সবার জীবনে বিপদ আসে। বিপদে একজন মানুষের পাশে দাঁড়ানো অন্য মানুষের নৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, অনেক সময় অন্যের বিপদের খবর শুনে কিছু মানুষ সহমর্মিতা প্রকাশের পরিবর্তে বিদ্রুপ করেন। কেউ হাসাহাসি করেন, কেউ কটাক্ষ করেন, আবার কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই বিপদ নিয়ে তামাশা করেন। ইসলামের দৃষ্টিতে এ ধরনের আচরণ নিন্দনীয়।
মানুষের বিপদকে উপহাসের বিষয় বানানো অত্যন্ত ক্ষতিকর। এতে বিপদগ্রস্ত ব্যক্তির কষ্ট আরও বেড়ে যায়। অথচ আজ যে মানুষটি বিপদে পড়েছেন, আগামীকাল একই পরিস্থিতিতে অন্য কেউ পড়তে পারেন। মানুষের জীবন কখনো এক রকম থাকে না। তাই অন্যের দুঃসময়ে বিদ্রুপ না করে সহানুভূতি দেখানোই ইসলামের শিক্ষা।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ অন্যকে উপহাস করতে নিষেধ করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনরা, কোনো সম্প্রদায় যেন অপর কোনো সম্প্রদায়কে উপহাস না করে। হতে পারে, তারা উপহাসকারীদের চেয়ে উত্তম।’ (সুরা হুজুরাত ১১)
এ আয়াতের শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ বাহ্যিক অবস্থা দেখে অন্যের মূল্যায়ন করে। কারও আর্থিক দুরবস্থা, ব্যর্থতা কিংবা অসহায়ত্ব দেখে তাকে তুচ্ছ মনে করে। অথচ আল্লাহর কাছে কে বেশি মর্যাদাবান, তা মানুষের বাহ্যিক অবস্থা দিয়ে নির্ধারিত হয় না। আজ যে ব্যক্তি অসহায়, তার ইমান, চরিত্র ও আল্লাহর কাছে মর্যাদা হয়তো বিদ্রুপকারীর চেয়ে অনেক বেশি।
মানুষ যখন নিজের সুস্থতা, সম্পদ, সাফল্য কিংবা সামাজিক অবস্থান নিয়ে গর্ব করে, তখন অন্যের দুরবস্থাকে নিজের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ মনে করতে পারে। কিন্তু ইসলাম মানুষকে বিনয়ী হতে শিক্ষা দেয়। সম্পদ, সুস্থতা, সম্মান ও কর্মসংস্থান মানুষের জীবনে স্থায়ী নয়। এগুলো আল্লাহর দেওয়া নেয়ামত। আল্লাহ চাইলে মুহূর্তেই মানুষের অবস্থা পরিবর্তন করে দিতে পারেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘একজন মুসলিম অপর মুসলিমের ভাই। সে তার প্রতি জুলুম করে না এবং তাকে অসহায় অবস্থায় ছেড়ে দেয় না।’ (সহিহ বুখারি)
হাদিসটি মুসলমানদের পারস্পরিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তুলে ধরে। বিপদগ্রস্ত ব্যক্তিকে অসহায় অবস্থায় ছেড়ে দেওয়া কিংবা তার দুরবস্থাকে উপহাসের উপকরণ বানানো ভ্রাতৃত্বের চেতনার পরিপন্থী। একজন মুসলমানের উচিত বিপদে পড়া মানুষের পাশে দাঁড়ানো, তার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সহযোগিতা করা।
বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের বিপদ নিয়ে বিদ্রুপ করার প্রবণতা উদ্বেগজনক। কারও দুর্ঘটনা, অসুস্থতা, চাকরি হারানো কিংবা পারিবারিক সংকটের খবর প্রকাশিত হলে অনেকে যাচাই না করেই মন্তব্য করেন। কেউ ব্যঙ্গাত্মক ছবি তৈরি করেন, কেউ অপমানজনক কথা লেখেন, আবার কেউ সেই ঘটনা ছড়িয়ে দিয়ে আনন্দ পান। অথচ একটি মন্তব্যও বিপদগ্রস্ত মানুষের মনে গভীর আঘাত দিতে পারে। যে ব্যক্তি এমনিতেই মানসিক চাপে রয়েছেন, তার জন্য এ ধরনের আচরণ অসহনীয় হয়ে উঠতে পারে।
তাই কোনো ঘটনা শুনে মন্তব্য করার আগে চিন্তা করা প্রয়োজন, কথাটি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মনে কেমন প্রভাব ফেলবে। নিজের সঙ্গে এমন ঘটনা ঘটলে কেমন লাগত, সেটিও বিবেচনা করা দরকার। কারও ভুলের সমালোচনা করতে হলে তা শালীনভাবে করা যায়। ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া যায়। কিন্তু বিপদের মুহূর্তে কাউকে অপমান করা কিংবা তার অসহায়ত্ব নিয়ে হাসাহাসি করার কোনো যৌক্তিকতা নেই।
অন্যের বিপদে আনন্দিত না হয়ে তার কল্যাণ কামনা করা মুমিনের বৈশিষ্ট্য। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য তাই পছন্দ করে, যা সে নিজের জন্য পছন্দ করে।’ (সহিহ বুখারি)
এই হাদিসের শিক্ষা নিজের জীবনে প্রয়োগ করলে অন্যের বিপদে বিদ্রুপ করার প্রবণতা কমে আসে। আমরা নিজের জন্য সম্মান, সহানুভূতি ও সহযোগিতা প্রত্যাশা করি। তাই অন্যের প্রতিও একই আচরণ করা উচিত। কেউ বিপদে পড়লে তার জন্য দোয়া করা, সান্ত্বনা দেওয়া এবং প্রয়োজন হলে পাশে দাঁড়ানোই হওয়া উচিত আমাদের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া।
লেখক : শিক্ষক ও ধর্মীয় নিবন্ধকার