বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত তিন পা র্বত্য জেলা—খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান। পুরো অঞ্চলটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর। কিন্তু এই সৌন্দর্যের আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও সামাজিক বৈষম্যের এক জটিল বাস্তবতা বিরাজ করছে। এই অঞ্চলে বসবাসরত বাঙালি ও উপজাতি জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় সমান। কিন্তু রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ও সুযোগের বণ্টনে এক চরম অসম চিত্র দেখা যায়। প্রশাসনিক সুযোগ-সুবিধা, স্থানীয় নেতৃত্ব, সরকারি চাকরি, জমি কেনাবেচার অধিকার ও ব্যবসা-বাণিজ্যের কর কাঠামো—সবক্ষেত্রেই বাঙালিরা ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ছে। একটি বৈষম্যহীন, ন্যায্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তোলাই এই নিবন্ধের মূল উদ্দেশ্য।
৩৬ বছর ধরে নির্বাচন নেই জেলা পরিষদে
একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি হলো স্থানীয় সরকার নির্বাচন। অথচ পার্বত্য জেলা পরিষদে সর্বশেষ নির্বাচন হয়েছিল ১৯৮৯ সালে। গত ৩৬ বছর ধরে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানটি কোনো জনাদেশ ছাড়াই সরকারের সরাসরি মনোনয়নে পরিচালিত হয়ে আসছে।
পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন অনুযায়ী, এখানকার স্থায়ী বাসিন্দাদের জন্য আলাদা ভোটার তালিকা তৈরি করার একটি বিধান রাখা হয়েছে। কিন্তু গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের মূল চেতনার সাথে এই পৃথক ভোটার তালিকার বিধানটি সরাসরি সাংঘর্ষিক।
এই পৃথক ভোটার তালিকার অজুহাত দেখিয়েই দীর্ঘ দিন ধরে এখানে প্রত্যক্ষ ভোট বন্ধ রাখা হয়েছে। সরকার নিজেদের পছন্দের লোক বসিয়ে মনোনীত অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিষদ পরিচালনা করছে। জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদটি আইনগতভাবে কেবল উপজাতি প্রার্থীদের জন্য সংরক্ষিত। কিন্তু জনসংখ্যার অনুপাতে বাঙালিদের জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট আসন নির্ধারিত রাখা হয়নি। এর ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসংখ্যা হওয়া সত্ত্বেও বাঙালিরা স্থানীয় নেতৃত্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
একমুখী নিয়ন্ত্রণ ও প্রশাসনিক বৈষম্য
পাহাড়ের প্রধান প্রধান প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে একমুখী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। পার্বত্য মন্ত্রণালয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ, তিনটি পার্বত্য জেলা পরিষদ, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড এবং ভারত প্রত্যাগত শরনার্থী ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু নির্দিষ্টকরণ ও পূনর্বাসনবিষয়ক টাস্কফোর্স—এই ৭টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে কেবল উপজাতি সম্প্রদায় থেকেই মনোনয়ন দেওয়া হচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি (তথাকথিত শান্তিচুক্তি) এবং সংশ্লিষ্ট আইনের সুযোগ নিয়েই এই প্রশাসনিক একচেটিয়াপনা তৈরি করা হয়েছে।
একইভাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডেও ইতিহাসজুড়ে উপজাতি সম্প্রদায়কেই প্রাধান্য ও অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। ব্যতিক্রম হিসেবে কেবল খাগড়াছড়ির সাবেক সংসদ সদস্য আবদুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া একবার বাঙালি জনপ্রতিনিধি হিসেবে এই বোর্ডের চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব পেয়েছিলেন।
পাহাড়ের সবচেয়ে সংবেদনশীল ও বড় সংকট হলো ভূমি বিরোধ। অথচ এই ভূমি বিরোধ সমাধানের জন্য গঠিত ‘ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনে’ কোনো বাঙালি প্রতিনিধি রাখা হয়নি। অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বাধীন এই কমিশনে সরকারি কর্মকর্তা ও আমলাদের বাইরে বাকি সব সদস্যই উপজাতি সম্প্রদায়ের।
অথচ ২০২২ সালের সরকারি জনশুমারি ও গৃহগণনার অফিশিয়াল তথ্য অনুযায়ী এই তিন জেলার বাস্তব পরিসংখ্যান হলো—খাগড়াছড়ি জেলায় বাঙালি ৫১.০৮শতাংশ, উপজাতি ৪৮.৯২শতাংশ। রাঙামাটি জেলায় বাঙালি ৪২.৪২শতাংশ উপজাতি ৫৭.৫৮শতাংশ এবং বান্দরবান জেলায় বাঙালি ৫৮.৮৫শতাংশএবং উপজাতি ৪১.১৫শতাংশ।
এই জনশুমারির উপাত্ত থেকে স্পষ্ট দেখা যায়, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলায় বাঙালিরা স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠ। আর সার্বিকভাবে তিন জেলা মিলিয়ে দুই জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় সমান (বাঙালী ৫১:৪৯ উপজাতী)। এতদসত্ত্বেও স্থানীয় নীতি-নির্ধারণী মূল নেতৃত্বে বাঙালিদের অংশগ্রহণ প্রায় শূন্যের কোঠায়। এর ফলে স্থানীয় বাঙালি জনগোষ্ঠীর মনে দীর্ঘদিনের চরম ক্ষোভ ও বঞ্চনাবোধ জমা হচ্ছে।
ভূমি অধিকার ও জমি কেনাবেচায় বাধা
পার্বত্য চট্টগ্রামে জমি ক্রয়-বিক্রয় ও হস্তান্তরের ক্ষেত্রে এক কঠোর নিয়ম চালু রয়েছে। এখানে 'স্থায়ী বাসিন্দা সনদ' ছাড়া কোনো নাগরিক জমি কিনতে পারেন না। আর এই স্থায়ী বাসিন্দার সনদ দেওয়ার সম্পূর্ণ এখতিয়ার দেওয়া হয়েছে ৩ সার্কেল চিফ (যাদের কথিত রাজা বলা হয়), হেডম্যান ও ইউপি চেয়ারম্যানদের হাতে। এঁদের প্রায় সকলেই উপজাতি সম্প্রদায়ের সদস্য। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ বাঙালিদের ওপর। তাঁরা নিজ দেশের অংশ হওয়া সত্ত্বেও জমি কেনার সাংবিধানিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অথচ দেশের অন্য যেকোনো প্রান্তে উপজাতি নাগরিকেরা কোনো বাধা ছাড়াই জমি, বাড়ি বা সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয় করতে পারছেন। এক রাষ্ট্রে এই দ্বৈত নিয়ম সমতার নীতির স্পষ্ট লঙ্ঘন।
কর নীতিতে চরম আর্থিক বৈষম্য
পাহাড়ের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় সবচেয়ে বড় অসমতা দৃশ্যমান হয় আয়করের ক্ষেত্রে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) কর বিধির অস্পষ্টতা ও ব্যবস্থার কারণে উপজাতি ব্যবসায়ীদের কোনো প্রকার আয়কর দিতে হয় না। অথচ একই বাজারে সমপরিমাণ ব্যবসা করে বাঙালি ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে ৭ শতাংশ পর্যন্ত আয়কর জমা দিতে হয়।
বিষয়টি একটি বাস্তব উদাহরণের মাধ্যমে বোঝা সম্ভব। ধরুন, ১ কোটি টাকার একটি সরকারি উন্নয়ন বা ঠিকাদারি কাজ সম্পন্ন হলো। সেখানে নিয়ম অনুযায়ী একজন বাঙালি ঠিকাদারকে লাখ লাখ টাকা আয়কর রাজস্ব হিসেবে দিতে হয়। কিন্তু একই কাজ সম্পন্ন করে উপজাতি ঠিকাদার এই কর দেওয়া থেকে পুরো ছাড় পান। এর ফলে বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে সুস্থ প্রতিযোগিতা নষ্ট হচ্ছে। বাঙালি উদ্যোক্তারা অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়ছেন এবং রাষ্ট্রও বিপুল পরিমাণ ন্যায্য রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
নিয়োগে কোটা বৈষম্য
পার্বত্য জেলা পরিষদগুলোর অধীনে বিভিন্ন স্থানীয় বিভাগে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর সরকারি চাকরিতে জনসংখ্যার অনুপাত মানা হচ্ছে না। জনসংখ্যার সুষম বিন্যাস থাকা সত্ত্বেও নিয়োগের ক্ষেত্রে বাঙালিদের জন্য রাখা হয়েছে মাত্র ৩০ শতাংশ কোটা। বাকি ৭০ শতাংশ কোটাই বরাদ্দ দেওয়া হয় উপজাতি প্রার্থীদের জন্য।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০০২ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত বিএনপি সরকারের মেয়াদে এই নিয়োগে বাঙালি ও উপজাতি অনুপাত ৪৮:৫২ বজায় রেখে একটি ভারসাম্য রাখা হয়েছিল। কিন্তু ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর সেই ভারসাম্য আবার নষ্ট করে দেওয়া হয়। এর ফলে স্থানীয় শিক্ষিত বাঙালি তরুণদের একটি বিশাল অংশ যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও চাকরি পাচ্ছে না এবং বেকারের খাতায় নাম লেখাচ্ছে।
