ঈশ্বরদীর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিটের ‘ফ্রেশ নিউক্লিয়ার ফুয়েল’ বা ইউরেনিয়ামের তৃতীয় চালান রূপপুর এসে পৌঁছেছে।
মঙ্গলবার(২৭অক্টোবর) কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনির মধ্যদিয়ে ঢাকা থেকে সড়ক পথে সকাল ৮টার দিকে প্রকল্প অভ্যন্তরে প্রবেশ করে কন্টেইনার বোঝাই ৩টি গাড়ী। সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন আইন-শৃংঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সার্বিক তত্ত্বাবধায়নেইউরেনিয়ামবাহী গাড়ীগুলো ঈশ্বরদীর রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে আনা হয়। এজন্য ঈশ্বরদী-ঢাকা মহাসড়কে রাত ৩টা থেকে বেলা ৮টা পর্যন্ত সব ধরণের যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
এর আগে সোমবার (২৬ অক্টোবর) সকাল ৮টা ১৪ মিনিটে ৪১ টন পারমাণবিক জ্বালানি নিয়ে রাশিয়ার একটি বিশেষ কার্গো বিমান ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। বিমানটিতে ১২টি টিপিএসে মোট ৪১ টন পারমাণবিক জ্বালানি পরিবহন করা হয়।
এই জ্বালানি বিমানবন্দর থেকে সড়কপথে ঈশ্বরদীর রূপপুরে প্রকল্প সাইটে আনার সময় সড়কপথে ভিভিআইপি সমমানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা অনুসরণ করা হয়। ইউরেনিয়াম প্রকল্প এলাকায় পরিবহনে নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য ঢাকা-ঈশ্বরদী-ঢাকা-পাবনা মহাসড়কে বাস চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।
রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটম জানিয়েছিল, দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য মোট সাতটি কার্গো বিমানে ১৬৩টি ইউরেনিয়াম অ্যাসেম্বলি এবং প্রথম ইউনিটে পুনরায় জ্বালানি সরবরাহের জন্য আরও দুটি কার্গোতে অতিরিক্ত ৪৮টি ইউরেনিয়াম অ্যাসেম্বলি বাংলাদেশে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। সব মিলিয়ে মোট নয়টি চালানে এসব পারমাণবিক জ্বালানি আনা হবে।
রাশিয়ার প্রযুক্তিতে নির্মিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ভিভিইআর-১২০০ মডেলের দুটি ইউনিট রয়েছে। এর মধ্যে প্রথম ইউনিটে বি-২ ধাপের ফিজিক্স টেস্টসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। এসব পরীক্ষার প্রতিবেদন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (বায়েরা) কাছে জমা দেওয়া হয়েছে।
বায়েরা চুড়ান্ত অনুমোদন দিলে প্রথম ইউনিটটি পরবর্তী ধাপ স্টেজ-সি বা পাওয়ার স্টার্টআপ পর্যায়ে প্রবেশ করবে। এ পর্যায়ে ধাপে ধাপে রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা বাড়িয়ে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও নিরাপত্তাব্যবস্থার কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হবে। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও অনুমোদন শেষে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের কার্যক্রম শুরু হবে।
প্রকল্প সুত্র জানায়, রূপপুর প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু শক্তি করর্পোরেশন রোসাটমের জ্বালানি প্রস্তুতকারী কোম্পানি টেভেলের একটি প্রতিষ্ঠান নভোসিবিরস্ক কেমিক্যাল কনসেনট্রেটস প্লান্ট (এনসিসিপি) রূপপুরের এই জ্বালানি উৎপাদন করেছে। এই জ্বালানী পরিবহনের সময় সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বিশেষ নিরাপত্তার দায়িত্বে পালন করতে দেখা যায়।
ঈশ্বরদী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আশাদুর রহমান বলেন, ঈশ্বরদীতে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যদিয়ে রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের দ্বিতীয় ইউনিটের জ্বালানী হিসেবে ইউরেনিয়ামের দ্বিতীয় চালান নিয়ে আসা হয়। ঈশ্বরদীর মুলাডুলি ও দাশুড়িয়া সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে পুলিশসহ অন্যান্য আইন-শৃংঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়।
সুত্র জানায়, ২০২৩ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রথম ইউনিটের জ্বালানী হিসেবে ইউরেনিয়ামের প্রথম চালান এসে রূপপুরে পৌছে। এরপর ৬ অক্টোবর দ্বিতীয় চালান, ১৩ অক্টোবর তৃতীয় চালান, ২০ অক্টোবর ৪র্থ চালান, ২৭ অক্টোবর ৫ম চালান, ৩ নভেম্বর ষষ্ঠ চালান এবং ১০ নভেম্বর প্রথম ইউনিটের সর্বশেষ সপ্তম চালান রূপপুর প্রকল্পে এসে পৌছে।
এরপর চলতি মাসের ৩ অক্টোবর রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের দ্বিতীয় ইউনিটের প্রথম চালান, ২১ অক্টোবর দ্বিতীয় চালানা এবং সর্বশেষ আজ ২৭ অক্টোবর তৃতীয় চালানা জ্বালানী এসে রূপপুরে পৌছায়।
দেশের সবচেয়ে আলোচিত ও বড় প্রকল্প ঈশ্বরদীর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে খরচ হচ্ছে প্রায় ১ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার দিচ্ছে ২২ হাজার ৫২ কোটি ৯১ লাখ ২৭ হাজার টাকা। রাশিয়া থেকে ঋণ সহায়তা পেয়েছে ৯১ হাজার ৪০ কোটি টাকা। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চলতি বছরেই বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করবে দেশের প্রথম পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুর। আগামী বছর পুরোদমে প্রকল্পটি চালুর আশাবাদ ব্যক্ত করেন তারা।