সম্পর্কের টানাপড়েন ও জীবনবোধই আমার নির্মাণের মূল শক্তি

টেলিভিশন নাটকের সফল নাট্যকার ও পরিচালক নাজনীন হাসান খান দীর্ঘ ষোলো বছরের ক্যারিয়ারে উপহার দিয়েছেন পঞ্চাশের অধিক জীবনঘনিষ্ঠ নাটক। নির্মাণশৈলী ও সমাজসচেতনতার জন্য তিনি অর্জন করেছেন মাদার তেরেসা অ্যাওয়ার্ডসহ বহু সম্মাননা। সাম্প্রতিক কাজ ‘বিদায় বেলায়’ স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, নাট্যভাবনা এবং আগামীর পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন অপূর্ব কুমার কুন্ডু

আপনার নতুন স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘বিদায় বেলায়’-এর মূল ভাবনা ও নির্মাণপ্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাই।

‘বিদায় বেলায়’ স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রটি গড়ে উঠেছে একজন কফিনের কাপড় বিক্রেতা এবং অর্থলগ্নিকারকের মধ্যকার টানাপড়েন ও পরিণতি নিয়ে। কর্মহীনতা কীভাবে মানুষকে সমাজ ও সংসার থেকে অপাঙ্ক্তেয় করে তোলে এবং অহংকার কীভাবে মানুষকে পথে নামিয়ে আনে, সেই জীবনভিত্তিক গল্পই এখানে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। রাজীব মণি দাসের রচনায় এই চলচ্চিত্রের কাজ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। এতে অভিনয় করেছেন শিবা শানু, আব্দুল্লাহ রানা, কাজী রাজু, রেশমা আহমেদ ও আল-মামুন রূপান্তর। সুন্দরভাবেই এর চিত্রায়ণ সম্পন্ন হয়েছে।

নাটক রচনা, টিভি নাটক নির্মাণ এবং সামাজিক কার্যক্রম একাধিক পরিসরে আপনার সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রটি কীভাবে তৈরি হলো?

নাটক রচনার ক্ষেত্রে মানবিক সম্পর্ক, টিভি নাটক নির্মাণের ক্ষেত্রে লং ফ্রেমে গ্রামীণ জীবন ও আবহ এবং সামাজিক দায়িত্বের ক্ষেত্রে শিশু ও নারীদের জীবনে স্বাচ্ছন্দ্যের নিশ্চয়তা আনা আমার কাজের প্রধান অগ্রাধিকার। সময়ের সুন্দর বিন্যাস এবং সৃজনশীলতার মধ্য দিয়েই ভালোবেসে আমি এই কাজগুলো করে যাচ্ছি।

দীর্ঘ অভিনয় ও পরিচালনা ক্যারিয়ারে পঞ্চাশের অধিক নাটক নির্মাণের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

একজন নাট্যকার ও পরিচালক হিসেবে দীর্ঘ ষোলো বছরের ক্যারিয়ারে একক ও টেলিফিল্ম মিলে পঞ্চাশের অধিক নাটক নির্মাণ করেছি। এই দীর্ঘ পথচলায় দর্শকদের অসংখ্য জনপ্রিয় নাটক উপহার দেওয়ার পাশাপাশি জীবনঘনিষ্ঠ গল্প ও স্বতন্ত্র নির্মাণশৈলীর পরিচয় রেখেছি। একজন নারী নির্মাতা হিসেবে এই পথচলা বেশ কষ্টসাধ্য ছিল। আমার পরিচালিত উল্লেখযোগ্য ধারাবাহিক নাটক ‘ভেজাল কাদের’ ও ‘গণক’। এ ছাড়া একক নাটক ও টেলিফিল্মের মধ্যে রয়েছে ‘মায়ের ইচ্ছা’, ‘দারোগা বউ জামাই আসামি’, ‘বিশিষ্ট চিন্তাবিদ’, ‘নীল শুভ্র’, ‘আধুনিক চোর’, ‘সর্বপ্যাথি ডাক্তার’, ‘লাভ বার্ড’, ‘জামাই আবদার’, ‘সম্পত্তি ভাগ’, ‘পাওয়ার’, ‘হ্যালুসিনেশন’, ‘টনিকম্যান’, ‘ভুঁড়ির অহংকার’, ‘জামাই বাড়িতে ঈদ’, ‘জামাই দাওয়াত’, ‘দুই বউয়ের জ্বালা’, ‘আলো আঁধারে’, ‘কিস্তি নিলে জামিন নাই’, ‘মাথা গরম পরিবার’, ‘পিরিতের প্রফেসর’, ‘মিস্টার পারফিউম’, ‘দাজ্জাল বউ’, ‘নেপালে হানিমুন’, ‘প্রেমলীলা’ ও ‘নিয়তি’।

নাট্য নির্মাণ ও সমাজসেবামূলক কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রাপ্ত সম্মাননা ও বিচারিক দায়িত্ব আপনার কাজের পরিসরকে কতটা প্রসারিত করেছে?

নাটক নির্মাণে বিশেষ অবদান এবং সমাজসেবামূলক কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ একাধিক সম্মানজনক পুরস্কার পাওয়ার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক বিচারিক কাজের অংশ হওয়ার সুযোগ পেয়েছি। উল্লেখযোগ্য পুরস্কারের মধ্যে রয়েছে মাদার তেরেসা অ্যাওয়ার্ড, বাবিসাস অ্যাওয়ার্ড, ট্র্যাব অ্যাওয়ার্ড, শেরে বাংলা গোল্ডেন অ্যাওয়ার্ড, বায়োস্কোপ স্টার অ্যাওয়ার্ড ও এজেএফবি স্টার অ্যাওয়ার্ড। পাশাপাশি ‘মিস্টার অ্যান্ড মিস গ্ল্যামার লুকস’ এবং ‘বাভাসি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব’-এর প্রধান বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা আমার জন্য অত্যন্ত সম্মান ও দায়িত্বের বিষয়।

শিল্পকলা একাডেমিতে ‘হ্যানিম্যান’ নাটকের মঞ্চায়ন এবং এই আয়োজনে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, বিষয়টি কেমন লাগছে?

চিকিৎসাবিজ্ঞান নিয়ে নাটক হচ্ছে এই বিষয়টি আমাকে গভীরভাবে ভাবিয়েছে। কারণ স্বাস্থ্যঝুঁকি এখন একটি বৈশ্বিক সমস্যা এবং চিকিৎসা ব্যয়ও অকল্পনীয়। মহাকাল নাট্য সম্প্রদায় ও ‘হ্যানিম্যান’ খ্যাত অভিনেতা মীর জাহিদ হাসানের ৬৫তম জন্মদিনের উদযাপন এবং নাটকটির ষষ্ঠ মঞ্চায়নে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে যখন ডাক পেলাম, তখন আমি সেখানে থাকার সিদ্ধান্ত নিলাম। পাশাপাশি ডা. হ্যানিম্যানকে নিয়ে একটি মানসম্মত টিভি নাটক নির্মাণ করা যায় কি না, সে বিষয়েও আমার ভাবনা রয়েছে।

মানবিক নাটকের নির্মাণ ও প্রযোজনা বা আগামীর পরিকল্পনা নিয়ে আপনার সুনির্দিষ্ট ভাবনা কী?

প্রযুক্তির এই বিশ্বায়নের যুগে ব্যক্তিগত পরিসরে মানুষের সঙ্গে মানুষের মনোজাগতিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা আমার সব সময়ই থাকবে। এই ভাবনা এবং পাত্র-পাত্রীদের নিয়ে খুব শিগগির নতুন স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ও নাটকের শুটিং শুরু করব।