোগ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছে ব্যাংকটি।
বিনিয়োগ করতে পারবেন যারা
বন্ডটিতে করপোরেট প্রতিষ্ঠান, উচ্চ সম্পদশালী ব্যক্তি ও সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ করতে পারবেন। প্রযোজ্য বিধিবিধান ও শর্ত পূরণ সাপেক্ষে কোম্পানির প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচুইটি ফান্ড থেকেও বিনিয়োগ করা যাবে।
প্রতি বুধবার বন্ডটিতে বিনিয়োগের আবেদন গ্রহণ করা হবে। নির্ধারিত দিন সরকারি ছুটি বা বাংলাদেশ ব্যাংকের ছুটির দিনে পড়লে আগের কর্মদিবসে আবেদন নেওয়া হবে।
বন্ডটি ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে ইস্যু করা হবে। আবেদন গ্রহণের সময়সীমা শেষ হলে এটি স্টক এক্সচেঞ্জের মূল বাজারে তালিকাভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। তালিকাভুক্তির পর প্রচলিত নিয়মে লেনদেনের মাধ্যমে বিনিয়োগ নগদায়নের সুযোগ তৈরি হবে। তবে এ ক্ষেত্রে বাজারে ক্রেতা ও বিক্রেতার উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ।
ব্র্যাক ব্যাংক জানিয়েছে, বন্ডটির কাঠামো সম্পর্কে এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল রেটিংস একটি স্বাধীন মূল্যায়ন বা ‘সেকেন্ড-পার্টি ওপিনিয়ন’ দিয়েছে। এটি ইন্টারন্যাশনাল ক্যাপিটাল মার্কেট অ্যাসোসিয়েশনের (আইসিএমএ) গ্রিন বন্ডের মূলনীতির সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ব্যাংকটির তথ্য অনুযায়ী, আয়কর আইন, ২০২৩-এর ষষ্ঠ তফসিলের প্রথম অংশের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদে উল্লেখিত বিধান অনুযায়ী, জিরো-কুপন বন্ড থেকে অর্জিত আয় প্রযোজ্য শর্তে উৎসে আয়করসহ আয়কর থেকে অব্যাহতিপ্রাপ্ত। এ ছাড়া বন্ডটি স্টক এক্সচেঞ্জের মূল বাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর বিনিয়োগের বিপরীতে কর রেয়াত পাওয়ার সুযোগ থাকবে বলে জানিয়েছে ব্যাংকটি।
বন্ডে বিনিয়োগের জন্য বিনিয়োগকারীদের বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) হিসাব থাকতে হবে। যাদের এ হিসাব নেই, তাদের হিসাব খুলতে সহায়তা করবে ব্র্যাক ব্যাংক।
ব্যাংকটির প্রত্যাশা, এ উদ্যোগ পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে অর্থায়ন বাড়ানোর পাশাপাশি শিল্প খাতে জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার, টেকসই অর্থায়ন এবং দেশের পুঁজিবাজারের বিকাশে অবদান রাখবে।