দুর্বলের সঙ্গে আচরণে প্রকাশ পায় প্রকৃত চরিত্র

আপডেট : ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৪২ এএম

মানুষের প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ পায় তার আচরণে। দুর্বল ও অসহায়ের সঙ্গে একজন মানুষ কেমন আচরণ করেন, তা দিয়ে তার মানসিকতা ও নৈতিকতার পরিচয় পাওয়া যায়। ক্ষমতাবান মানুষের সঙ্গে ভালো আচরণ করা সহজ। কিন্তু যার কাছ থেকে কোনো সুবিধা পাওয়ার আশা নেই, তার সঙ্গে সুন্দর আচরণ করাই প্রকৃত ভদ্রতা। ইসলাম মানুষের আচরণকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। দুর্বল মানুষের প্রতি দয়া, সহানুভূতি, সম্মান ও ন্যায়বিচার প্রদর্শনকে ইসলামে উত্তম চরিত্রের পরিচয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

ইসলাম মানুষকে সম্মান করতে শেখায়। ধনী-গরিব, শক্তিশালী-দুর্বল, মালিক-কর্মচারী কিংবা উঁচু-নিচু পেশার মানুষের মধ্যে মানবিক মর্যাদার ভিত্তিতে কোনো ভেদাভেদ করার শিক্ষা ইসলাম দেয় না। মানুষের প্রকৃত মর্যাদা নির্ধারিত হয় তার তাকওয়া, নৈতিকতা ও সৎকর্মের মাধ্যমে।

মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন, ‘হে মানুষ! আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী থেকে। আর তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পরের পরিচয় জানতে পারো। নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি অধিক মর্যাদাসম্পন্ন, যে তোমাদের মধ্যে অধিক তাকওয়াসম্পন্ন।’ (সুরা হুজুরাত ১৩)

এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, মানুষের মর্যাদা অর্থ, ক্ষমতা কিংবা সামাজিক অবস্থানের ওপর নির্ভরশীল নয়। তাই কোনো ব্যক্তি দরিদ্র, অসহায় কিংবা সামাজিকভাবে পিছিয়ে থাকার কারণে তাকে অবজ্ঞা করার সুযোগ নেই। বরং তার সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করা প্রত্যেক মুসলমানের নৈতিক দায়িত্ব। অনেক মানুষ নিজের অধীনদের সঙ্গে কঠোর আচরণ করেন। অধস্তন কর্মচারী, গৃহকর্মী কিংবা দরিদ্র মানুষের সঙ্গে কথা বলার সময় তাদের মধ্যে অহংকার প্রকাশ পায়। অথচ একই ব্যক্তি সমাজের প্রভাবশালী মানুষের সামনে বিনয়ী হয়ে ওঠেন। এই দ্বিমুখী আচরণ প্রকৃত চরিত্রের দুর্বলতা প্রকাশ করে।

একজন মানুষের হাতে ক্ষমতা থাকলেই তিনি অন্যের ওপর কর্র্তৃত্ব করার অধিকার পেয়ে যান না। ক্ষমতা মানুষের দায়িত্ব বাড়ায়। অধীনদের অধিকার রক্ষা করা, তাদের সঙ্গে ন্যায়সংগত আচরণ করা এবং তাদের অসুবিধা বোঝার চেষ্টা করাই ক্ষমতার সঠিক ব্যবহার।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং তোমাদের প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (সহিহ বুখারি)

এই হাদিসের শিক্ষা অনুযায়ী পরিবারপ্রধান থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠানের পরিচালক, শিক্ষক কিংবা রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল ব্যক্তি, প্রত্যেকেই নিজ নিজ অবস্থানে জবাবদিহির অধীন। দায়িত্বের অপব্যবহার করে দুর্বল মানুষের ওপর অন্যায় করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

দয়া মানুষের একটি মহৎ গুণ। ইসলাম দয়া ও সহানুভূতিকে মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। যে ব্যক্তি অন্যের কষ্ট অনুভব করতে পারেন, তিনি সাধারণত মানুষের সঙ্গে কোমল আচরণ করেন। অন্যদিকে যার অন্তরে অহংকার ও নিষ্ঠুরতা জায়গা করে নেয়, তিনি সহজেই দুর্বল মানুষের অধিকার উপেক্ষা করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে দয়া করে না, তার প্রতি দয়া করা হয় না।’ (সহিহ বুখারি)

এই হাদিস মানুষের প্রতি দয়াশীল হওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরে। দয়া মানে কেবল কাউকে আর্থিক সাহায্য করা নয়। কারও সঙ্গে সুন্দরভাবে কথা বলা, তার সমস্যার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, ভুল করলে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া এবং বিপদের সময় পাশে দাঁড়ানোও দয়ার অন্তর্ভুক্ত।

দুর্বল মানুষের প্রতি সদাচরণের পাশাপাশি তাদের অধিকার রক্ষা করাও জরুরি। অনেক সময় অসহায় মানুষ প্রতিবাদ করতে পারেন না। নিজের অধিকার সম্পর্কে জানেন না কিংবা অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস পান না। এই সুযোগে কেউ কেউ তাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করেন। ইসলাম এ ধরনের আচরণকে সমর্থন করে না।

পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়ে বলেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা ন্যায়ের ওপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকো আল্লাহর জন্য সাক্ষ্যদাতা হিসেবে, যদিও তা তোমাদের নিজেদের অথবা পিতা-মাতা ও আত্মীয়স্বজনের বিরুদ্ধে হয়।’ (সুরা নিসা ১৩৫)

এই নির্দেশনা থেকে বোঝা যায়, ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত স্বার্থ, আত্মীয়তার সম্পর্ক কিংবা সামাজিক অবস্থানকে প্রাধান্য দেওয়া যাবে না। একজন দুর্বল মানুষ অন্যায়ের শিকার হলে তার পক্ষে ন্যায়সংগত অবস্থান নেওয়া ইমানি দায়িত্বের অংশ।

ইসলাম শ্রমিকের অধিকার রক্ষার প্রতি গুরুত্ব দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) হাদিসে কুদসিতে আল্লাহর পক্ষ থেকে বর্ণনা করেছেন, কেয়ামতের দিন যাদের বিরুদ্ধে আল্লাহ নিজেই বাদী হবেন, তাদের একজন সেই ব্যক্তি, যেকোনো শ্রমিককে কাজে নিয়োগ করে তার কাছ থেকে পূর্ণ কাজ আদায় করেছে, অথচ তার পারিশ্রমিক দেয়নি। (সহিহ বুখারি)

এই হাদিস শ্রমজীবী মানুষের অধিকার সম্পর্কে কঠোর সতর্কবার্তা দেয়। কারও আর্থিক অসচ্ছলতা কিংবা অসহায়ত্বকে কাজে লাগিয়ে তার প্রাপ্য আটকে রাখা গুরুতর অন্যায়।

দুর্বল মানুষের সঙ্গে খারাপ আচরণের পেছনে অন্যতম কারণ হলো অহংকার। মানুষ যখন নিজের সম্পদ, শিক্ষা, পদমর্যাদা কিংবা ক্ষমতা নিয়ে গর্ব করতে শুরু করে, তখন অন্যকে ছোট করে দেখার প্রবণতা তৈরি হয়। সে মনে করে, তার অধীনস্থ কিংবা দরিদ্র মানুষদের সঙ্গে যেকোনো আচরণ করার অধিকার তার রয়েছে।

ইসলাম অহংকারকে নিষিদ্ধ করেছে। কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তুমি মানুষের প্রতি অবজ্ঞাভরে তোমার মুখ ফিরিয়ে নিও না এবং পৃথিবীতে উদ্ধতভাবে চলাফেরা করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো দাম্ভিক, অহংকারীকে পছন্দ করেন না।’ (সুরা লুকমান ১৮)

দুর্বল মানুষের সঙ্গে ভালো আচরণের শিক্ষা পরিবার থেকেই শুরু হওয়া উচিত। সন্তানদের শেখাতে হবে গৃহকর্মী, শ্রমজীবী মানুষ, দরিদ্র প্রতিবেশী কিংবা শারীরিকভাবে অক্ষম ব্যক্তির সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করতে হয়। তাদের সামনে কাউকে অপমান করা কিংবা পেশার কারণে ছোট করে দেখার অভ্যাস তৈরি করা উচিত নয়।

লেখক : ইসলামি গবেষক

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত