অবক্ষয় রোধে শিক্ষা হোক যুগোপযোগী

আপডেট : ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৫৮ এএম

শিক্ষা এবং সভ্যতা একে অপরের পরিপূরক। শিক্ষার মাধ্যমে সভ্যতার বিকাশ ঘটে- এ কথা যেমন সত্য, কোনো কোনো ক্ষেত্রে সভ্যতার বিনাশেরও কারণ হতে পারে শিক্ষা। বিষয়টা অনুধাবন করা সহজ। প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে অর্জিত জ্ঞান-বিজ্ঞান যেমন মানবকল্যাণে অনেক অনাবৃত সম্ভাবনাকে উন্মোচন করতে পারে, একইভাবে উচ্চশিক্ষা লব্ধ অনেক জ্ঞান, বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং সংঘাতের কারণ হতে পারে। বিশ্বজুড়ে ক্ষমতার দম্ভে যেভাবে গাজা, ইউক্রেন এবং ইরানের শিশুসহ হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে, এ সবই শিক্ষা, জ্ঞান এবং উন্নত গবেষণালব্ধ উন্নয়নের নেতিবাচক প্রভাব। সেদিক থেকে বিবেচনা করতে গেলে, শিক্ষা কীভাবে সভ্যতাবিবর্জিত কর্মকা-ের বিপরীতে সভ্যতার কাক্সিক্ষত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে, বিষয়টি গভীরভাবে ভাবাচ্ছে।

শিক্ষা বিস্তারের ইতিহাস পর্যালোচনা করতে গেলে আমরা দেখি, প্রাচীনকালে পরিবার এবং ধর্মীয় গুরুকেন্দ্রিক মৌখিক শিক্ষা মনন গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এক্ষেত্রে ভারতের নালন্দা, তক্ষশীলা এবং বিক্রমশীলার মতো প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয় সে সময় বিশ্ব থেকে জ্ঞানপিপাসুদের আকর্ষণ করত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সাহিত্য এবং দর্শনের মতো বিষয়গুলো একাধারে প্রাতিষ্ঠানিক এবং ব্যক্তি পর্যায়ে বিস্তার লাভ করতে থাকে। কনফুসিয়াস, সক্রেটিস, প্লেটো এবং অ্যারিস্টটলের প্রাতিষ্ঠানিক এবং যুক্তিনির্ভর শিক্ষা সভ্যতার ক্রমবিবর্তনে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। শিক্ষা এবং দর্শনের সর্বজন গ্রহণযোগ্যতা সময় সময় অনেক প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছে। তখন সামাজিক এবং রাজনৈতিক বিভাজন কম ছিল না। সক্রেটিসের সময়ে, তারই কাছের কিছু মানুষ দর্শন এবং নীতি-নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেন। তার মৃত্যুর আড়াই হাজার বছর পর সক্রেটিস যে সঠিক ছিলেন, সেটা প্রমাণ হলেও সে সময় সক্রেটিসের অতিজ্ঞানে ঈর্ষান্বিত হয়ে তারই বন্ধু কবি মেলিটাস দেবতাদের কটাক্ষ করছেন এবং সমাজের প্রচলিত রীতির বিরুদ্ধে যুবসমাজকে বিপথে ধাবিত করছেন বলে সক্রেটিসের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। আরেক বন্ধু লাইকন রাজনৈতিক বাগ্মিতায় সক্রেটিসের দর্শনের বিপরীতে যুবসমাজকে নিজের পক্ষে টেনে আনতে না পেরে অভিযোগ করে এবং সর্বশেষ উপরোক্ত দুজনের প্ররোচনায় একজন অভিভাবক সক্রেটিসের বিরুদ্ধে পারিবারিক এবং সামাজিক ঐতিহ্যের বিপরীতে যুবসমাজকে বিভ্রান্ত করার অভিযোগ করেন। বাস্তবে সক্রেটিস একজন যুক্তিবাদী এবং আস্তিক মানুষ ছিলেন এবং সমাজে তার ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা ছিল। প্রাচীন গ্রিক সভ্যতার ক্ষেত্রে তার অবদান, গ্রহণযোগ্যতা এবং জনপ্রিয়তা ৫০০ জুরির মধ্যে, ২৮০ জুরির রায়ে বিলীন হয়ে যায়। সিদ্ধান্ত হয়, হেমলক বিষপানে সক্রেটিসের মৃত্যুদ- কার্যকরের, হলো তাই।

অভিযোগের বিচার চলাকালে, জুরি বোর্ডের অনুমতি নিয়ে সক্রেটিস কিছু বলতে চান। অনুমতি পেয়ে বলেন, ‘এথেন্সবাসী, আমি জানি না অভিযোগকারীরা কীভাবে আপনাদের প্রভাবিত করেছে। তাদের জ্ঞান খুব সীমিত, অথচ আদালতে তারা যে বক্তব্য দিয়েছে তা এত ভালো হয়েছে যে, আমি নিজেও বিস্মিত হয়েছি। তবে তাদের দীর্ঘ মিথ্যা ভাষণের মধ্যে একটি চরম মিথ্যা, মারাত্মকভাবে আমাকে পীড়িত করেছে। তারা আপনাদের সাবধান করে বলেছে, আমার বাগ্মিতা সম্পর্কে আপনারা যেন সতর্ক থাকেন। আমি যেন আমার যুক্তি দিয়ে আপনাদের প্রভাবিত ও প্রতারিত করতে না পারি। অথচ আমি যে একজন ভালো বাগ্মী, তা দাবি করি না। অভিযোগকারীরাও ভালো বাগ্মী, তবে তাদের কথায় সত্য কম।’

সত্য আর মিথ্যার দ্বন্দ্বে সব সময় সত্যের জয় হয়, এটা মিথ্যা প্রমাণিত হয় সক্রেটিসের ক্ষেত্রে। গ্যালিলিও গ্যালিলি, যাকে ‘আধুনিক বিজ্ঞানের জনক’ বলা হয়, তাকেও সে সময় প্রচলিত বিশ্বাসের বিপরীতে গিয়ে যুক্তি দিয়ে ‘পৃথিবী সূর্যের চারপাশে ঘুরে’, কোপার্নিকাসের এই তত্ত্বের সমর্থন এবং প্রচারের জন্য আজীবন গৃহবন্দিত্বের সাজা দেওয়া হয় এবং সাজারত অবস্থায় নিজ গৃহে মৃত্যুবরণ করেন। ধর্মীয় শিক্ষার সঙ্গে বিজ্ঞানের যুক্তির দ্বন্দ্ব মূলত শিক্ষার এক দ্বান্দ্বিক চরিত্র, যার আরও উদাহারণ রয়েছে। দার্শনিক এবং যুক্তিবাদীরা সবকিছুর পেছনে কার্যকরণ খোঁজেন। 

শিক্ষা বিস্তার একটি নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মতো যুগে যুগে ঘটে এসেছে, যেমনটা ঘটেছে ইসলামের স্বর্ণযুগে। ঐ সময়কে রেনেসাঁ বা নবজাগরণ বলা হয়। ইউরোপীয় উপনিবেশ এবং উপনিবেশ-উত্তর সময়ে শিক্ষা বিস্তার নব্য স্বাধীন দেশের পুনর্জন্মের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। সময়ের পথ ধরে প্রথম এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ে জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠা, ঠান্ডা যুদ্ধ, জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন, শীতল যুদ্ধের অবসান এবং এইসব ঘটনার মাঝখানে আরও ক্ষুদ্র-বড় সংঘাত এর পেছনে বারবার সভ্যতা সংকটাপন্ন হলেও, শিক্ষা বরাবর বিজয়ী হয়েছে, কখনো সত্যের পথ ধরে, কখনো বা অসত্যের সাথী হয়ে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একজন ছাত্র হিসেবে এটুকু বুঝি, পৃথিবীটা খুব ভালো একটা অবস্থায় নেই।

পৃথিবীজুড়ে ছোট-বড় সব সমাজ এক একটা রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছে, যার সমষ্টি আজকের আন্তর্জাতিক সমাজব্যবস্থা। তবে মজার বিষয় হচ্ছে, বড় এবং উন্নত রাষ্ট্রগুলো নিজেদের ভেতর শান্তি এবং নিরাপত্তা নিয়ে যতটা মনোযোগী, ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা শঙ্কা বৃদ্ধির জন্য তারাই মূলত দায়ী। এর মূল কারণ অবশ্যই শিক্ষা, তবে তারচেয়েও বেশি, মূল্যবোধের অভাব। প্রাচীন গ্রিক সমাজকে শিক্ষা এবং সভ্যতার সূতিকাগার বলা হলেও, সক্রেটিসের পরিণতি যেমন মূল্যবোধের জায়গায় বড় আঘাত হেনেছে একইরকমভাবে শিক্ষা, সভ্যতার বিকাশ এবং বিনাশ এ সবই মূল্যবোধ দ্বারা সৃষ্ট।

যে চিন্তাভাবনা, লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, সংকল্প ও আদর্শ মানুষের সামগ্রিক আচার-আচরণ ও কর্মকান্ডকে পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত করে, তাদের সমষ্টি মূল্যবোধ। সুতরাং শিক্ষার প্রসার ঘটলেও, এর সঙ্গে মূল্যবোধের সংযোগ সব সময় একটি নির্দিষ্ট মানদ-ে থাকবে এমনটা ভাবার কারণ নেই। মূল্যবোধ সাধারণত সামাজিক পরিস্থিতির আলোকে বিবেচনা করা হয়, আন্তর্জাতিক পরিসর যেহেতু সমগোত্রীয় নয়, এক্ষেত্রে একটি দেশ বা সেই সমাজের মূল্যবোধ অন্য দেশ বা সমাজে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। তবে কোনো দেশ যদি তার সমাজব্যবস্থার আলোকে নির্দিষ্ট মানদন্ডের মূল্যবোধ ধারণ করতে না পারে, সেক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সমাজের সঙ্গে মানানসই হওয়া দূরের কথা সমাজ হিসেবে নিজেদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়বে। কথাগুলোর অবতারণা এ কারণেই যে, বর্তমানে আমাদের সমাজব্যবস্থার সার্বিক অবস্থা অবলোকনে এটাই প্রতীয়মান হয় যে স্বাধীনতার পঞ্চান্ন বছর পরও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং যে মূল্যবোধকে ধারণ করে পথ চলার মধ্য দিয়ে আমাদের একটি বৈষম্যহীন এবং কাক্সিক্ষত বাংলাদেশ গড়ার কথা ছিল, সেখান থেকে অনেকটা বিচ্যুত হয়ে গেছি। জাতি হিসেবে আমাদের স্বকীয় সত্তাকে আবার নতুন করে খুঁজে বেড়াতে হচ্ছে, যা খুবই পীড়াদায়ক। যেকোনো স্বাধীন দেশের জন্য তার নিজের গতিপথ নির্ধারণ করার জন্য পঞ্চাশ বছর যথেষ্ট সময় হলেও, আমরা অনেক বেশি সময় নিয়ে ফেলছি। আজ নতুন করে আমাদের অনেক কিছুই ভাবতে হচ্ছে, শিখতে হচ্ছে। নতুন প্রজন্মকে নিয়ে সবসময় আশাবাদী থাকা আমরা কোথায় যেন বারবার হোঁচট খাচ্ছি। এর দায় শুধু তাদের নয়। সার্বিক বোঝাপড়ার জায়গায় ব্যাপক ক্ষতের ফলে এ সবের সৃষ্টি। এই ক্ষত সারানোর দাওয়াই জানা থাকলেও ক্রমশ আমরা বহুধাবিভক্ত। হয়তো অবচেতনেই অপশক্তিকে অপতৎপরতা চালানোর সুযোগ করে দিচ্ছে। পথ হারাচ্ছি, তবে একদম হারিয়ে ফেলিনি এর আগেই সঠিক পথ খুঁজে নেওয়া জরুরি। 

শিক্ষা যেমন আমাদের সভ্য করে, তেমনি সভ্যতা বিনির্মাণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই কারণে মূল্যবোধের ধারণ বা তার অবক্ষয় রোধে, শিক্ষাকে যুগোপযোগী করার প্রয়োজন। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা মূল্যবোধের কোন মানদ-ে অবস্থান করছি, সেটা গভীর ভাবনার বিষয়। যেহেতু মূল্যবোধ মানুষের চিন্তা, লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, সংকল্প ও আদর্শের একটি সমন্বিত রূপ এক্ষেত্রে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র গঠনের ইতিহাসের বিপরীত কোনো মূল্যবোধকে ধারণ করে যদি আমরা পথ চলার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকি, এর পরিণতি সক্রেটিসের মতো আত্মাহুতির সামিল বৈ কিছুই নয়। রাজনৈতিক বহুমুখিতাকে যেখানে গণতন্ত্রের সৌন্দর্য বলে ধরা হয়, সেখানে সমাজের বেশিরভাগ মানুষের মনের ভাষা এবং আকাক্সক্ষাকে ধারণ না করে রাষ্ট্রের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং সভ্যতার বিপরীত যে কোনো কর্মকা- বিদেশিদের তাঁবেদারে পরিণত করবে। আমাদের অর্জিত শিক্ষার সত্য গৌরবের বিপরীত স্রোতে বিলীন হয়ে, একসময় কি হেমলক বিষের মতো গ্রাস করবে গোটা সমাজকে! পৃথিবী উন্নত থেকে উন্নততর হচ্ছে, আমরাও একদিন শিক্ষাকে যুগোপযোগী করে উন্নতির সর্বোচ্চ শিখরে যাব এই আশা অমূলক নয়।

লেখক : রাজনীতি ও কূটনীতি বিশ্লেষক অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

[email protected]

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত