শান্তির নামে পাহাড়ে অশান্তির নতুন ছক

সেনাসহ যৌথবাহিনীর সম্মিলিত চেষ্টায় সাজেকসহ পাহাড়ের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলেও হাল ছাড়ছে না সশস্ত্ররা। তারা মোতায়েন রয়েছে পাহাড়ি-বাঙালিসহ সবাইকে তটস্থ রাখা ও জনভোগান্তির চেষ্টায়। এদের উদ্দেশ্য-বিধেয় একদম পরিষ্কার। মুখে বলছে শান্তির কথা, আদতে অশান্তির সব আয়োজন। আওয়াজ দেয় নিরাপত্তার, বাস্তবে তৈরি করে নিরাপত্তাহীনতা। নমুনা কিছুটা ১৯৫১ ও ২০২৩-২৪-এর। একাত্তরে এ বাংলায় অশান্তির হোতা ও আয়োজকদের প্রাতিষ্ঠানিক নাম ছিল শান্তি কমিটি, বাস্তবে করেছে অশান্তি। ২০২৩-২৪ সালে ক্ষমতাসীন দলের লোকেরা বন্দুক, কিরিচ, লাঠি, হাতুড়ি নিয়ে রাস্তায় নেমেছে শান্তি মিছিলের নামে, কিন্তু করেছে নাশকতাসহ যোটো অশান্তি আর পাণ্ডামি। সাজেকসহ পার্বত্যাঞ্চলে নিরাপত্তার দাবির আড়ালেও চলছে সেই অশান্তির অপখেলাই, যার পরতে পরতে অশান্তি ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠার কদাকার গল্প।

সংখ্যাগত দিক থেকে পাহাড়িদের বেশিরভাগই সহজ-সরল, গোবেচারা ধরনের। এর বিপরীতে নেতৃত্ব দেওয়া প্রতিটি গ্রুপই সশস্ত্র এবং সুচতুর। সাধারণ পাহাড়িদের ভয়ভীতিতে ফেলে তটস্থ রাখা, অপহরণ-চাঁদাবাজি, বাধ্যতামূলক শ্রম শোষণ, তাদের সম্পত্তি ধ্বংসের উন্মাদনায় সব গ্রুপই সিদ্ধহস্ত। প্রকাশ্যেই চলছে তাদের যত দুর্ধর্ষপনা। বিশেষ করে তাদের আন্দোলনের অন্যতম দাবি প্রতিপক্ষ সশস্ত্র সংগঠনকে এলাকা থেকে সরিয়ে দেওয়ার সাথে সাধারণ মানুষকে নিরাপত্তাহীন করার পাশাপাশি নিজেদের একচ্ছত্র প্রভাব কায়েমের চেষ্টা মারাত্মক প্রশ্নবোধক। ইউপিডিএফ (প্রসীত) মাঝেমধ্যে অন্যদের ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ২০০৭ সালের পর থেকে সাজেক ও বাঘাইছড়ির বিভিন্ন এলাকায় অপহরণ, চাঁদাবাজিতে অনেকটা অপ্রতিদ্বন্দ্বী। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি-জেএসএস-সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যদের অবিলম্বে এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া, স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ তিন দফা দাবিতে সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশনের সাম্প্রতিক অ্যাকশনের কিছু ভিন্ন বৈশিষ্ট্য খেয়াল করার মতো।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সতর্ক অবস্থানের কারণে তারা কিছুটা পিছু হটেছে। অবরোধকালে মূল সড়কে উঠতে না পারায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বিক্ষিপ্তভাবে অবরোধে উসকানি দেয়, কিন্তু হাল ছাড়ে না। তাদের গ্রাউন্ড ওয়ার্ক ব্যাপক। সাম্প্রতিক এ উত্তেজনাকর অবস্থার হোমওয়ার্কও অনেক দিনের। এরই এক পর্যায়ে গত ২১ অক্টোবর খাগড়াছড়ির পাহাড়ি ৭ জনকে অস্ত্রের মুখে অপহরণ করা হয়। এর আগে ১০ জুন প্রসীত গ্রুপের এ সদস্যরা সাজেক ইউনিয়নের কালুছড়া এলাকায় ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের ৫ কৃষকের প্রায় ৮ শ মণ শুকনা হলুদ পুড়িয়ে দেয়। গেল বছরের ১২ জুন তুলে নিয়ে যায় সাজেকের বিভিন্ন পাড়ার ১৯ গ্রামবাসীকে। দুদিন আটকে রেখে কিছু টাকা আদায় করে মুক্তি দেয়। ৭ অক্টোবর দক্ষিণ দাঁড়িপাড়া থেকে তুলে নেয় জুমচাষি চন্দক চাকমাকে। চাঁদা দিতে না পারায় মারধর করে ভূবনময় ত্রিপুরা ও সাধনপ্রিয় চাকমাকে। সেই ধারাবাহিকতায় সাজেকের স্থানীয় কৃষকদের বাধ্য করছে কম দামে আদা, হলুদ, মরিচ, তিল বেচতে। বিনা পারিশ্রমিকে সাধারণ পাহাড়িদের বাধ্য করছে জমি পরিষ্কার, চাষাবাদ, ফসল তোলা এবং পরিবহন করতে। এ কাজে রয়েছে ইউপিডিএফের কয়েকজন কমান্ডার। ২০২৫ সালের অক্টোবরে তো নীরবে-নিশব্দে এক মাস ধরে সাজেকের অন্তত ২০টি গ্রামে কায়েম করে চাল, ডাল, তেল পরিবহনে নিষেধাজ্ঞা। এরাই আজকের প্রেক্ষাপটে এসে স্থানীয় জনসাধারকে বাধ্য করছে তাদের ডাকা, মিছিল, মিটিংয়ে শরিক থাকতে, অবরোধে অংশ নিতে। অনুপস্থিত থাকলে মাথাপিছু এক হাজার টাকা জরিমানার হুমকিও দেয়। পর্যটকরা পর্যায়ক্রমে তাদের বিশেষ টার্গেট।

