বাংলাদেশ ব্যাংক পাঁচটি ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স অনুমোদন করেছে। ভার্চুয়াল ব্যাংকিং হচ্ছে, প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার সর্বোৎকৃষ্ট পর্যায় যা সুশৃঙ্খল, সুনিয়ন্ত্রিত এবং ম্যাচিউর ব্যাংকিং ব্যবস্থায় কাজ করে। সেই তুলনায় দেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে কোন অবস্থায় আছে, তা সবার জানা। নানামুখী সমস্যায় জর্জরিত ব্যাংকিং খাতে ভার্চুয়াল ব্যাংক কতটা কাজ করবে, সেটাই দেখার বিষয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক আসলে ‘ডিজিটাল ব্যাংক’ নাকি ‘ভার্চুয়াল ব্যাংক’-এর অনুমোদন দিয়েছে, তা পরিষ্কার নয়। ডিজিটাল ব্যাংক এবং ভার্চুয়াল ব্যাংকের মধ্যে পার্থক্য আছে। ডিজিটাল ব্যাংকে প্রধান শাখা যেমন থাকবে, তেমনি ব্যবসায়িক কৌশল অনুযায়ী থাকবে ব্যাংকের অনেক শাখা। ডিজিটাল ব্যাংকিং হলেও ব্যাংক সরাসরি গ্রাহকদের কাছ থেকে সঞ্চয় সংগ্রহ করবে, অর্থ জমা নেবে এবং অর্থ উত্তোলন, ঋণদান, অর্থ স্থানান্তরসহ সব প্রকার ব্যাংকিং সেবা সরাসরি গ্রাহকদের প্রদান করতে পারবে। পক্ষান্তরে ভার্চুয়াল ব্যাংকিং সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির এবং খুবই অল্প পরিসরের এক অত্যাধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা। ভার্চুয়াল ব্যাংকের দৃশ্যত কোনো অবস্থান থাকে না। একটি প্রধান কার্যালয় থাকলেও, এই ব্যাংকের কোনো শাখা বা অবস্থান কোথাও থাকে না। এটি ওয়েবসাইট সর্বস্ব ব্যাংকিং ব্যবস্থা, যা সাধারণত নির্দিষ্ট কিছু গ্রাহককে বিশেষ কিছু সেবা প্রদান করে। ভার্চুয়াল ব্যাংক গ্রাহকদের অর্থ প্রদান ও গ্রহণ সংক্রান্ত সরাসরি সেবা দিতে পারে না। সেক্ষেত্রে তাদের অন্য কোনো ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে, তার মাধ্যমে সেবা প্রদান করতে হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক প্রযুক্তিনির্ভর আর্থিক সেবা প্রদানকারী পাঁচ প্রতিষ্ঠানকে ডিজিটাল ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দিয়েছে। কিন্তু এই পাঁচটি ডিজিটাল ব্যাংককে পরিপূর্ণ লাইসেন্স প্রদান করেনি। যে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, তা মূলত কার্যক্রম পরিচালনার সম্মতি, যাকে ‘লেটার অব ইনটেন্ট’ বা ‘এলওআই’। এই এলওআই পাওয়া ডিজিটাল ব্যাংকগুলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তাদের অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা গড়ে তুলবে, বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক বেঁধে দেওয়া শর্ত পূরণ করবে এবং ভার্চুয়াল ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা অর্জন করবে। নির্দিষ্ট সময় পর যদি এসব বিষয়ে সম্পূর্ণরূপে সন্তুষ্ট হয়, তখনই বাংলাদেশ ব্যাংক পাঁচটি ডিজিটাল ব্যাংককে পরিপূর্ণ লাইসেন্স প্রদান করবে।
বিশ্ব এখন ডিজিটাল যুগের সর্বোচ্চ পর্যায়ে, যেখানে প্রযুক্তির সব ধাপ পেরিয় আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের মতো অতি অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়েছে। তাই বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত পিছিয়ে থাকবে কেন? এক সময় দেশের ব্যাংকিং খাত সম্পূর্ণ ডিজিটাল হবে, দেশে ডিজিটাল কারেন্সি হবে, ক্যাশলেস অর্থনীতি চালু হবে এবং ভার্চুয়াল ব্যাংকিং সেবাও চালু হবে, এটাই স্বাভাবিক। সেদিক থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক হয়তো সঠিক পথে আছে। প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত কি অত্যাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ভার্চুয়াল ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য উপযুক্ত কি না? বাংলাদেশে সব ব্যাংক এখনো পরিপূর্ণ ডিজিটাল ব্যাংকে রূপান্তরিত হতে পারেনি। অধিকাংশ ব্যাংকিং কার্যক্রম গতানুগতিক ধারার ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়। সবচেয়ে বড় কথা, দেশের ব্যাংকিং খাত সবচেয়ে খারাপ অবস্থায়। হাতেগোনা কয়েকটি ব্যাংকের কথা বাদ দিলে, অধিকাংশ ব্যাংক টিকে থাকার চেষ্টা করছে। অনেক ব্যাংকের তারল্যমান খুবই খারাপ, অনেক ব্যাংক গ্রাহকদের চাহিদামাফিক অর্থ ফেরত দিতে পারছে না, খেলাপি ঋণ মাত্রাতিরিক্ত, অধিকাংশ ব্যাংকে সুশাসনের বড় অভাব এবং অনেক ব্যাংকের আছে উদ্বেগজনক মূলধন ও প্রভিশন ঘাটতি। এ রকম বৈরী পরিবেশে ডিজিটাল ব্যাংকের মতো প্রযুক্তিনির্ভর অত্যাধুনিক ভার্চুয়াল ব্যাংকিং চালু করার অনুমোদন দিয়ে, বাংলাদেশ ব্যাংক কী এমন লক্ষ্য অর্জন করবে, তা আমরা বুঝে উঠতে পারছি না।
ভার্চুয়াল ব্যাংকিং মূলত তৃতীয় পর্যায়ের বিশেষ ব্যাংকিং সেবা, যা গড়ে তোলা হয় অন্যান্য দুই পর্যায়ের ব্যাংকিং সেবার ওপর ভিত্তি করে। যার একটি হচ্ছে, প্রথম পর্যায়ে গতানুগতিক ব্যাংকিং এবং আরেকটি দ্বিতীয় পর্যায়ের ডিজিটাল ব্যাংকিং। যে দেশের ব্যাংকিং খাত এই দুটো পর্যায় সফলভাবে সম্পন্ন করতে পারে, তারাই ভার্চুয়াল ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিতে পারে। আমাদের দেশের গতানুগতিক ধারার ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে চালু থাকলেও, এখানে বেশ কিছু সমস্যা পুঞ্জীভূত হয়ে আছে। তা ছাড়া দেশে ডিজিটাল ব্যাংকিং বলতে যা বোঝায়, তা সেভাবে চালু হয়নি। একেক ব্যাংক একেক রকম করে, কিছু বিভাগ প্রযুক্তিনির্ভর করেছে মাত্র। এখনো ইন্ডাস্ট্রি স্ট্যান্ডার্ড প্র্যাকটিস চালু হয়নি। ব্যাংকে হিসাব খোলা থেকে শুরু করে ঋণ আবেদন, ঋণ মঞ্জুর, ডকুমেন্টেশন, ঋণ বিতরণ, ঋণ আদায় এবং রিকনসিলিয়েশন পর্যন্ত যাবতীয় কাজ প্রযুক্তিনির্ভর স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন হওয়ার ব্যবস্থা থেকে দেশের ব্যাংকিং খাত এখনো অনেক দূরে। অথচ এসব একটি মানসম্পন্ন ডিজিটাল ব্যাংকের প্রধান শর্ত। এ রকম একটি অবস্থায় প্রযুক্তিনির্ভর চূড়ান্ত পর্যায়ের ব্যাংকিং সেবা, ভার্চুয়াল ব্যাংকিং, চালু করা কতটা বাস্তবসম্মত, তা ভেবে দেখা প্রয়োজন।
দেশে ভার্চুয়াল ব্যাংকিং ব্যবস্থা হয়তো এক সময় চালু করতে হবে। কিন্তু এর আগে ব্যাংকিং খাতে যে সমস্যাগুলো আছে, তা সমাধান করে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে ব্যাংকিং খাতকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে হবে। তারপর ব্যাংকিং খাতে পরিপূর্ণ ডিজিটালাইজেশন সম্পন্ন করতে হবে। এসব পদক্ষেপ নেওয়ার পর, ভার্চুয়াল ব্যাংক চালুর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এমনিতেই দেশে ব্যাংকের সংখ্যা অনেক। তার ওপর ভার্চুয়াল ব্যাংকের নামে নতুন ব্যাংকের অনুমোদন দেওয়ার কারণে, সার্বিকভাবে দেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য আরও খারাপ হতে পারে। উল্লেখ্য, আমেরিকা-কানাডার মতো দেশেও ভার্চুয়াল ব্যাংকের সংখ্যা খুব নগণ্য। আরও একটি বিষয় এখানে প্রণিধানযোগ্য, বর্তমানে চালু আর্থিক সেবাপ্রদানকারী প্রতিষ্ঠানকে ভার্চুয়াল ব্যাংক চালুর অনুমোদন দেওয়ার ক্ষেত্রে খ্যাতনামা অডিট ফার্মের মাধ্যমে তাদের পূর্বের কার্যক্রমের বিস্তৃত নিরীক্ষা করে একটি ক্লিন রিপোর্ট প্রদানের শর্ত জুড়ে দেওয়া প্রয়োজন। এর ফলে পূর্বের ব্যবসায়িক কার্যক্রমের কোনো পুঞ্জিভূত সমস্যা ভার্চুয়াল ব্যাংক চালুর মাধ্যমে আড়াল করার সুযোগ থাকবে না।
ভার্চুয়াল ব্যাংকের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এর মাধ্যমে সব ধরেনের গ্রাহকের সব প্রকার ব্যাংকিং সেবা প্রদান করা হয় না। সাধারণত বিশেষ শ্রেণির গ্রাহক, যাদের প্রতি ব্যাংকের আস্থা অনেক বেশি, তাদের ভার্চুয়াল ব্যাংকিং সেবা প্রদান করা হয়। তা ছাড়া ভার্চুয়াল ব্যাংকের সেবার ধরনও খুব সীমিত। সাধারণত ক্রেডিট কার্ড, ব্যক্তিগত ঋণ, বন্ধকি ঋণ, কনজিউমার ঋণসহ রিটেইল ব্যাংকিং সেবার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে ভার্চুয়াল ব্যাংকিং কার্যক্রম। ব্যবসায়িক বা করপোরেট ঋণ দেওয়ার সুযোগ ভার্চুয়াল ব্যাংকে রাখা ঠিক হবে না। বাংলাদেশ ব্যাংককে এই বিষয়গুলো সক্রিয় বিবেচনায় রাখতে হবে। ভার্চুয়াল ব্যাংক চালুর উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টির আগে এই অত্যাধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার জন্য প্রযোজ্য কন্ট্রোল প্যারামিটার নিশ্চিত না করে, যেনতেনভাবে ভার্চুয়াল ব্যাংক চালুর লাইসেন্স দেওয়ার অর্থই হচ্ছে দেশের ব্যাংকিং খাতকে আরেক ধরনের সমস্যার মধ্যে ঠেলে দেওয়া।
এআই যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গেলে, দেশের ব্যাংকিং খাতকে ডিজিটাল পদ্ধতিতে রূপান্তর করতে হবে। তবে সেটা করতে হবে পর্যায়ক্রমে এবং উপযুক্ত সময়ে। সেটা না করে, অতি দ্রুত এবং শর্টকাট পদ্ধতি অবলম্বন করে সবকিছু ডিজিটালাইজেশন করতে গেলে এক ধরনের লেজেগোবরে অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে।
যেকোনো পদ্ধতি বা ব্যবস্থার ডিজিটালাইজেশন হচ্ছে সর্বোচ্চ মাত্রার অত্যাধুনিক ব্যবস্থা, যদি সেটি সঠিকভাবে সম্পন্ন করা যায়। কিন্তু সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে না পারলে, এই ব্যবস্থা যে কী মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে, তা অনেকে ভাবতেও পারবে না। সব রকম ঝুঁকির বিষয় সঠিকভাবে মূল্যায়ন না করে, তড়িঘড়ি আর্থিক খাতে কিছু অনুমোদন দিলে, তার পরিণতি কী হয়, তা ব্যাংকিং খাতের বর্তমান অবস্থার দিকে তাকালে বোঝা যায়। যখন দেশের সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোকে সুশৃঙ্খল ও সুনিয়ন্ত্রিত করা প্রয়োজন ছিল, তখন সেটি না করে দ্রুত বেসরকারি ব্যাংকের অনুমোদন দেওয়াতে আজকের ব্যাংকিং খাতের এই দুরবস্থা। একইভাবে আজকের ব্যাংকিং খাতের সমস্যাগুলো সঠিকভাবে সমাধান না করে, এই খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে একে ন্যূনতম মানসম্পন্ন অবস্থায় উন্নিত না করে অত্যাধুনিক ভার্চুয়াল ব্যাংকিং চালু করলে এক সময় এই ব্যাংকিং ব্যবস্থা আজকের ব্যাংকিং খাতের মতো সমস্যায় পড়তে পারে। বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংক যত বিবেচনা করবে, ততই তাদের জন্য এবং দেশের জন্য ভালো।
লেখক : সার্টিফাইড অ্যান্টি-মানিলন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার টরেন্টো, কানাডা
nironjankumar_roy@yahoo.com