যদিও সম্প্রতি আইন মন্ত্রণালয়ের মতামতেরপর এ চিত্র বদলে সারা দেশের ন্যায় মেধাভিত্তিক নিয়োগ হবে বলে আশা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অবৈধ অস্ত্র ও চাঁদাবাজি
পার্বত্য চট্টগ্রামের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য অবৈধ সশস্ত্র সংগঠনগুলোর অপতৎপরতা সবচেয়ে বড় হুমকি। অতীতে পাহাড়ের চাঁদাবাজি মূলত প্রধান সড়ক বা দূরপাল্লার পরিবহনে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু বর্তমানে তা স্থানীয় ছোট বাজার, সাধারণ দোকানপাট, কৃষকের কৃতি ফসল বিক্রি এবং সাধারণ মানুষের দৈনিক উপার্জনের ওপর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। এই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, অবৈধ অস্ত্রধারীদের অপতৎপরতা ও চাঁদাবাজি দমাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তথা সেনাবাহিনীর জোরালো উপস্থিতি এবং অভিযান পরিচালনা করা অপরিহার্য।
কিছু প্রস্তাবনা ও দাবি
১. নির্বাচন পরিচালনা: বর্তামান বিদ্যমান জাতীয় ভোটার তালিকার ভিত্তিতে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদে অবিলম্বে সরাসরি গণতান্ত্রিক নির্বাচনের আয়োজন করতে হবে। যেহেতু এই তালিকার ভোটাররা এমপি-মন্ত্রী তথা সরকার গঠনের ভোট দিয়ে থাকেন। তবে কেনো পার্বত্য পরিষদগুলোর ভোটে অংশ নিতে প্রতিবন্ধকতার অযুহাত?
২. নেতৃত্বে সমতা: জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক চেয়ারম্যান পদ কেবল একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের জন্য নির্দিষ্ট না রেখে সবার জন্য উন্মুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে জনসংখ্যার অনুপাতে পদ নিশ্চিত করতে ভাইস-চেয়ারম্যানের পদ সৃষ্টি করতে হবে।
৩. ভূমি কমিশনে প্রতিনিধিত্ব: ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনে তিন পার্বত্য জেলা থেকে জনসংখ্যার অনুপাতে (অন্তত তিনজন) বাঙালি সদস্য যুক্ত করতে হবে।
৪. সুনির্দিষ্ট কর নীতি: জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (NBR) অবিলম্বে পার্বত্য অঞ্চলের জন্য একটি স্পষ্ট কর নীতিমালা তৈরি করতে হবে। আয়করের ক্ষেত্রে উপজাতি ও বাঙালি সকলের জন্য সমান নিয়ম চালু করতে হবে।
৫. এনআইডি ভিত্তিক জমি হস্তান্তর: জাতীয় পরিচয়পত্রের (NID) ভিত্তিতে দেশের অন্যান্য অংশের মতো এখানেও জমি কেনাবেচার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
৬. নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও অস্ত্র উদ্ধার: পাহাড়ে যৌথ বাহিনীর মাধ্যমে চিরুনি অভিযান চালিয়ে সব অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করতে হবে এবং চাঁদাবাজি বন্ধে সেনাবাহিনীর অভিযান জোরদার করতে হবে।
পরিশেষে বলতে চাই—একটি স্বাধীন দেশে একই সাথে দুটি আলাদা নিয়ম চলতে পারে না। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি ও বাঙালি—উভয় জনগোষ্ঠীই এই দেশের সমান নাগরিক এবং এই মাটির সন্তান। উপজাতি ভাই-বোনদের সুবিধা বা অধিকার বাতিলের পক্ষে নই; কেবল রাষ্ট্রীয় বৈষম্য ও একতরফা ব্যবস্থার অবসান হওয়া প্রয়োজন। নয়তো বরাবরের মতো প্রশ্ন থেকেই যাবে—পার্বত্য চট্টগ্রামে বৈষম্য; ন্যায়ের প্রশ্নে রাষ্ট্রীয় নীরবতা কেন?
মনে রাখা দরকার—পাহাড়ে বসবাসরত সব মানুষ সমান মর্যাদা, সুরক্ষা ও অধিকার নিয়ে বাঁচুক। এক শ্রেণীকে বৈষম্যের মধ্যে রেখে অন্য শ্রেণীকে অতিরিক্ত সুবিধা দেওয়ার নীতি কখনোই দীর্ঘস্থায়ী শান্তি আনতে পারে না। বৈষম্যমূলক আইন ও নীতিগুলো দ্রুত সংশোধন করে পাহাড়ে ন্যায়ের শাসন ও গণতান্ত্রিক চর্চা প্রতিষ্ঠা করা এখন সময়ের দাবি।
---
লেখক: এ এইচ এম ফারুক
সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
ইমেইল: [email protected]