২২ অক্টোবর সাজেকে সড়ক অবরোধে আটকা পড়ে সাড়ে ৩ হাজারের মতো পর্যটক। পর্যটকদের লক্ষ্য করে গুলিও ছোঁড়ে। পর্যটননির্ভর ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিক এবং স্থানীয়দের অর্থনৈতিক ক্ষতি ও নিরাপত্তাহীনতাকে একদিকে অবধারিত করছে, অন্যদিকে নিজেদের সুরক্ষায় মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে স্থানীয়দের। অসহায়ত্বই যেন নিয়তি তাদের। এর ফাঁকে কিছু ভিন্ন ঘটনাও রয়েছে। মাঠ দাবড়ানো পক্ষগুলোর অভিযোগের ভাঁজে ভাঁজেও নানা ফের ও স্বার্থ। সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন ও সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ঘোষিত দাবির শীর্ষে রয়েছে জেএসএসের (সন্তু লারমা) সশস্ত্র সদস্যদের এলাকা থেকে সরিয়ে দেওয়া। জেএসএসের কে সশস্ত্র, আর কে নিরস্ত্র তার মানদণ্ড নেই। দাবি উত্থাপনকারীরাও কি নিরস্ত্র?—এ প্রশ্নের জবাব দিবালোকে স্পষ্ট। প্রতিপক্ষের অস্ত্রকে অবৈধ দাবি করে নিজেদের অস্ত্রকে বৈধতা দেওয়ার এ চেষ্টা কেবল হাস্যকর নয়, ধৃষ্টতাও। একইভাবে চলছে প্রতিপক্ষের চাঁদাবাজির প্রতিবাদ, নিজেদের চাঁদাবাজিকে হালাল করার চেষ্টা। এ নিয়ে বেশি বিশ্লেষণ দরকার করে না। তাদের দাবি সত্যিকার অর্থে স্থানীয়দের সুরক্ষায়? নাকি নিজেদের মতো অস্থিরতা-অশান্তি পাকাপোক্ত করা? সাজেক বা পাহাড়ি-বাঙালিকে জিম্মি তথা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলার কোনো তৎপরতাকে আন্দোলন বলা যায় না। পাহাড়কে অশান্ত করে গোটা দেশকে চাপে রাখার এ অপচেষ্টা বুঝতে খুব বুদ্ধিমত্তা জরুরি নয়। ভাবনমুনাই বলে দিচ্ছে আন্দোলন-অবরোধের নামে চালানো এ অপতৎপরতার রহস্য। হতে হতে অনেক হয়েছে, বেলা অনেক গড়িয়েছে। চরম অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে পাহাড়কে বারবার অশান্ত করার এ অপচেষ্টা আর চলতে দেওয়া যায় না। সাদা চোখে দেখলে মনে হয় যে, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বেশিরভাগই অশান্তির জন্য দায়ী। আসলে মোটেই তা নয়, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বিপুল অংশ শান্তি চায়। সবুজ পাহাড়, মেঘের ভেলা আর ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সংস্কৃতির বৈচিত্র্যময় রূপে গড়া প্রকৃতির দান দেশের পার্বত্য ৩ জেলা—রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানকে কিছু মহলের শিকার থেকে রক্ষা করতেই হবে।

