প্রচ্ছদ রচনা

বাজারের লালন বনাম আখড়ার লালন

উপনিবেশোত্তর দক্ষিণ এশিয়ার প্রান্তিক আত্মানুসন্ধান ও সামাজিক প্রতিরোধের ইতিহাসে ফকির লালন শাহ (১৭৭৪-১৮৯০) এক গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক অক্ষ। উনিশ শতকের ঔপনিবেশিক আধুনিকতা, জাতিভেদ প্রথা ও প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মীয় আধিপত্যের বিরুদ্ধে তার বাণী ছিল এক শক্তিশালী প্রতিসংবাদ। যে সমাজে জন্ম ও জাতপরিচয় মানুষের মর্যাদা নির্ধারণ করত, সেখানে লালনের অবস্থান ছিল গভীর মানবতাবাদী। তার নামে প্রচলিত একটি গানে সেই সমাজভাবনার প্রকাশ ঘটে : ‘এমন মানব সমাজ কবে গো সৃজন হবে/ যে দিন হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টান/ জাতি গোত্র নাহি রবে।’ এই উচ্চারণে তার অসাম্প্রদায়িকতা ও প্রধাবিরোধী, অন্তর্ভুক্তিমূলক বিকল্প সমাজের কল্পনা দৃশ্যমান। তবে একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বায়িত পুঁজিবাদ ও ‘সংস্কৃতি-শিল্পে’র যুগে লালনের সেই প্রথাবিরোধী সত্তা আজ এক নতুন বাণিজ্যিক দ্বন্দ্বের মুখোমুখি।

সমকালীন সাংস্কৃতিক রাজনীতিতে লালন এক দ্বৈততার প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। একদিকে ইউনেস্কো ২০০৫ সালে বাউল গানকে ‘মানবতার অমৌখিক ও বিমূর্ত ঐতিহ্যের শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্ম’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, যা বাউল ধারার প্রধান প্রতীক হিসেবে লালনকে বৈশ্বিক ঐতিহ্য-পরিসরে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে। অন্যদিকে, সেই একই লালন জনপ্রিয় সংস্কৃতি, পপ-ফিউশন ও করপোরেট ব্যবস্থার ভেতরে ক্রমশ এক বাণিজ্যিক ব্র্যান্ডে রূপান্তরিত হচ্ছেন। এই দ্বৈততার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তিনটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করা যেতে পারে : ১. লালন-দর্শনের মূল মর্মবস্তু কী? ২. সেই দর্শন কার হাত ঘুরে ও কোন মাধ্যমে আমাদের কাছে পৌঁছেছে? এবং ৩. আজকের বাণিজ্যিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তরে লালন-দর্শনের ঠিক কী হারাচ্ছে, আর কতটুকুই বা অর্জিত হচ্ছে?

নৃতাত্ত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে, লালনের চিন্তাজগৎকে শুধু সুর বা আধ্যাত্মিক ভাবালুতা হিসেবে দেখলে তার দর্শনের সামাজিক তাৎপর্য ঢাকা পড়ে যায়। তার দর্শন গড়ে উঠেছিল প্রান্তিক মানুষের জীবনচর্চা ও বাস্তব অভিজ্ঞতার ভেতর থেকে—এক বিকল্প প্রতিসংস্কৃতি (counter-culture) হিসেবে। উনিশ শতকের গ্রামীণ বাংলায় জাতপাত, বর্ণাশ্রম ও প্রথাগত ধর্মীয় বিভাজনের বিপরীতে লালন দেহতত্ত্ব ও ‘মানুষ ভজনা’র মধ্য দিয়ে এক ‘নিম্নবর্গীয়’ (subaltern) বিশ্ববীক্ষা নির্মাণ করেছিলেন। ইতালীয় চিন্তাবিদ আন্তোনিও গ্রামশি (১৮৯১-১৯৩৭) ক্ষমতার প্রান্তে থাকা জনগোষ্ঠীকে যে অর্থে ‘সাবঅল্টার্ন’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন, এখানেও শব্দটি সেই অর্থেই প্রযোজ্য। প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতাবলয়ের বাইরে অবস্থান করে দেহ, আত্মা ও মানবসত্তার সম্পর্ক অন্বেষণই ছিল লালনের সাধনার কেন্দ্র। ফলে আরোপিত পরিচয়ব্যবস্থার প্রতি প্রথাবিরোধী সংশয় তার দর্শনের অন্যতম ভিত্তি : ‘সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে/ লালন কয় জাতের কী রূপ দেখলাম না এ নজরে’। এই বাণীতে জাতপ্রথার চিরন্তনতার ধারণাকেই লালন প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছেন। জাত তার বিচারে পরম সত্য নয়, এক কৃত্রিম সামাজিক বিন্যাস মাত্র। ‘মনের মানুষ’ কিংবা ‘অচিন পাখি’র অনুসন্ধানও কোনো দূরবর্তী ঐশ্বরিক সত্তার আরাধনা নয়, নিজের দেহের ভেতর পরম মানবিক সত্তাকে আবিষ্কারের একান্ত সাধনা। ‘আছে আদি মক্কা এই মানব দেহে’—ধর্মের পবিত্র ভূগোলকেও তিনি প্রতিস্থাপন করেন মানবীয় দেহের অভিজ্ঞতায়, যা নিপীড়িত মানুষকে দিয়েছিল আত্মমর্যাদা ও সাম্যের ভাষা। তুলনামূলক দর্শনে এই ভাবনার সঙ্গে সুফি দার্শনিক ইবনে আরাবির (১১৬৫-১২৪০) ‘ওয়াহদাত আল-ওজুদ’ (অস্তিত্বের একত্ববাদ) ধারণার এক পরোক্ষ সাযুজ্য দেখা যায়, যেখানে বহুরূপী সৃষ্টির অন্তরালে এক পরম সত্যের অভেদ প্রকাশ ঘটে। কিথ কান্তুর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, লালনের গানে ইসলামি গূঢ়তত্ত্বের স্তরটি স্থানীয় সুফিবাদের মধ্য দিয়ে প্রবেশ করেছে, যেখানে গানের প্রকাশ্য (জাহের) ও গূঢ় (বাতেন) অর্থের পার্থক্য তাৎপর্যপূর্ণ। 

উত্তর-ঔপনিবেশিক পাঠে লালনকে প্রায়শই রাজনৈতিক সংগ্রাম থেকে বিচ্ছিন্ন ‘ভাবালু লোকায়ত ঐতিহ্য’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু লালনের মানবতাবাদ বিমূর্ত ভাষণ আদৌ ছিল না। তা ছিল প্রাত্যহিক জীবন-যাপনের মাধ্যমেই জাতপ্রথাকে চ্যালেঞ্জ করার নিয়মিত অনুশীলন। জেমস সি. স্কট তার Weapons of the Weak (১৯৮৫) গ্রন্থে প্রান্তিক মানুষের ‘প্রাত্যহিক প্রতিরোধে’র (everyday resistance) যে রূপরেখা দিয়েছেন, লালনের জীবনচর্চা ও সংগীতও সেই শৃঙ্খলায় পাঠযোগ্য। তবে স্কটের বস্তুগত কাঠামোর বিপরীতে লালনের প্রতিরোধে প্রধান হয়ে ওঠে আধ্যাত্মিক ও আত্মিক অন্বেষণ। তার গানের এই ভূমিকা অনুধাবন করতে পারলে প্রেক্ষাপটচ্যুতির ক্ষতিটাও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নৃবিজ্ঞানী ক্যারোলা লোরিয়ার গবেষণায় বাউল-ফকিরদের একটি প্রবাদপ্রতিম বাক্য উঠে আসে—‘গানে জ্ঞান’। যেখানে গান শুধু আলংকারিক অনুষঙ্গ নয়, উপরন্তু তা অর্জন, ধারণ ও সঞ্চারণের মূল পদ্ধতি। অথচ গান যখন তার সাধনাগত সামাজিক প্রেক্ষাপট থেকে চ্যুত হয়ে বাজারে প্রবেশ করে, তখন বিজ্ঞাপিত বা জনপ্রিয় সুরটি টিকে থাকলেও অনেক ক্ষেত্রেই অন্তর্নিহিত গূঢ় জ্ঞানটি সঙ্গে আসে না। 

মধ্যস্থতার দীর্ঘ ইতিহাস
লালনের বাণী আখড়ার বাইরে গিয়েছিল আধুনিক বাজার ব্যবস্থা তৈরির অনেক আগে। জীবদ্দশাতেই শিষ্য-পরম্পরায় তার গান, সাধনা ও জীবনাচরণ ছড়িয়ে পড়ে। ১৮৯০ সালের অক্টোবরে তার প্রয়াণের খবর ছাপা হয় কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের গ্রামবার্তা প্রকাশিকা-য়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছেঁউড়িয়ার আখড়া থেকে লালনের গানের পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করেছিলেন। বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, তা থেকে ২৯৮টি গান অনুলিপি করা হয় এবং সেখান থেকে নির্বাচিত ২০টি গান ১৩২২ বঙ্গাব্দে (১৯১৫-’১৬) প্রবাসী পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। পরবর্তী সময়ে মুহম্মদ মনসুর উদ্দীনের হারামণি সংকলনমালা (যার প্রথম খণ্ডের ভূমিকা লেখেন রবীন্দ্রনাথ) এবং লালন ফকিরের গান (১৯৪৮) সংকলনটি লালনকে শিক্ষিত মধ্যবিত্তের নাগালে নিয়ে যায়। এভাবে সংগ্রাহক, সম্পাদক ও প্রকাশকের হাত ঘুরে লালনের গান আখড়ার সাধন-পরিসর ছাড়িয়ে বৃহত্তর পাঠকসমাজে পৌঁছায়। 

এই ইতিহাস বলে, লালন-দর্শনের সঞ্চারণ একটি গতিশীল সামাজিক প্রক্রিয়া। ফলে ‘মূল’ ও ‘মোড়কের’ সীমারেখাও কখনোই পুরোপুরি নিরপেক্ষ ছিল না। সংগীতশিল্পী ও গবেষক মাকসুদুল হকের মতে, বিশ শতকের গোড়া থেকেই সাধক-ফকির ও ‘শখের বাউল’দের মধ্যে খাঁটি-অখাঁটির বিতর্ক বিদ্যমান রয়েছে। তবে ক্যারোলা লোরিয়া এই বিভাজনকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। ‘খাঁটি গ্রামীণ সাধক’ বনাম ‘নকল শহুরে পরিবেশক’—বাউল-চর্চার এই প্রথাগত দ্বৈততা বাস্তবে অনেক বেশি শিথিল। তার মতে, ‘বাউল সম্রাট’ বলে খ্যাত লালন নিজেও কখনো নিজেকে ‘বাউল’ পরিচয়ে চিহ্নিত করেননি। ফলে লালনের প্রামাণিকতার প্রশ্নটিও জটিল। তার নামে প্রচলিত বিপুল গানের মধ্য থেকে ক্যারল সলোমন পাণ্ডুলিপি ও পরিবেশনা যাচাই করে ১৩৭টি গানকে প্রামাণিক হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে, সাইমন জাকারিয়া ও কিথ কান্তুর সম্পাদনায় ২০১৭ সালে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে City of Mirrors: Songs of Lalan Sai নামে বইটি প্রকাশিত হয়—যা লালনকে নিয়ে ইংরেজিতে প্রকাশিত প্রথম মৌলিক আকরগ্রন্থ। এতে সলোমনের অনুবাদের পাশাপাশি প্রমিত বাংলা পাঠ ও রোমান প্রতিবর্ণীকরণ যুক্ত রয়েছে।

আমরা যে ‘লালন’কে চিনি, তিনি বহুলাংশে সংগ্রহ, সম্পাদনা ও পুনর্ব্যাখ্যারই ফসল। ফলে ‘মোড়ক’-এর প্রশ্ন কেবল বাজারের বাণিজ্যিকীকরণের নয়, আমাদের নিজেদের পঠন-প্রক্রিয়ারও। লালনকে শুধু এক ‘অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদী প্রতীক’ হিসেবে পাঠ করলে কান্তু নির্দেশিত ইসলামি সুফি বাতিনি ভাষার সংযোগে তার সাধনার গূঢ় স্তরটি আড়ালে পড়ে যায়। তাই মূল প্রশ্নটি লালন বাজারে প্রবেশ করেছেন কি না তা নয়, বরং পাণ্ডুলিপি, ছাপাখানা, বেতার, টেলিভিশন, সিডি, ক্যাসেট, উৎসবমঞ্চ থেকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম—প্রতিটি নতুন মাধ্যম তার দর্শনের সঙ্গে কীভাবে যুক্ত হচ্ছে, সেটাই মূল বিবেচ্য।

পণ্য, প্রতীক ও প্রতিনিধিত্ব
নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে আজকের এই দৃশ্যপটকে ‘চিহ্নের প্রেক্ষাপটচ্যুতি’ (decontextualization of signs) হিসেবে পড়া যায়। একতারা, আলখেল্লা ও জাতপাতবিরোধী প্রতীকী উপাদানগুলো তাদের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট হারিয়ে ফ্যাশনের অনুষঙ্গে পরিণত হচ্ছে—যা বসার ঘরের শৌখিন ফ্রেম পর্যন্ত বিস্তৃত। সংগীতের ক্ষেত্রেও গূঢ় দেহতত্ত্বের চেয়ে বাজারের শ্রুতিসুখকে প্রাধান্য দিয়ে তৈরি হচ্ছে নানা ফিউশন। এতে গান নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছাচ্ছে ঠিকই, তবে লালন-দর্শনের বৈপ্লবিক তীক্ষ্ণতা সরলীকৃত হয়ে পড়ার আশঙ্কাও থাকছে।

এই রূপান্তরের কলকবজা বুঝতে ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের থিওডোর অ্যাডর্নো ও ম্যাক্স হর্কহাইমারের ‘সংস্কৃতি-শিল্প’ (Culture Industry) ধারণাটি বিশেষ প্রাসঙ্গিক। Dialectic of Enlightenment (১৯৪৭) গ্রন্থে তারা দেখিয়েছেন, পুঁজিবাদ কীভাবে প্রথাবিরোধী চিন্তা ও প্রান্তিক ঐতিহ্যকেও শেষ পর্যন্ত বাজারের পণ্যে রূপান্তর করে। যে সাংস্কৃতিক প্রতিসংবাদ প্রচলিত আধিপত্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, বাজার তাকেও নান্দনিক মোড়কে স্রেফ ভোগের উপকরণ বানিয়ে ফেলে। ফরাসি সমাজতাত্ত্বিক জাঁ বোদ্রিয়ারের ‘সিমুলাক্রা’ (Simulacra) বা ‘অনুকল্প’ ধারণার মধ্য দিয়ে এর চূড়ান্ত পরিণতি ব্যাখ্যা করা যায়। ফলে লালনের ‘মানুষ ভজনা’ ও ‘কায়াসাধনা’ বিচ্ছিন্ন কিছু চিহ্নে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে—যেখানে বাজারনির্মিত প্রলেপটিই মূল সাধনাদর্শনের চেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। তখন তাঁর প্রতিরোধী রাজনীতির বদলে সামনে আসে এক মসৃণ ও সর্বজনগ্রাহ্য রূপ—আর মরমি চরণ রূপ নেয় চটকদার স্লোগানে।

গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকের ল্যান্ডমার্ক ‘Can the Subaltern Speak?’ (১৯৮৮) প্রবন্ধের আলোকে বিষয়টি অনুধাবন করা যায় : ‘প্রান্তিক কণ্ঠস্বর যখন প্রতিনিধিত্বের প্রতিষ্ঠিত কাঠামোর ভেতরে প্রবেশ করে, তখন তার নিজস্ব সামাজিক অভিপ্রায় ও মূল বক্তব্যের তীব্রতা রূপান্তরিত বা আংশিক হারিয়ে যেতে পারে।’ একইভাবে, লালনের বাণী যখন বাজারের প্রতিনিধিত্ব-কাঠামোর অংশে পরিণত হয়, তখন তার প্রাতিষ্ঠানিক আধিপত্যবিরোধী ধারটি নন্দনতাত্ত্বিক উপস্থাপনার আড়ালে ম্লান হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। 

ছেঁউড়িয়া : আখড়া থেকে মঞ্চ
কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়ি একসময় ছিল নিভৃত আত্মশুদ্ধির কেন্দ্র যা আজ বৃহৎ জনসমাবেশ, সরকারি উৎসব ও বাণিজ্যিক প্রদর্শনীর ক্ষেত্রবিশেষে পরিণত হয়েছে। লালন একাডেমি আয়োজিত মেলায় করপোরেট উপস্থিতি ও বিজ্ঞাপনী প্রচারের ফলে ঐতিহ্যবাহী সাধনা-পরিসরে দর্শনের চেয়ে ব্র্যান্ড-প্রচারই বেশি প্রাধান্য পায়। তবে উৎসব আয়োজনও কোনো সমস্যা নয়, সংকট তৈরি হয় যখন লালন-দর্শন স্রেফ ভোগ্যসামগ্রীতে পরিণত হয়। আর এই প্রক্রিয়ায় কুশীলব কেবল বাজার একা নয়। মোহাম্মদ জি. এন. মজুমদার ছেঁউড়িয়ার ফকির-সাধকদের সঙ্গে দীর্ঘ নৃতাত্ত্বিক মাঠগবেষণার ভিত্তিতে দেখিয়েছেন, লালন-অনুসারীদের জীবনচর্চা মূলত তিনটি উৎস থেকে কাঠামোগতভাবে ‘সহ-অন্তর্ভুক্ত’ (co-opted) হচ্ছে: ১. ছেঁউড়িয়া ধামের আচার-অনুষ্ঠান নিয়ন্ত্রণকারী সরকারি কর্তৃপক্ষ; ২. সাধনা-আচারহীন স্থূল পরিবেশনাকে প্রাধান্য দিয়ে প্রকৃত সাধকদের প্রান্তে ঠেলে দেওয়া স্থানীয় গণমাধ্যম; এবং ৩. লালন-চর্চাকে কেবল নির্দিষ্ট ‘ঐতিহ্য’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা নাগরিক সমাজের প্রভাবশালী অংশ।

এসব উদ্যোগের পেছনে সংরক্ষণের সদিচ্ছা থাকলেও, লালনের উপরিভাগের জনপ্রিয়তার চাপে তার অনুসারীদের প্রাতিষ্ঠানিক সাধনা ও জীবনচর্চা আড়ালে চলে যায়। অর্থাৎ ‘মোড়ক’ কেবল ফ্যাশন হাউজ বা কলার টিউনের বিষয় নয়; এর একটি শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক রূপও রয়েছে—যেখানে রাষ্ট্র, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজ যৌথভাবে সাধনার মূল পরিসরকেই বদলে দিচ্ছে। একই টানাপড়েন দৃশ্যমান আধুনিক নাগরিক ভোক্তার দিক থেকেও, যিনি গান উপভোগ করলেও লালনের জাতহীন মানবতাবাদ ও দেহতত্ত্বের সঙ্গে কতটা আত্মিক বা অনুশীলনীমূলক সংযোগ ঘটাতে পারছেন—তাও এক প্রশ্ন।

সংরক্ষণ, জনপ্রিয়তা ও দরকষাকষি
সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে এই রূপান্তরের একটি দ্বিমুখী পাঠ সম্ভব। কোনো ঐতিহ্য যখন জাদুঘরসুলভ বস্তুতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে, তখন বাজার, গণমাধ্যম ও প্রযুক্তি কেবল ক্ষয়কারী শক্তি হিসেবেই কাজ করে না—একই সঙ্গে তা ঐতিহ্যের পুনরুৎপাদন ও সঞ্চারেরও মাধ্যম হতে পারে। বাংলা পদাবলি-কীর্তন নিয়ে বিশিষ্ট এথনোমিউজিকলজিস্ট এবেন গ্রেভসের গবেষণা এ ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক। বাণিজ্যিকীকরণের ঢালাও নিন্দা করতে গিয়ে সমালোচকরা শিল্পীদের প্রাত্যহিক জীবনে অর্থ, সংগীত ও ধর্মবিশ্বাসের জটিল মেলবন্ধনকে এড়িয়ে যান—গ্রেভস মূলত এই সরলীকরণের বিরুদ্ধেই যুক্তি দিয়েছেন। লালনের সমকালীন উপস্থিতিকে ‘বাজারের আগ্রাসন’ কিংবা ‘ঐতিহ্যের পুনর্জাগরণ’—এই দুই চূড়ান্ত মেরুর কোনোটিতে না ফেলে পণ্যায়ন, পুনর্নির্মাণ ও পুনর্ব্যাখ্যার এক জটিল ‘সাংস্কৃতিক দরকষাকষি’ হিসেবে দেখা সংগত। এই প্রক্রিয়া একদিকে যেমন ঐতিহ্যকে দৃশ্যমান করে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেয়, অন্যদিকে বাজারের সমীকরণে জড়িয়ে তাকে ভোগ্যপণ্যে রূপান্তরের আশঙ্কাও তৈরি করে।

শেকড়ের প্রশ্ন
তাই প্রশ্নটিকে ‘বাজার বনাম দর্শন’-এর সরল দ্বন্দ্বে না ফেলে এভাবে দেখা প্রয়োজন : সমকালীন সাংস্কৃতিক মাধ্যমগুলো লালন-দর্শনের চূড়ান্ত গন্তব্য, নাকি তার গভীরে প্রবেশের সম্ভাব্য দ্বার? মাধ্যম যদি প্রবেশদ্বার হয়, তবে বাহ্যিক আকর্ষণ পেরিয়ে মানুষ পৌঁছাতে পারে সাঁইজির মূল দর্শন ও ‘মানুষ ভজনা’র গভীরে। কিন্তু বাহ্যিক উপস্থাপনাই পরম লক্ষ্য হয়ে উঠলে অনুধাবনের যাত্রা প্রতীক ও বিনোদনের স্তরেই থমকে যায়। এই অর্থে ‘মোড়ক’ ও ‘শেকড়’-এর দ্বৈততা দুই ভিন্ন লালনের বিভাজন নয়। তা লালন-দর্শনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের পার্থক্যের নির্দেশক : আমরা কি কেবল নিষ্ক্রিয় ভোক্তা হব, নাকি গভীর অনুশীলন ও বোঝাপড়ার দিকে এগিয়ে যাব? ‘শেকড়’ এখানে জাদুঘরে সংরক্ষিত বস্তু নয়, তা এক জীবন্ত সাধনাধারা, যার প্রকৃত ধারক আখড়ার ফকির-সাধকরা। আর সেই ধারা টিকে থাকার মূল শর্ত তাদের স্বাধীন জীবনচর্চার ক্ষেত্র রক্ষা করা—যে দাবি রাষ্ট্র, গণমাধ্যম ও বাজার—তিন পক্ষের কাছেই সমভাবে প্রযোজ্য।

সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে, উত্তর-সত্য (post-truth), সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও ভোগবাদী সংস্কৃতির এই যুগে সাঁইজির ‘মানুষ সত্য’-কেন্দ্রিক ভাবনা আর নন্দনতাত্ত্বিক উপভোগের বিষয়মাত্র নয়। আত্মপরিচয় ও সামাজিক সমতার প্রশ্নে তা এক গভীর নৈতিক ও আত্মিক প্রতিরোধের ভাষা। লালনের গানে তালি দেওয়া শ্রোতা প্রাত্যহিক জীবনে প্রতিবেশীর জাত-ধর্মের পরিচয় নিয়ে কী আচরণ করেন—সে প্রশ্ন বাজার করবে না, করতে হবে আমাদেরই। 

কোনো নির্দিষ্ট প্রতীক, পণ্য বা বাণিজ্যিক উৎসবের মধ্যে লালনের প্রকৃত উত্তরাধিকার সীমাবদ্ধ নয়। তা নিহিত রয়েছে মানুষকে বাহ্যিক পরিচয়ের সীমা পেরিয়ে অন্তর্গত মানবসত্তার মুখোমুখি দাঁড় করানোর নিরন্তর আহ্বানে। শেষ বিচারে প্রয়োজন মোড়কের লালন নয়, শেকড়ের লালনের সঙ্গে রূপান্তরমুখী সংযোগ—যিনি মানুষকে নিজের ভেতরের ‘মানুষ’কে খুঁজে নেওয়ার ডাক দিয়েছিলেন। লালনকে শুধু উদযাপনের, শ্রবণের বা ভোগের বস্তু না বানিয়ে তাকে বোঝা, প্রশ্ন করা ও প্রাত্যহিক যাপনের অনুশীলনে ধারণ করাই তার দর্শনের সমকালীন তাৎপর্য হতে পারে। কারণ লালনের সামাজিক ও দার্শনিক উত্তরাধিকার কোনো সাময়িক উদযাপনে নয়, নিহিত আছে এক নিরবচ্ছিন্ন জীবনচর্চায়।