আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে মধ্যপ্রাচ্য গুরুত্বপূর্ণ অর্থ বহন করে। সম্ভবত একে কেন্দ্র করে প্রতিনিয়ত আবর্তিত হচ্ছে বিশ্বরাজনীতির মঞ্চ। বর্তমানে বিশ্বরাজনীতির প্রাণকেন্দ্র হলো মধ্যপ্রাচ্য। বলাবাহুল্য, অতীতেও এটা ছিল। মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ এবং শক্তিশালী দেশ, সৌদি আরব ও ইরান। ক্ষমতার দিক থেকে, দুই দেশের দ্বন্দ্ব অনেক দিনের। প্রভাব বিস্তারের রাজনীতি বা মোড়লিপনার রাজনীতিতে দুই দেশের কেউ পিছিয়ে নেই। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক ক্ষেত্রে দ্রুত উন্নতি ও শক্তি অর্জন করায় আমিরাত মধ্য পূর্বাঞ্চলের রাজনীতি এবং জিওপলিটিকসে এক অপরিহার্য খেলোয়াড় হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক রাজনীতিতে ‘রিজিওনাল পাওয়ার’ কেন্দ্রিক প্রতিযোগিতায় সৌদি আরবের প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ার চেষ্টা করছে। রয়টার্স জানিয়েছে, গতকাল ইরানের সঙ্গে বৈঠক করতে তেহরান গেছেন সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের শীর্ষ কর্মকর্তারা। আঞ্চলিক সংঘাতের মধ্যে সৌদি আরব গভীরভাবে জড়ানোর পর, ইরানের সঙ্গে তাদের প্রথম উচ্চপর্যায়ের বৈঠক এটি। সৌদি আরবে ইরান-সমর্থিত হুতিদের সাম্প্রতিক হামলা ইয়েমেন যুদ্ধকে নতুন মোড়ে নিয়ে এসেছে। কিন্তু এটি কোনোভাবেই হুতিদের স্বার্থরক্ষা করবে না। তারপরও হুতিরা সৌদি আরবে হামলা চালাচ্ছে মূলত যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এই অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়াতে ইরানের যে পরিকল্পনা, তা বাস্তবায়নের জন্য। হুতিদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের আঞ্চলিক সামরিক অভিযান যদি সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট এবং ইয়েমেন সরকারের অভ্যন্তরীণ বিভেদ ও মতপার্থক্য মেটাতে ব্যর্থ হয়, তবে হুতিদের বিরুদ্ধে তাদের অগ্রযাত্রা অনেকটা থমকে যাবে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে হুতি যোদ্ধারা কেবল নিজেদের অবস্থান শক্ত করবে না, বরং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ তাইজ শহরের ওপর চাপ বাড়াবে এবং সৌদির বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে ধারাবাহিক হামলা চালাবে। প্রতিরক্ষা খাতে অস্বাভাবিক খরচ বেড়ে যাওয়ার ফলে, তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা কঠিন হবে। যেহেতু সৌদি আরব এই অঞ্চলের অর্থনীতির চালিকাশক্তি, তাই পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনীতিতে এর তীব্র নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তা ছাড়া হুতিদের কাছে ভূখণ্ড হাতছাড়া হওয়ার অর্থ হলো হরমুজ প্রণালির সংকট অব্যাহত থাকা, যা মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি রপ্তানি ব্যাহত করবে।
হুতিদের হামলাকে শুধু আঞ্চলিক সংকট হিসেবে দেখলে চলবে না, এটি বড় ধরনের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধাক্কার পূর্বাভাস হতে পারে। এ ঘটনার চূড়ান্ত পরিণতি নির্ভর করবে পাল্টা আক্রমণের মাত্রা, কূটনৈতিক উদ্যোগের সফলতা এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সংযমের ওপর। সৌদি আরব ও ইয়েমেনের যুদ্ধে জড়িত থাকা, হুতিদের আধুনিক সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ভিন্ন ধরনের জটিল পরিস্থিতি তৈরি করেছে। রয়টার্স জানিয়েছিল, লোহিত সাগর উপকূলের কাছে হুতিরা এগিয়ে এলে সৌদি আরব ইয়েমেনে সামরিক উপস্থিতি বাড়ায়। এর ফলে সৌদি শহর, বিমানবন্দর ও জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর বড় হুমকি তৈরি হয়। গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, সৌদি আরবের অর্থনীতি ও নিরাপত্তার মূল ভিত্তি হলো বিমানবন্দর, তেলক্ষেত্র, বন্দর ও পরিবহনকেন্দ্র। এসব জায়গায় আঘাত এলে, যাতায়াত ও বাণিজ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, যা দেশটির বিশাল ক্ষতি করবে। কিন্তু তারা যদি বেশি মাত্রায় প্রতিশোধ নিতে যায়, তবে হুতিরা আরও হামলা চালাবে। এতে যুদ্ধের পরিধি বাড়বে এবং ইয়েমেনের সাধারণ মানুষের কষ্ট আরও গভীর হবে।
সৌদি আরব, পাকিস্তান, তুরস্ক ও মিসর যৌথভাবে হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তারা সৌদি আরবের আত্মরক্ষার অধিকারকে সমর্থন দিয়েছে। এই দেশগুলো সম্মিলিত প্রতিরক্ষাব্যবস্থা জোরদার করতে সম্মত হয়েছে। তবে সহায়তার সীমা কতটুকু হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। এ হামলাকে বিশ্বরাজনীতির বড় প্রেক্ষাপটে দেখা দরকার। মধ্যপ্রাচ্যে নিজের অবস্থান ধরে রাখা এবং জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সৌদি আরব গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। বারবার হামলা হওয়ায় ওয়াশিংটনের ওপর চাপ বাড়ছে, যেন তারা সৌদি আরবকে সামরিক ও গোয়েন্দা সহায়তা বাড়িয়ে দেয়। প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধ না করেও হুতিদের থামাতে পারবে কি না। এদিকে হুতিদের সঙ্গে ইরানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকলেও, তাদের প্রতিটি সিদ্ধান্ত সরাসরি তেহরান নিয়ন্ত্রণ করে, তা বলা যায় না।
হুতিদের নিজস্ব রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও কৌশল রয়েছে। ইরানের জন্য সৌদি আরবের তেলব্যবস্থা এবং লোহিত সাগরে বিঘœ ঘটাতে পারা একটি রাজনৈতিক সুবিধা হতে পারে। কিন্তু এর ফলে যদি পুরো অঞ্চলে বড় যুদ্ধ বেধে যায়, তবে ইরানকেও তার মাশুল দিতে হবে। তাই ইরান কতটুকু সাহায্য করছে, তাদের প্রভাব কতটুকু এবং হুতিরা কতটা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে এই তিন বিষয় আলাদাভাবে বিচার করতে হবে। রিয়াদ, ইসলামাবাদ, আঙ্কারা ও কায়রোর যৌথ পদক্ষেপ আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য তাৎপর্যপূর্ণ।
সৌদি আরবের প্রতিটি নিরাপত্তা সংকটের ঝুঁকি যুক্তরাষ্ট্র নেবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। হুতিদের শক্তির জায়গা এখানে। অর্থ, অস্ত্র ও সামরিক সক্ষমতায় তারা সৌদি আরবের ধারেকাছেও নেই। কিন্তু অসম যুদ্ধের সুবিধা তাদের পক্ষে। একটি সস্তা ড্রোন ঠেকাতে ব্যয়বহুল ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে হয়। একটি পাইপলাইনে সফল হামলাই বিপুল তেল রপ্তানি ব্যাহত করতে পারে। কোনো ট্যাংকার না ডুবিয়েও জাহাজ হামলার বিশ্বাসযোগ্য হুমকি বীমার খরচ বাড়িয়ে দিতে পারে। বাব আল-মানদেবের মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ সাময়িকভাবে অচল হলে, এর অভিঘাত ছড়িয়ে পড়বে বিশ্ববাণিজ্যে। আসল বিষয় হলো, হুতিরা সৌদি আরবের এমন এক দুর্বলতা সামনে এনেছে, যার সমাধান শুধু অর্থ, অস্ত্র কিংবা উন্নত সামরিক প্রযুক্তি দিয়ে সম্ভব নয়। সৌদি আরব হুতিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জিততে পারে। কিন্তু সংঘাতের কৌশলগত সমীকরণ বদলাতে না পারলে, হুতিদের হয়তো যুদ্ধ জেতার প্রয়োজনই হবে না।
লেখক : গবেষক ও কলাম লেখক, লন্ডন
raihan567@yahoo.com