স্বাধীনতার পর থেকেই বিভিন্ন সময়ে রক্তক্ষয়ী সংঘাত, সহিংসতা এবং জাতিগত বিরোধ এ অঞ্চলের শান্তিকে বিঘ্নিত করেছে। অথচ সব অপতৎপরতাই চালানো হয় শান্তির নামে। এর পেছনে ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং ভূরাজনৈতিক জটিলতা কাজ করছে মারাত্মকভাবে। এর একটা অবসান ঘটাতে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর তৎকালীন সরকার এবং পাহাড়ের সশস্ত্র গোষ্ঠী শান্তিবাহিনীর রাজনৈতিক সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস)-এর মধ্যে ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে দেশের বাইরে থেকেও ষড়যন্ত্র কম হচ্ছে না। গত শতাব্দীর দুই দশক ধরে ভারত শান্তিবাহিনীকে সরাসরি ও পরিপূর্ণ পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে এ পার্বত্য চট্টগ্রামকে অশান্ত রেখেছিল। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার দেড় বছরের মাথায় একটি চুক্তিনামার মুসাবিদা দিয়েছে ভারত। বলা হয়েছিল পাহাড়ের দীর্ঘদিনের জাতিগত সংঘাতের অবসান ঘটবে, বাস্তবটা বড় নিদারুণ। শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের এক বছরের মধ্যেই এ চুক্তির বিরোধিতা করে গঠন হয় ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট বা ইউপিডিএফ নামে উপজাতীয় একটি সশস্ত্র দল।

চুক্তির পক্ষের জনসংহতি সমিতি বা জেএসএসের সঙ্গে ইউপিডিএফের রক্তক্ষয়ী সংঘাত শুরু হয় তখন থেকেই। এ রক্তক্ষয়ী সংঘাতে দুই দলের পাঁচ শতাধিকও বেশি নেতাকর্মী নিহত হয়। ব্যক্তিস্বার্থ ও ভাগবাটোয়ারা নিয়ে এ দুই দলের নেতাকর্মীদের ভেতর অন্তর্দ্বন্দ্বও শুরু হয়ে যায়, যার জেরে ২০১০ সালে জেএসএস ভেঙে গঠিত হয় জেএসএস (লারমা) নামের নতুন দল। এরপরেই শুরু হয় ত্রিমুখী সংঘর্ষ। পরবর্তী পাঁচ বছরে এ তিন দলের আরও প্রায় চার শতাধিক নেতাকর্মী নিহত হয়েছে। মতপার্থক্য ও দ্বন্দ্বের এখানেই শেষ নয়, ২০১৭ সালে ইউপিডিএফ ভেঙে ‘ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক’ নামের নতুন আরেকটি দলের আত্মপ্রকাশ ঘটে। আলাদা হওয়ার পর ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক দল জেএসএস (লারমা)-এর সঙ্গে জোট বেঁধে মূল ইউপিডিএফ এবং জেএসএস উভয় দলের বিরুদ্ধে সশস্ত্র তৎপরতা শুরু করে দেয়। ফলে পাহাড়ে আরও সংঘাত শুরু হয়ে যায়। এবার ইউপিডিএফ মূল দল ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক দলকে সহায়তার জন্য জেএসএস (লারমাকে) দোষারোপ করে। ফলে ২০১৭ সাল থেকে শুরু হয় চতুর্মুখী সংঘাত, যা আজও চলমান। দুর্ভাগ্যজনকভাবে শান্তিচুক্তিতেও বাঙালিদের বিষয়ে কিছু উল্লেখ ছিল না। চুক্তিতে এমন কিছু ধারা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যা নাগরিক হিসেবে বাঙালিদের মৌলিক অধিকার হরণ করেছে। পাহাড়ে বাঙালিদের জমি ক্রয় ও বসতি স্থাপনে বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে, যা সংবিধানপ্রদত্ত নাগরিক মৌলিক অধিকারের পরিপন্থি। বাংলাদেশ সংবিধানের তৃতীয় ভাগ ‘মৌলিক অধিকার’-এর ৩৬ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘আইন মোতাবেক দেশের সর্বত্র অবাধ চলাফেরা, এর যেকোনো স্থানে বসবাস ও বসতি স্থাপন করার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকবে’।

