বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী উপন্যাসে কপালকুণ্ডলা নবকুমারকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘পথিক, তুমি কি পথ হারাইয়াছ?’ বাংলাদেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতির দিকে তাকালে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে একই প্রশ্ন করা যায়। ডেঙ্গুনিয়ন্ত্রণের পথ কি আমরা হারিয়েছি? প্রতি বছর বর্ষা আসে, এডিস মশার বংশবিস্তার হয়, হাসপাতালের শয্যা পূর্ণ হয়ে যায়। তারপর প্রকোপ কিছুটা কমলে আমরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলি। পরের বছর আবার পুরনো আতঙ্ক, একই অসহায়ত্ব। এই চক্র থেকে মুক্তির প্রত্যাশায়, আলোচনার কেন্দ্রে ‘ডেঙ্গু ভ্যাকসিন’।
প্রত্যাশা স্বাভাবিক। কিন্তু প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির ব্যবধান ঘোচাতে প্রয়োজন বিজ্ঞান, সুপরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ এবং কার্যকর জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা। টিকা আবিষ্কৃত হয়েছে বলে সবার জন্য তা নিরাপদ, উপযোগী ও সমান কার্যকর এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যেমন ভুল, তেমনি বৈজ্ঞানিক সম্ভাবনার কথা বলে কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে, অনির্দিষ্টকাল অপেক্ষা করাও দায়িত্বশীলতার পরিচয় নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, প্রতি বছর একই রোগের পুনরাবৃত্তি, বিপুল চিকিৎসা ব্যয় এবং অসংখ্য মানুষের মৃত্যুর পরও ডেঙ্গু প্রতিরোধে সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা কেন প্রতিষ্ঠিত হবে না? মশক নিধনের প্রচলিত কার্যক্রম, জনসচেতনতামূলক প্রচার এবং হাসপাতালের প্রস্তুতি প্রয়োজনীয় হলেও এগুলোর কার্যকারিতা নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে একাধিক টিকা নিয়ে গবেষণা হয়েছে। এর মধ্যে কিউডেঙ্গা বা ঞঅক-০০৩ উল্লেখযোগ্য। বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা, ২০২৪ সালের মে মাসে টিকাটিকে প্রাক্যোগ্যতা দেয়। সংস্থাটি উচ্চমাত্রার ডেঙ্গুসংক্রমণপ্রবণ এলাকায় ৬ থেকে ১৬ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের জন্য নির্দিষ্ট শর্তে টিকাটি ব্যবহারের সুপারিশ করেছে। এর দুটি ডোজের মধ্যে তিন মাসের ব্যবধান রাখতে হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ মানে, সব বয়সের মানুষের জন্য নির্বিচার টিকাদানের অনুমোদন নয়। টিকাটি সব ডেঙ্গুসংক্রমণ প্রতিরোধ করতে পারে না। এর কার্যকারিতা সেরোটাইপ, বয়স ও পূর্ববর্তী সংক্রমণের ইতিহাস অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে। সরকার ডেঙ্গু ভ্যাকসিনকে, দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধ কৌশলের অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে জাতীয় পর্যায়ে গণটিকাদান শুরুর পরিকল্পনা নেই বলে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন। ১৩ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা, টিকার নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা মূল্যায়ন এবং দেশে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের প্রয়োজনীয়তা পর্যালোচনার বিষয় উঠে এসেছে। সরকারের এই সতর্কতার যৌক্তিকতা রয়েছে। লাখ লাখ মানুষকে টিকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত আবেগের বশে নেওয়া যায় না। প্রয়োজন কার্যকারিতা ও নিরাপত্তার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ, স্থানীয় জনগোষ্ঠীতে সম্ভাব্য ফলাফল মূল্যায়ন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা। তবে সতর্কতা যেন সিদ্ধান্তহীনতার সমার্থক না হয়। গবেষণা, বিশেষজ্ঞ পরামর্শ, মূল্যায়ন ও নীতিনির্ধারণের জন্য সময়সীমাবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা থাকা জরুরি। জনগণকে শুধু অপেক্ষা করতে বলা যথেষ্ট নয়; কেন অপেক্ষা করতে হচ্ছে, কী গবেষণা চলছে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরবর্তী ধাপ কী সেসব তথ্য জানাতে হবে।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে সব সমস্যার সমাধান ভ্যাকসিন নয়। এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, জমে থাকা পানি অপসারণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নির্মাণাধীন ভবনে পানি জমতে না দেওয়া এবং নিয়মিত মশার ঘনত্ব পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রাখতে হবে। টিকা প্রয়োগ শুরু হলেও, এসব কার্যক্রম বন্ধ করা যাবে না। সিটি করপোরেশন ও স্থানীয় প্রশাসনের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে নাগরিকদের দায়িত্ব নিতে হবে। রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব। রোগীর চিকিৎসার ক্ষেত্রে সতর্কতা জরুরি। জ¦র কমে গেলে ডেঙ্গুর বিপদ কেটে গেছে এমন ধারণা বিপজ্জনক। জ¦র কমার সময়ও রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে পারে। তাই বিপদসংকেত শনাক্তকরণ, দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানো, চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় শয্যা ও নিবিড় পরিচর্যার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
টিকার কার্যকারিতার পাশাপাশি এর মূল্য ও প্রাপ্যতা গুরুত্বপূর্ণ। কোনো টিকা অনুমোদিত হলে, তা যদি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে থাকে, তবে তার জনস্বাস্থ্যগত সুফল সীমিত হয়ে পড়বে। কেবল সচ্ছল জনগোষ্ঠী টিকার সুবিধা পাবে, আর দরিদ্র মানুষকে সংক্রমণ ও চিকিৎসা ব্যয়ের বোঝা বহন করতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে সহযোগিতার ক্ষেত্রও বিবেচনা করা যেতে পারে। কোন জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, তা নির্ধারণ করতে হবে রোগের প্রকোপ, টিকার কার্যকারিতা, নিরাপত্তা এবং ব্যয়-সাশ্রয়ের ভিত্তিতে। দেশীয় ওষুধ শিল্প ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে টিকা উৎপাদনের সম্ভাবনা যাচাই করা যেতে পারে। ডেঙ্গু ভ্যাকসিন নিয়ে দেশের সামনে দুটি বিপদ। একদিকে টিকা এলেই ডেঙ্গু নির্মূল হবে, এটা অতিরঞ্জিত প্রত্যাশা। অন্যদিকে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে গবেষণা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা। এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে প্রয়োজন বিজ্ঞানসম্মত, স্বচ্ছ ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ। সরকারের উচিত বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে টিকার মূল্যায়ন, স্থানীয় গবেষণার প্রয়োজনীয়তা, সম্ভাব্য ব্যয় এবং প্রয়োগনীতির বিষয়ে সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা। পাশাপাশি জনগণের জন্য নিয়মিত তথ্য প্রকাশ করতে হবে। ডেঙ্গু টিকা কবে আসবে, কারা অগ্রাধিকার পাবে, কীভাবে নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ করা হবে এবং সরকারি অর্থায়নের ব্যবস্থা কী? এসব প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
প্রত্যাশা শুধু ভ্যাকসিনের নয়; প্রত্যাশা এমন এক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার, যেখানে প্রতিরোধযোগ্য রোগে মানুষকে অসহায়ভাবে মৃত্যুর মুখে পড়তে হবে না। ডেঙ্গু ভ্যাকসিনের প্রকৃত সার্থকতা সেদিনই, যেদিন বৈজ্ঞানিক সতর্কতা বজায় রেখে এর উপযুক্ত ব্যবহার নিশ্চিত হবে, সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে প্রতিরোধের সুযোগ আসবে এবং মশাবাহিত এই রোগের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ একটি কার্যকর, টেকসই ও ন্যায়সংগত প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারবে।
লেখক : কলাম লেখক, ক্লাসিফাইড স্পেশালিস্ট আর্মড ফোর্সেস মেডিকেল কলেজ।