অন্যদিকে ২৬ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘মৌলিক অধিকারের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো আইন করা যাবে না। আর যদি করা হয়, তবে তা স্বতঃসিদ্ধভাবে বাতিল হয়ে যাবে। মৌলিক অধিকারের পরিপন্থি সব আইন সাংবিধানিকভাবে অবৈধ বলে বিবেচিত হবে।’ এ ক্ষেত্রে শান্তিচুক্তিতে পাহাড়ে বসবাস এবং বসতি স্থাপন থেকে বাঙালিদের বঞ্চিত করে সংবিধান লঙ্ঘন করা হয়েছে। এ ধরনের কিছু মৌলিক বিষয় অমীমাংসিত থাকায় শান্তিচুক্তি অনুযায়ী দীর্ঘদিন আগে ভূমি কমিশন গঠন করে এতদসংক্রান্ত আইন প্রণয়ন এবং সে আইন নিয়ে পাল্টাপাল্টি তর্ক-বিতর্কের পর পুনঃসংশোধন করেও ভূমি সমস্যার সমাধান সম্ভব হয়নি। এর জের টানতে হচ্ছে। পাহাড়ের শান্তি কেবল ওই অঞ্চলের মানুষের জন্যই নয়, সমগ্র বাংলাদেশের অখণ্ডতা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্যই জরুরি। প্রায় আড়াই দশকেও আঞ্চলিক পরিষদের নির্বাচন, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং পাহাড়িদের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিতের মতো চুক্তির মৌলিক ধারাগুলো বাস্তবায়ন হয়নি। এর বিপরীতে স্বায়ত্তশাসনের নামে বিভিন্ন গ্রুপের অপশাসন আরও বেশি ভর করেছে। সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যকার অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং আধিপত্য বিস্তারের লড়াইও মাত্রা পেয়েছে। একসময়ের একক সংগঠন পিসিজেএসএস ভেঙে বর্তমানে ইউপিডিএফ, পিসিজেএসএস (এমএন লারমা), ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) এবং অতি সাম্প্রতিক কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের মতো একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে। এলাকাভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি এবং রাজনৈতিক আধিপত্য ধরে রাখতে এই সংগঠনগুলো প্রতিনিয়ত নিজেদের মধ্যে ভ্রাতৃঘাতী রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে। সাধারণ পাহাড়িদের একাংশকে সামরিক উপস্থিতির বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেওয়ার ঘটনা তো রয়েছেই, যার ফলে স্থানীয় জনগণের সাথে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মধ্যে কল্পিত ও মিথ্যা একটি মনস্তাত্ত্বিক ও প্রশাসনিক দূরত্ব তৈরি হয়েছে।

পাহাড়ের অশান্তির গভীরে বিশাল সংঘাতকেন্দ্রিক অর্থনীতিও একটা ফ্যাক্টর। দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলগুলোকে পুঁজি করে সেখানে কাঠ পাচার, অবৈধ অস্ত্র ব্যবসা, মাদক চোরাচালান এবং ট্যুরিজম স্পট ও সীমান্ত বাণিজ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার এক নীরব প্রতিযোগিতা চলে। বিভিন্ন সশস্ত্র গ্রুপ ও স্বার্থান্বেষী মহলের আয়ের মূল উৎস পাহাড়ের এই ছায়া অর্থনীতি ও চাঁদাবাজি। শান্ত পরিবেশ থাকলে এই অবৈধ আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাবে, তাই একটি নির্দিষ্ট চক্র সবসময়ই পাহাড়কে অশান্ত রাখতে চায় এবং সাধারণ পাহাড়ি ও প্রশাসনের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি ও বৃদ্ধির সর্বোচ্চ চেষ্টা করে থাকে। পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত কৌশলগত ও সংবেদনশীল। এর সাথে ভারত ও মায়ানমারের সীমান্ত যুক্ত। ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের এই ট্রাই-জাংশন (তিন দেশের সীমান্ত অঞ্চল)-কে অশান্ত রাখতে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির একটা গোপন খেলা সবসময়ই সক্রিয় থাকে। মায়ানমারের অস্থিরতা, ওপার সীমান্তের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর তৎপরতা এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে কোনো কোনো বিদেশি শক্তির প্রচ্ছন্ন মদদও পাহাড়ের এই আগুনে বাতাস ছিটানো হয়। ব্যাপক মাত্রায় তা এবারও হয়েছে এবং চলমান। তাই পার্বত্য চট্টগ্রাম বা পাহাড় অশান্ত থাকলে লাভ কার—এ প্রশ্নের জবাব অত্যন্ত জটিল এবং বহুমুখী হলেও তা নতুন প্রেক্ষাপটে নতুন করে ভাবা জরুরি।

লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট, ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন